শাপলা চত্বরে কত লোক নিহত হয়েছিল? || আমীন আল রশীদ
২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কত লোক নিহত হয়েছিল—তার সঠিক সংখ্যাটি এখনও অজানা। ওই সময় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, শাপলা চত্বরে গণহত্যা হয়েছে। সেখানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ দাবি করে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকারীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে, এতে কেউ নিহত হয়নি। অর্থাৎ দুপক্ষের দাবির মধ্যে পার্থক্য আকাশ—পাতাল। উপরন্তু ওই ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেটিও তৎকালীন শাসকবর্গকে ক্ষুব্ধ করে এবং অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই মামলায় তার শাস্তিও হয়।
প্রশ্ন হলো, শাপলা চত্বরে সত্যিই কতজন নিহত হয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যাটি কেন বের করা যায়নি বা যাচ্ছে না? যারা দাবি করেন যে শাপলা চত্বরে গণহত্যা হয়েছে বা ওই ঘটনায় শত শত লোক নিহত হয়েছেন, তাদের পক্ষে যুক্তি কী, তথ্যপ্রমাণ কী আছে এবং নিহতদের তালিকা তাদের কাছে আছে কি না?
নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কারণ গত মঙ্গলবার (৫ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৫৮ জন নিহতের প্রমাণ পেয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। নিহতদের পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে বললেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রসিকিউশন ৭ জুনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার আশা করছে। পুরো তদন্তের কাজ শেষ হলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
চিফ প্রসিকিউটরের এই ব্রিফিংয়ের পরদিনই হেফাজতে ইসলাম শাপলা চত্বরে নিহতদের মধ্যে ৯৩ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে তাদের নাম, পরিচয় ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বে থাকা মাওলানা কেফায়েতুল্লাহ আজহারী সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এটি একটি প্রাথমিক খসড়া। যাচাই—বাছাইয়ের পর নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
২০১৩ সালের ওই ঘটনার পরে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ নিহতদের যে তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে সংখ্যা বলা হয় ৬১। কিন্তু ওই প্রতিবেদনে ‘অসত্য তথ্য’ প্রচারের অভিযোগে অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারার মামলায় তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। একই মামলায় অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিনকেও দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অবশ্য, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, সেই সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা ছিলেন আদিলুর রহমান খান।
প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর শাহবাগে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওই বছরের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, ইসলাম ও মহানবীর অবমাননাকারীদের বিচারে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নসহ ১৩ দফা দাবিতে এই সমাবেশ।
তখন সরকারের মধ্যে এই ভয় ছিল যে, হেফাজত নেতাকর্মীরা শাপলা চত্বরে রাতভর অবস্থান নিয়ে থাকলে সকালে তাদের সঙ্গে অন্যান্য বিরোধী দলগুলো যুক্ত হতে পারে। তাতে সরকারের পতনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকে সরকার যেকোনো মূল্যে হেফাজতকে সেখান থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ৫ মে সন্ধ্যায় একটি সংবাদ সম্মেলন করে হেফাজতকে কড়া হুঁশিয়ারি দেন। ওই দিন রাতে পুলিশের ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’, র্যাবের ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট শাপলা’ এবং বিজিবির ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার (পরবর্তীতে আইজিপি) বেনজীর আহমেদ।
অভিযানের সময় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়ায় ওই এলাকায় নেমে আসে অন্ধকার। শাপলায় অবস্থানকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির শত শত সদস্য পল্টনের তোপখানা মোড়, ফকিরাপুল ও দিলকুশা এলাকায় প্রস্তুত থাকে। সমাবেশে আগতদের সরিয়ে দিতে খোলা রাখা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে দিয়ে কমলাপুর স্টেশন যাওয়ার এবং বঙ্গভবনের দিকের রাস্তা।
ওই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ হলো অভিযানটি চালানো হয়েছিল গভীর রাতে। রাতের অন্ধকারে সব দৃশ্য সাংবাদিকের ক্যামেরায় হয়তো ধরা পড়েনি। অথবা অনেকে নিহত হলেও দ্রুত তাদের লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যে কারণে স্বাধীনভাবে নিহতের সংখ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ওই সময় সামাজিক মাধ্যমে ‘শত শত লাশ গুম’ হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ সরকার এবং বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক সংঘাত ও মতবিরোধের কারণে ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক বয়ানে বিভক্ত হয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ দাবি করা হয়। অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের দাবি ছিল, ‘সরকার সত্য গোপন করেছে’। কিন্তু এ বিষয়ে তখন কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি।
ঘটনার পরপর একটি আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত হলে সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক হতো না। আবার যেকোনো ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে যে অতিরঞ্জনের প্রবণতা তৈরি হয়, শাপলা চত্বরে হত্যার ঘটনাটিও তা থেকে মুক্ত ছিল না। বরং এখনও ওই ঘটনা নিয়ে এমন সব দাবি বা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে যার সপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। দেশি—বিদেশি কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমেও শাপলা চত্বরে নিহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি।
শোনা যায়, অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর তালিকা প্রকাশ করা নিয়ে হেফাজতের নেতাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। এক পক্ষ মনে করেছিল, অধিকারের প্রতিবেদন সঠিক তথা আদিলুর রহমানকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য শিগগিরই তাদের তালিকা প্রকাশ করা উচিত। কিন্তু সংগঠনের আরেকটি পক্ষ তখন মনে করেছিল, তালিকা প্রকাশের উপযুক্ত সময় হয়নি। ওই সময়ে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ ৭৩ জন নিহত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই সংখ্যা শতাধিক। কিন্তু শাপলা চত্বরে সত্যিই নিহতের সংখ্যা ৫৮, ৬১, ৭৩, ৯৩ নাকি শতাধিক—তার সুরাহা এখনও হয়নি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা যে সংখ্যার কথা এখন বলছে, সেটিও ভবিষ্যতে বদলে যাবে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই। কেননা এই ট্রাইব্যুনালেই মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছিল। যে বিচারে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বলা হচ্ছে, ওই বিচার ছিল প্রহসন। এমনকি ওই বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি জামায়াতের এ টি এম আজহারুল ইসলাম, যিনি কারাগারে ছিলেন, তিনি এখন জাতীয় সংসদ সদস্য।
সুতরাং, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চেহারা এমনকি বিচারের রায়ও যে বদলে যায়, সেই উদাহরণ বাংলাদেশে আছে। ফলে আওয়ামী লীগ আমলে শাপলা চত্বরে কেউ নিহত হয়নি বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হলেও এখন রাষ্ট্রীয় সংস্থাই বলছে যে, তারা নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে সরকার বদল হলে এই সংখ্যাটি অবিকৃত থাকবে কি না, সেটি বলা কঠিন।
মূলত শাপলা চত্বরের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি বিষয়ের সংঘর্ষের প্রতীক হয়ে গেছে। সব পক্ষের গ্রহণযোগ্য, পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় প্রভাবমুক্ত তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক শেষ হবে বলে মনে হয় না।
