৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ ডেলাওয়ার দ্য বুক অব আননোন আমেরিকানসঃ ক্রিস্টিনা হেনরীকেজ || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

দ্য বুক অব আননোন আমেরিকানস উপন্যাসটি শুরু হয় মেক্সিকোর একটি শান্ত, সাধারণ পরিবারের গল্প দিয়েÑ আর্টুরো আলমা রিভেরা এবং তাদের একমাত্র মেয়ে মারিবেল। একদিন স্কুলে দুর্ঘটনায় মারিবেলের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে, যার ফলে তার মানসিক বিকাশ থেমে যায়। এই দুর্ঘটনা শুধু মারিবেলের জীবনই বদলে দেয় না, বরং পুরো পরিবারের ভাগ্যকে এক অনিশ্চিত পথে ঠেলে দেয়।

মেক্সিকোতে চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক অসহায়তার কারণে, আলমা সিদ্ধান্ত নেনতারা যুক্তরাষ্ট্রে যাবে, যেখানে উন্নত চিকিৎসা এবং বিশেষ শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। সেই স্বপ্ন নিয়েই তারা পাড়ি জমায় ডেলাওয়্যারের একটি ছোট্ট শহরে, যেখানে তারা একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে বসবাস শুরু করে।

ডেলাওয়্যারে এসে রিভেরা পরিবার খুব দ্রুত বুঝতে পারেএখানে জীবন মোটেই সহজ নয়। আর্টুরো একটি মাশরুম ফার্মে কঠোর পরিশ্রমের কাজ নেন, আর আলমা ঘরে বসে মারিবেলের যত্ন নেন।

তবে ভাষা না জানার কারণে তারা প্রায়ই বিচ্ছিন্ন অসহায় বোধ করেন।

মারিবেলকে একটি বিশেষ স্কুলে ভর্তি করানো হয়, যেখানে তার ধীরে ধীরে কিছু উন্নতি দেখা যায়। কিন্তু এই উন্নতি যেমন আশার আলো দেখায় না, তেমনি পরিবারটির ভিতরে জমে থাকা চাপও বাড়তে থাকে।

এই সময়েই গল্পে আসে মেয়র টোরোÑ পানামা থেকে আসা এক কিশোর। সে তার বাবামার সঙ্গে একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। মেয়র প্রথম দেখাতেই মারিবেলের প্রতি আকৃষ্ট হয়তবে সেটা সাধারণ প্রেম নয়, বরং এক ধরনের সহানুভূতিশীল, গভীর মানবিক টান।

ধীরে ধীরে মেয়র মারিবেলের মধ্যে এক নীরব বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তারা একসঙ্গে হাঁটে, কথা বলে (যদিও মারিবেলের কথা সীমিত), এবং একে অপরের উপস্থিতিতে শান্তি খুঁজে পায়। এই সম্পর্ক উপন্যাসের সবচেয়ে কোমল আলোছায়াময় অংশ।

উপন্যাসটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলোএখানে শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং একই কমপ্লেক্সে বসবাসরত বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের কণ্ঠও শোনা যায়। কেউ এসেছে গুয়াতেমালা থেকে যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে, কেউ ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকট থেকে পালিয়ে, কেউ আবার রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে।

প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব ভাষায়, নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের গল্প বলে। ফলে উপন্যাসটি এক ধরনেরসমষ্টিগত আত্মকথাহয়ে ওঠেযেখানে প্রতিটি মানুষইঅজানা আমেরিকান

গল্পের মাঝামাঝি সময়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

ঘটনাটি ঘটে এক বিকেলে। মেয়র মারিবেল একসঙ্গে বাইরে ছিলতারা হাঁটছিল এবং নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই মারিবেলের আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে; সে হয়তো উত্তেজিত বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে মেয়র তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু দূর থেকে বিষয়টি অন্যভাবে দেখা হয়।

কিছু লোক মনে করেমেয়র হয়তো মারিবেলের প্রতি অনুচিত আচরণ করছে। এই ভুল বোঝাবুঝি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মারিবেলের মা আলমা, যিনি সবসময় মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, তিনিও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার মনে হয়মেয়ের সঙ্গে কোনো খারাপ কিছু ঘটেছে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এখানে সামাজিক পক্ষপাত বড় ভূমিকা রাখে। মেয়র একজন তরুণ লাতিনো অভিবাসীযার সামাজিক অবস্থান দুর্বল। ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মাত্রই অনেকেই তা সত্য বলে ধরে নেয়। কেউ তার দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করে না, বরং সন্দেহই প্রাধান্য পায়।

এই ভুল বোঝাবুঝি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো কমিউনিটির ভেতরের চাপ, অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তাহীনতাকে উন্মোচিত করে। মেয়রের পরিবার ভয় পায়কারণ তারা জানে, এমন অভিযোগ তাদের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, রিভেরা পরিবারও ভেঙে পড়েকারণ তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে আমেরিকায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে।

এই ঘটনাটি উপন্যাসে এক বড় মোড় আনে। মেয়রকে অপরাধী হিসেবে দেখা হয়। তার পরিবার ভয় অপমানের মধ্যে পড়ে। রিভেরা পরিবারও গভীর সংকটে পড়ে।

ঘটনার পরিণতি অত্যন্ত মর্মান্তিক।

মেয়র পুলিশের গুলিতে নিহত হয়যা পুরো গল্পকে এক গভীর ট্র্যাজেডিতে রূপ দেয়।

এই মৃত্যু শুধু একটি চরিত্রের শেষ নয়এটি একটি স্বপ্নের মৃত্যু, একটি সম্ভাবনার মৃত্যু, এবং অভিবাসী জীবনের নির্মম বাস্তবতার প্রতীক।

মেয়রের মৃত্যুর পর তার পরিবার ভেঙে পড়ে। আলমা আর্টুরো গভীর অপরাধবোধ শোকের মধ্যে ডুবে যায়। মারিবেলের জীবন আবার অনিশ্চয়তায় ফিরে যায়।

শেষ পর্যন্ত রিভেরা পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়তারা মেক্সিকোতে ফিরে যাবে।

উপন্যাসের শেষাংশে আমরা দেখিএই সব মানুষ, যারাঁহশহড়হি অসবৎরপধহং’, তাদের গল্প আসলে খুবই পরিচিত। তারা ভালোবাসে, স্বপ্ন দেখে, ব্যর্থ হয়, আবার উঠে দাঁড়াতে চায়।

ক্রিস্টিনা হেনরীকেজ অত্যন্ত সংযত কিন্তু গভীর আবেগে দেখিয়েছেনআমেরিকা শুধু একটি দেশ নয়, এটি হাজারো অচেনা মানুষের গল্পের সমষ্টি।

এই উপন্যাসের বিস্তৃত গল্প আমাদের শেখায়:

অভিবাসীরা শুধু পরিসংখ্যান নয়তারা মানুষ, তাদের জীবন, ভালোবাসা এবং বেদনা আছে।

আর সেই কারণেই, দ্য বুক অব আননোন আমেরিকানস আমাদের কাছে শুধুমাত্র একটি উপন্যাস নয়এটি এক মানবিক দলিল।

ক্রিস্টিনা হেনরীকেজ: সংক্ষিপ্ত জীবনী

জন্ম: ১৯৭৭ একজন সমকালীন আমেরিকান ঔপন্যাসিক ছোটগল্পকার, যিনি বিশেষ করে অভিবাসী জীবন, পরিচয়ের সংকট এবং বহুসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার জন্য সুপরিচিত।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা পানামা থেকে আগত একজন অভিবাসী, আর এই পারিবারিক পটভূমিই তাঁর সাহিত্যিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ছোটবেলা থেকেই তিনি বিভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে বেড়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে তাঁর লেখায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে

The Book of Unknown Americans (২০১৪), যা তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয় 

The World in Half (2009) 

Come Together, Fall Apart (২০০৬


Related Posts