হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাংলাদেশী জাহাজের নাবিকদের কথা

বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃমোবাইল ফোনে মিসাইল হামলার সর্তকবার্তা পাচ্ছি। প্রতিনিয়ত ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কে বিভিন্ন বার্তা দেওয়া হচ্ছে, বার্তা পাচ্ছিকেউ যদি হরমুজ ক্রসের চেষ্টা করো, অ্যাটাক করা হবে’, বিবিসি বাংলাকে কথাগুলো বলছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে সাগরে আটকে পড়াবাংলার জয়যাত্রা প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজএমভি বাংলার জয়যাত্রাগত ২৬শে জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে। এরপর ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেটি কয়েক দফায় চেষ্টা করেছে কিন্তু হরমুজ প্রণালি থেকে বের হতে পারেনি। বরং, এরপর থেকে জাহাজটি ঘুরছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জলসীমায়।

বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটিতে নাবিক, ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট ৩১ জন ক্রু রয়েছেন। তাদের কয়েকজন বলছেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর চোখের সামনে মুহুর্মুহু মিসাইল হামলা, কখনো বিধ্বস্ত মিসাইলের ভাঙা অংশ এসে আশপাশের কোনো জাহাজে পড়তেও দেখছেন তারা।

এমন পরিস্থিতি সেখান থেকে কবে হরমুজ পাড়ি দিয়ে নিরাপদে উপসাগরীয় এলাকা ছাড়তে পারবেন, জানেন না জাহাজটিতে থাকা বাংলাদেশী নাবিকদের কেউ।

জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বুধবার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমরা এমন একটা জায়গায় আটকা পড়ছি, ধরে নিতে পারেন এটা একটা পুকুর। আমাদের বের হওয়ার রাস্তা একটাই, সেটা হরমুজ। জানি না কবে বের হতে পারবো

জাহাজটির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে হরমুজ থেকে বের হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির অন্তত ২২৭৩টি জাহাজ। এদের মধ্যে যুক্তরাজ্যইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের জাহাজও রয়েছে।

এরই মধ্যে আটকা পড়া বাংলাদেশী জাহাজটিকে সেখান থেকে বের করে আনতে কূটনীতিক চ্যানেলে ইরানের সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগও করার কথা জানিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন বা বিএসসি ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ইরানের সাথে আলোচনা করে বাংলাদেশ জাহাজটিকে যখন বের করে আনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল, ঠিক তখন আবার সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যে কারণে এটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

প্রায় চার মাস পারস্য উপসাগরে

বাংলার জয়যাত্রাজাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ।

এরপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য নিয়ে যায় জাহাজটি। পরে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল এমভি বাংলার জয়যাত্রা।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর ওই বন্দরে জাহাজটির দুশো মিটারের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়।

এর মধ্যেও সেখানে পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য ভারতের মুম্বাই বন্দর ঠিক হলেও আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড নিরাপত্তার কথা জানিয়ে বাধা দিলে জাহাজটি গভীর জলসীমায় অবস্থান নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ই এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি।

জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান বুধবার বিবিসি বাংলাকে জানান, “সেই জানুয়ারি থেকেই গালফের মধ্যে আছি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কয়েকটি জায়গায় পণ্য আনা নেওয়ার পর আমরা বেশ কিছুদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমায় রয়েছি

প্রায় এক মাস ধরে মিনা সাকারের অদূরে গভীর সমুদ্রে অবস্থানের পর মিসাইল হামলার শঙ্কায় জাহাজটি অবস্থান বদল করে গত সোমবার।

দুই দফায় হরমুজ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ই এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলবাংলার জয়যাত্রা কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় তখন জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি।

পরে ইরান আবার হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজটি হরমুজের দিকে রওনা হয়।

কিন্তু হরমুজ প্রণালির ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে যাওয়ার পর ইরানের নৌ বাহিনী জাহাজটির হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

বুধবার জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, যুদ্ধবিরতির পর আমরা বের হয়ে আসতে কয়েকরবার উদ্যোগ নিয়েছি। দুইবার হরমুজ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পর আবার সর্তকবার্তা পেয়ে ফেরত আসতে হয়েছে।

তিনি জানান, গত সোমবার পর্যন্ত জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতেরমিনা সাকারবন্দরের জলসীমায় ছিল। পরে সেটিকে সরিয়ে এনে নোঙ্গর করা হয় শারজাহর কাছে।

এমভি বাংলার জয়যাত্রা এখন দুবাই থেকে ২৩ নটিক্যাল মাইল এবং শারজাহ বন্দর থেকে ২১ নটিক্যাল মাইল দূরে পারস্য উপসাগরে নোঙর করে আছে।

সপ্তাহের শুরুতে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজটি হরমুজের দিকে রওনা দেয়। সেখান থেকে গ্রিন সিগন্যাল না পেয়ে আবার ফেরত এসে বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমায় অবস্থান করছিল জাহাজটি।

জাহাজটিতে থাকা নাবিক কর্মকর্তারা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, যখনই জাহাজটি হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হতে গেছে, কিংবা তাদের কাছে থেকে অনুমতি নিতে গেছে তখনই সেখান থেকে ওয়ারলেস বার্তায় সর্তক করা হচ্ছে।

এমন কয়েকটি ওয়ারলেস বার্তায় ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনীর (যেটিকে সংক্ষেপ সিফা নেভি বলা হয়) পক্ষ থেকে বলতে শোনা যায়, “কোনভাবেই হরমুজ অতিক্রম করা যাবে না। হরমুজের দিকে অগ্রসর হলেই আক্রমণের শিকার হতে হবে

কয়েকদিনের যুদ্ধবিরতির পর রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম তেল শোধনাগার ফুজাইরাহতে মিসাইল হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আবারো বদলে যায়। তখন উপকূলের কাছাকাছি এলাকা থেকে আবারো মধ্য সমুদ্রে অবস্থান নেয় বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি।

জাহাজের ক্যাপ্টেন ইসলাম জানান, বর্তমানে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি থেকে ৭৪ নটিক্যাল মাইল, ইরান সীমান্ত থেকে ৪৩ নটিক্যাল মাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল দূরে গভীর সমুদ্রে নোঙর করে আছে।

Related Posts