নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে || ড. মোর্শেদ হাসান খান
অনেক আশা, অনেক অপেক্ষা, অনেক ত্যাগ—তিতিক্ষার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো। গতকাল দুপুরের দিকে আমি যখন এই লেখা লিখছি, তখন পর্যন্ত দেশের কোথাও বড় ধরনের সহিংসতা বা বড় অনিয়মের খবর পাওয়া যায়নি। টেলিভিশনে দেখছিলাম ভোটারদের দীর্ঘ সারি। অনেকে এই ভোটকে ঈদের আনন্দের সঙ্গেও তুলনা করেছেন, যদিও ভোটের আগের রাতে বেশ কিছু উদ্বেগের খবর এসেছে।
একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী বা সমর্থকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিপুল অর্থসহ স্থানীয় জামায়াত নেতা আটকের খবরও এসেছে। কোথাও কোথাও ভোট কেনার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি আগের সরকারের মতো রাতে ভোট দেওয়ার খবরও এসেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত এগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কিছু অভিযোগ ভুয়া বলেও প্রমাণিত হয়েছে। সর্বোপরি পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেই খোলা চোখে মনে হয়েছে।
এবার নির্বাচনের সবচেয়ে বড় দিক হলো তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি।
তরুণ—তরুণীরা হাসিমুখে ভোট দিচ্ছে—এমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশই আমাদের এত দিনের চাওয়া ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ গঠনে নিজের মতামত দিচ্ছে, যা জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বড় ভূমিকা রাখবে। এই তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেছেন তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে থেকেই তিনি যেভাবে তরুণসমাজের সঙ্গে মিশেছেন, তা সত্যি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। মা—বাবার সঙ্গে জাইমা রহমানের উপস্থিতি আমাদের রাজনীতির নতুন দিকনির্দেশনা দেয়।
আমরা তাঁর ব্যাপারে আশান্বিত হতে পারি। একই সঙ্গে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
বিএনপি তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের জন্য যারা কাজ করবে, যেমন—টেকনিক্যাল ও ভোকেশনালের দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। আবার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) বা অটোমোবাইলের বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন বিশ্বব্যাপী বড় সংকট, বিএনপি সেই দিকটিতে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সব মিলিয়ে বিএনপি এই জেনারেশনকে দেশের কাজে যুক্ত করতে পেরেছে। আমরা জাতিকে আশা দেখাতে পেরেছি। আমরা আশাবাদী যে নতুন প্রজন্ম বিএনপির দেশ গড়ার পলিসি গ্রহণ করেছে। এই বিষয়টি আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। বলতে পারি, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলো।
এখানে একটি কথা না বললেই নয়, গতকাল যে নির্বাচন হলো তার জন্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। প্রথম দিকে প্রশাসনের প্রায় সর্বস্তরে একটি রাজনৈতিক দল তাদের লোক বসিয়েছিল। প্রশাসনে তারা মাস্টারপ্ল্যান করেছিল। ডিসি, ইউএনও, ওসি পর্যায়ে মহাপরিকল্পনা করে তারা নিজেদের লোক বসিয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথম দিকে কোনো রকম সহযোগিতা করা হয়নি। কিন্তু জনগণ এতটাই ঐক্যবদ্ধ যে জনতার চাপের মুখে তারা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। দেশের সেনাবাহিনী দেশের স্বার্থে কাজ করেছে। আমি সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ দিতে চাই। এই একটিমাত্র শক্তি, যারা সব সময় দেশের জন্য কাজ করেছে। দেশ যখনই বিপদে পড়েছে, তখনই তারা এগিয়ে এসেছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এমন একটি চক্র ছিল, যারা আমাদের প্রিয় স্বদেশকে আফগানিস্তান বানাতে চেয়েছিল। তারা দেশের স্বাধীনতা, দেশের সংবিধান, দেশের পলিসি—সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশের জনগণ ও দেশের সেনাবাহিনী তা মেনে নেয়নি। দেশের সেনাবাহিনী প্রকৃতপক্ষে বিএনপি বা কোনো দলকে সমর্থন করেনি, তারা দেশের জনগণকেই সাপোর্ট দিয়েছে। সেনাবাহিনী বলেছে, সবার আগে দেশ। কিন্তু দিনশেষে এই বিষয়টিই বিএনপির পক্ষে গেছে। তা না হলে একটি রাজনৈতিক শক্তি যেভাবে প্রশাসন গুছিয়ে নিয়েছিল, তা সবাই জানে। এমনকি ক্যাবিনেট সেক্রেটারি পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়েছেন। তাহলে কী দাঁড়ায়? ক্যাবিনেট সেক্রেটারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। এই জাতীয় লোক প্রশাসনে থাকায় অনেক ঝামেলা হয়েছে। এমনকি উপদেষ্টাদের মধ্যেও একটি অংশ ছিল, যারা নির্বাচন চায়নি।
চার—পাঁচজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। গণতান্ত্রিক পথে বাংলাদেশ আসুক, সেটিই তাঁরা চাননি। এই ভোট হোক, সেটিই উনারা চাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। বলা যায়, গতকালের নির্বাচন সেই অপশক্তির মুখে চুনকালি দিয়েছে। তবে এখানে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে, আর কিছু নয়। জনগণ চেয়েছে দেশ গণতন্ত্রের পথে আসুক। সেই যাত্রাপথের দ্বারপ্রান্তে আজকে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের মূল শক্তি আসলে কোথায়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের জাতীয় জীবনের মহান অধ্যায়। একাত্তর আমাদের দিয়েছে নতুন একটি দেশ। এ কারণে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি পাই। অথচ আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করেছি, সেই একাত্তরকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, যেন মুক্তিযুদ্ধ বলতে আমাদের কিছুই হয়নি, যেন সেটি ছিল আমাদের ভুল। এমনকি চব্বিশের যে গণ—আন্দোলন হয়েছে, সেটিও মুক্তিযুদ্ধকে জাগ্রত করার প্রেরণাই। অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, একাত্তরের চেয়ে চব্বিশ বড়। অনেকেই চব্বিশের গণ—আন্দোলন দিয়ে একাত্তরকে ম্লান করে দিতে চান। না, প্রকৃত চিত্র কখনোই এমন নয়। এমনটি যাঁরা চেয়েছেন, তাঁরা মূলত দেশের শত্রু, তাঁরা কখনোই বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিতে চাননি। এই নির্বাচন তাঁদের গালেও চপেটাঘাত দিয়েছে।
দেশের মানুষ বিগত সরকারের তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচনের নামে কী ধরনের প্রহসন হতে পারে, তা দেশের মানুষ দীর্ঘদিন দেখে আসছে। সেই নির্লজ্জ অনিয়ম—ভোট চুরির প্রতিবাদ হিসেবেই চব্বিশের গণ—আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমেছিল। এই দিক থেকে এই নির্বাচন ছিল সর্বস্তরের জনগণের আশা—আকাক্সক্ষার চাবিকাঠি। দেশের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছে এবার তাদের হাতে ক্ষমতা আসবে। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে তাদের কথাই বলবেন। একই সঙ্গে নানা সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে দেশে আর কোনো স্বৈরাচার জন্ম নিতে পারবে না। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নতুন জনপ্রতিনিধিরা যেন জনতার ক্ষমতাকে সম্মান করেন। আর তা না করলে জনগণ এখন শত্রু—মিত্র বুঝতে শিখেছে। নিশ্চয়ই জনগণ তাদের হিস্যা বুঝে নিতে পিছপা হবে না।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হলো ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার যেকোনো পর্যায়ে ব্যত্যয় ঘটলে পুরো প্রক্রিয়াই নষ্ট হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ নেতৃস্থানীয় প্রায় সবার মুখেই আমরা গণতন্ত্রের কথা শুনেছি, নতুন বাংলাদেশের কথা শুনেছি। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আশা করা অমূলক হবে না, দেশ সত্যিকার অর্থেই ‘গণতন্ত্রের ট্রেনে উঠেছে’। আমরা আশা করব, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফলাফল সব রাজনৈতিক দল মেনে নেবে, একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নতুন সরকার গঠিত হবে। সব শেষে এটিই কাম্য।
লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
