সময় সবচেয়ে কঠোর বিচারক

 ‘সময় সবচেয়ে কঠোর বিচারকএই আপ্তবাক্যটি নানা ভাষায় নানাভাবে বলা হয়। ইংরেজিতে এই কথাকে আরো বিস্তৃত করে বলা হয়েছে এই ভাবে, Time is the ultimate objective, and fairest judge, often revealing the truth, validating actions, and setting disputes over long term. যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন, তারা অনেক কিছু করেন। এই অনেক কিছুর মধ্যে ন্যায় অন্যায়, ভুল শুদ্ধ, মানবকল্যাণ প্রতারণাও আছে। ন্যায়, শুদ্ধ বা মানবকল্যাণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। কিন্তু যাদের হাতে বিপুল ক্ষমতা দায়িত্ব থাকে তারা যদি তার অপব্যবহার করেন, জেনে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে, এবং ভাবেন এই অপব্যবহারের কথা কেউ জানতে পারবে না, সেটা তাদের বড় ভুল তো বটেই, অপরাধও।

ঢাকার সংবাদপত্রে সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্য চুক্তি অন্তর্বতীর্কালীন সরকারের একেবারে শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগের মুহূর্তে স্বাক্ষরিত হয়। এই বাণিজ্য চুক্তিটির নাম অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সংক্ষেপে ART রাখা হয়েছে- যার পুরোটি হচ্ছে Agreement on Reciprocal Trade। সরকারের সকল সংশ্লিষ্ট দফতর এমন কি প্রেসিডেন্টকে আড়ালে রেখে করা চুক্তিটি সম্পর্কে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি কোনো সংকীর্ণ বা সাধারণ সংজ্ঞার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। এতে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক বিবেচনামূলক ক্ষমতা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, মানদন্ড কাঠামো, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, ক্রয় সংক্রান্ত আচরণ এবং তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে লেনদেন নিয়ে শর্ত রয়েছে। ঠিক কারণেই এটা বাংলাদেশের জন্য শংকার কারণ হওয়া উচিত। বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, মূল সমস্যা এটা নয় যে এই চুক্তি থেকে কোনো বিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া যাবে কিনা। প্রধান সমস্যা হলো, পারস্পরিক বাণিজ্যের ব্যানারে বাংলাদেশকে এমন কিছু প্রভাব বিস্তারের সুযোগ এবং নীতিগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বলা হচ্ছে, যা কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের হালকাভাবে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা অর্জন করল সেদিন থেকে এক শ্রেণীর মানুষ মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের বাংলাদেশের মাটিতে দেখে বলা শুরু করে, পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশ ভারতের হাতে পড়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এমন একজন জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক নেতা ছিলেন, যার ডাকে বাংলাদেশের আপামর মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তিনি ১০ তারিখে দিল্লিতে স্টপওভারেই ভারতীয় সৈন্যদের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রত্যাহারের দাবি তুলেছিলেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। ইন্দিরা গান্ধী বিজেয়ের মাসের মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন ইতিহাসের অন্যান্য উদাহরণকে নাকচ করে দিয়ে। তা সত্ত্বেও এই ন্যারেটিভ থামেনি। এমন কি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও একই অভিযোগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া থেকে বিরত থাকে।

১৯৭১ এর মার্চ মাসে বাংলাদেশ ভারতের যে ২৫ বছরের চুক্তি হয়, সেই চুক্তিকে অভিহিত করা হয় গোলামির চুক্তি বলে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে তখন তো বটেই এখন পর্যন্ত সেই চুক্তিতে এমন একটি শব্দও শনাক্ত করা যায়নি, যাতে মনে হতে পারে এই চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর। বরং ক্ষমতায় থাকাকালেই বঙ্গবন্ধু ভারতকে উপেক্ষা করে লাহোরে গেছেন ইসলামি সম্মেলনে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টোকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসাবে নিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা এবং হিন্দুমুসলিম রেটোরিক রাজনীতির প্রধানতম উপকরণ। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে যতই ভারতকে পাশে রাখতে চেয়েছে, ততই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশকে নাকি ভারতের করদরাজ্য বানানোর পাঁয়তারা চলছে। নির্বাচনের আগে বারবার বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ জিতলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে যত রকম ভারত বিরোধী কথা বলা যায়, প্রমাণ ছাড়া বারবার গোয়েবলসীয় থিয়োরির মত বলা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশে ২৬ হাজার ভারতীয় নাগরিক চাকরি করছে, পুলিশে এবং সেনাবাহিনীতে ভারতীয়রা রয়েছে ছদ্মবেশে ইত্যাদি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও আজ পর্যন্ত তার কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি অন্তর্বতীর্ সরকারের প্রশাসন কিংবা আওয়ামী বিরোধীরা।

বরং এটা খুবই স্পষ্ট ছিল যে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শখ হাসিনা নানা অজুহাতে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সাক্ষাৎ দেননি, আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিষোদগার করেছেন। তিনিও জানতেন আমেরিকা কী চায়, তিনিও জানতেন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কার্যক্রমের অর্থ কী। কিন্তু তিনি ম্যানেজারিয়াল এবং কূটনৈতিক দক্ষতার অভাবে হেরে গেছেন। ১৯৬৫ সালের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তান যদি স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনে উত্তাল না হতো, তাহলে হয়ত আইয়ুব খানই তাদের দাবি পূরণ করত। তখন অবশ্য আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে যেমন পেরেশানিতে ছিল তেমনই তটস্থ ছিল ব্রেজনেভের হুংকারেও। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার মুখেও আমেরিকা যে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও পিছপা হয়, তার কারণও উপরের দুটি।

মুহাম্মদ ইউনুস কোনোভাবেই দেশপ্রেমিক নন তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। বদরুদ্দীন উমর দীর্ঘদিন ধরে বারবার তার মুখোশ উন্মোচন করে দেখাতে চেয়েছেন তিনি পুঁজিবাদের ক্রীড়নক। আমেরিকা এবং ইয়োরোপ তাকে বারবার সম্মানিত করে একটি মহীরুহ চরিত্রে পরিণত করতে চেয়েছে। ২০০৭ সালে সেনা ছত্রছায়ায় ফখরুদ্দীন আহমেদ ক্ষমতায় এসে তাকে রাজনীতির মাঠে নামিয়ে দেয় অদৃশ্য কারো নির্দেশে। তিনি রাজনীতির মঞ্চে নেমেই দেশের গ্যাস ভারতের কাছে বিক্রি করার প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং সমুদ্র বন্দর বিদেশের কাছে ইজারা দেয়ার কথা বলে সেই জরুরী অবস্থার মধ্যেই দেশের মানুষের রোষানলে পড়ে এবং রাজনীতির মাঠ ছেড়ে দেয়।

বাংলাদেশের কিছু মানুষ ১৯৭১কে বিশ্বাস করে না, বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে না, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতের মত অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে তারা আঘাত হানতে চায়, তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতোর মালা পরায়। তারা একাত্তরের বীর শ্রেষ্ঠ, ৫২ ভাষা শহীদসহ ৩২ নম্বর গুড়িয়ে দিয়েছে। অথচ ক্ষমতার শীর্ষে বসে এই ব্যক্তি তাদের প্রতিরোধ তো করেইনি বরং প্রশ্রয় দিয়েছে সরকারি নানা ছত্রছায়ায়। এই লোক ভেবেছিল তার চালবাজি কেউ ধরতে পারবে না। হায় নির্বোধ! এখন তার প্রতি যদি কেউ শ্রদ্ধাশীল হয়, সময় তাদের দিকেও যে ক্রুর দৃষ্টি ফেলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মুহাম্মদ ইউনুসের অপরাধ শনাক্ত করতে হবে বর্তমান তারেক রহমানের সরকারকে। বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে অনেক প্রমাণ আছে। কারো জন্য সময় বেশি বরাদ্দ হয়, কারো জন্য কম। কম আর বেশি যাই হোক, সময়ই মূল বিচারক। গায়ের জোরে, সেনাবাহিনীর জোরে বা অন্য দেশের জোরে কোনো অন্যায়ই শেষ পর্যন্ত মার্জনা পায় না।

Related Posts