হাঁটু ব্যথার কারণ

ডা. মোহাম্মদ আহাদ হোসেনঃ হাঁটু আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জয়েন্ট। আমাদের পুরো শরীরের উপরিভাগের ওজন অভিকর্ষের টানে মাটিতে স্থানান্তরের একমাত্র মাধ্যম এই দুই হাঁটু। এর সাথে যদি মাথায় বা কাঁধে কোন বোঝা নেয়া হয় তাও এর সাথে যুক্ত হয়। কারণে হাঁটু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। কারণে শরীরের সব থেকে শক্তিশালী জয়েন্ট হিসেবে এর দুটি অংশ রয়ে গেছে। আমাদের শরীরের যে কোনো অংশে ব্যথার জন্য চারটি বিষয় জড়িত। মাংশপেশি, লিগামেন্টস, হাড় স্নায়ুতে ইনজুরি বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এখানেও এর ব্যাতিক্রম নয়। শরীরের সব থেকে বড় দুটি হাড় বেশ কিছু মাংসপেশি লিগামেন্টস এই শক্তিশালী জয়েন্টকে নিয়ন্ত্রণ করে। লিগামেন্টসগুলোর মধ্যে কিছু ভেতরের দিকে কিছু বাইরের দিকে থাকে।

হাঁটু ব্যথার কারণ কি?

আঘাত: আঘাত হাঁটু ব্যথার অন্যতম একটি কারণ। যে কোনো বয়েসেই আঘাতজনিত ব্যথা হতে পারে। আঘাতের মাধ্যমে হাঁটু নিয়ন্ত্রণকারী মাংসপেশি, লিগামেন্টস, হাড় স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে সকল কারণে আঘাতজনিত কারণে হাঁটু ব্যথা হতে পারে।

একসিডেন্ট: একসিডেন্ট হলে কোনো কোনো সময় এটা তাৎক্ষণিক বোঝা না গেলেও পরে ব্যথা অনুভূত হয়।

অস্বাভাবিক ভার বহন করা: অস্বাভাবিক ওজন বহন করলে হাঁটুর উপর চাপ পড়ে ভেতরের বা বাইরের লিগামেন্টস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনিয়ন্ত্রিত এক্সারসাইজ: যে সব এক্সারসাইজ হাঁটুর সঙ্গে সম্পৃক্ত সে সব ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত এক্সারসাইজজনিত অতিরিক্ত চাপে ছোট মাংসপেশি বা লিগামেন্টস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যথা হতে পারে। যারা খেলাধুলা করেন তাদের ক্ষেত্রে হাঁটুর ভেতরে ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট থাকে সেটা ইনজুরি হতে পারে। এতে সঠিক ভাবে দাঁড়ানো যায় না সিঁড়িতে ওঠা যায় না। দাঁড়াতে বা সিঁড়িতে ওঠার সময় এই লিগামেন্টসগুলো লক করার কাজ করে।

ছোট খাটো ইনজুরি অবজ্ঞা করার কারণে অনেক সময় তা হাঁটুতে ক্রনিক ব্যথার কারণ হতে পারে। যেহেতু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জয়েন্টস তাই অবজ্ঞা করা ঠিক না।

হাঁটুর বিভিন্ন রোগ যাতে হাঁটুর ব্যথা হয়:

. ওস্টিও আরথ্রাইটিস

. রিউম্যটয়েড আরথ্রাইটিস

. বাত

. জয়েন্টে ইনফেকশন

অস্টিও আরথ্রাইটিস:

হাঁটু ব্যথার একটি খুব সাধারণ একটি কারণ। মাঝ বয়েসী থেকে শুরু করে অধিক বয়স্ক ব্যক্তিদের মাঝে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন কারণে এই রোগ হতে পারে।

কারণগুলোর মধ্যে এক নম্বর হলো জেনেটিক বিষয়। সাধারণত এটা জন্মগতভাবেই পেয়ে থাকেন বাবামায়ের কাছ থেকে। আর যাঁরা বিভিন্ন মেকানিক্যাল কাজ বেশি করেন, যেমন, ড্রিল মেশিন চালান, কাঠ কাটেন, করাতের কাজ করেন, ভারী জিনিস তোলেন এই ধরনের কারণে জয়েন্টগুলো একটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া যাঁরা খেলাধুলা করেন তাঁদেরও অন্যান্য মানুষের থেকে অস্টিও আরথ্রাইটিসের আশঙ্কা বেশি।

এরপর নারীর ৪৫ বছর পর, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, মেনোপোজ হয়ে যাওয়ার পর, অস্টিও আরথ্রাইটিসের আশঙ্কা থাকে। পুরুষের চেয়ে নারীর অস্টিও আরথ্রাইটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ধূমপান যাঁরা করেন, তাঁদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যাঁদের ওজন বেশি, তাঁদেরও অস্টিও আরথ্রাইটিস হওয়ার প্রবণতা বেশি। আবার জন্মগত কতগুলো হাঁড়ের রোগ আছে তাদেরও অস্টিও আরথ্রাইটিস হতে পারে। এসব হাড়ের রোগের জন্য ১০ বছর বয়সেই এই রোগ কারো কারো ক্ষেত্রে হতে পারে।

অস্টিও আরথ্রাইটিস রোগে মূলত হাঁটুর মধ্যে যে দুটি হাড় সংযুক্ত থাকে তাদের মধ্যেকার দূরত্ব কমে যায় এবং দুটি হাড়ের মাথায় আরটিকুলার কারটিলেজ নামে এক ধরনের পদার্থ থাকে যা হাড়কে পিচ্ছিল করে জয়েন্টের মধ্যে ফ্রি মুভমেন্টে সাহায্য করে সেটি ক্ষয় হয় বা নষ্ট হয়। এতে তাদের মধ্যে ঘর্ষণ হয় এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু সক্রিয় হয়ে ব্যথা করে।

অস্টিও আরথ্রাইটিস থেকে বেঁচে থাকার উপায় কি?

আক্রান্ত হওয়ার আগে ওজন কমানো, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। এরপর হাড়ের ঘনত্ব যেন ঠিক থাকে জন্য ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এগুলো ঠিকমতো খেতে হবে। নিয়মিত হাঁটুর ব্যায়াম করা। খাদ্যভ্যাস সঠিক রাখা। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করেই বার বার জয়েন্টের ভেতর বাহির থেকে ইনজেকশন নেয়ার কারণেও হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেসব জয়েন্ট আক্রান্ত হয়, যেসব জয়েন্টের জন্য ফিজিওথেরাপি, বিভিন্ন অকুপেশনাল থেরাপি আছে সেই সাহায্যকারী থেরাপিগুলো দিলে জয়েন্টগুলো ধীরে ধীরে কর্মক্ষম হয়ে যায়। ভালোর দিকে থাকে। ব্যক্তির কাজ যদি ওজন তোলা বা মেকানিক্যাল কঠিন কাজ হয়এগুলো সাধারণত অস্টিও আরথ্রাইটিস হতে সাহায্য করে। প্রয়োজন হলে তাকে পেশা পরিবর্তন করতে হবে। তবে লেখাপড়া, সাধারণ ঘরের কাজ এসব করলে কোনো সমস্যা নেই।

রিউম্যাটয়েড আরথ্রাইটিস গাউট:

রিউম্যাটয়েড আথ্রর্াইটিস একটি ক্রনিক ইনফ্লামেটোরি (জ্বালাপোড়া) ব্যধি যা হাত পায়ের ক্ষুদ্রাকারের অস্থিসন্ধির (জয়েন্ট) ক্ষতি করে থাকে। অস্টিও আথ্রর্াইটিসের ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধির তরুণাস্থি ক্ষয় হতে থাকে এবং নষ্ট হয়ে যায়।

অপরদিকে, রিউম্যাটয়েড আথ্রর্াইটিসের ক্ষেত্রে হাড়ের সংযোগস্থলের আস্তরণের ক্ষতি হয় ব্যথা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড় ফুলে যায়। যার ফলে হাড় ক্ষয় হতে শুরু করে হাড়ের গঠনে বিকৃতি দেখা দেয়। রিউম্যাটয়েড আথ্রর্াইটিস একটি অটোইমিউন ডিসঅর্ডার, কারণ এই রোগের ফলে প্রতিরোধকারী কোষগুলো ভুলক্রমে শরীরের টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে থাকে। হাড়ের সংযোগস্থল ছাড়াও রোগ দেহের অন্যান্য অঙ্গ যেমন ত্বক, চোখ, ফুসফুস রক্তনালীরও ক্ষতি করে থাকে। রিউম্যাটয়েড আথ্রর্াইটিস যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে এটি ৪০ বছর বয়সের পর বেশি হয়। নারীরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। চিকিৎসার সাহায্যে রোগের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং হাড়ের সংযোগস্থল নষ্ট হওয়া প্রতিরোধ করা যায়।

এছাড়াও গাউট নামের আরেকটি অবস্থা হয়ে হাঁটু তে ব্যথা হতে পারে। অস্থি সন্ধিতে ইউরিক অ্যাসিড জমা হয়ে এই রোগের উৎপত্তি হয়। মূত্রের মাধ্যমে প্রয়োজনের অধিক পরিমাণ ইউরিক অ্যাসিড আমাদের শরীর থেকে বের হয়ে যায়। কোন কারণে যদি আমাদের যকৃৎ অধিক পরিমাণে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি করে তখন রক্তে এর পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার খাবারের মাধ্যমে যেমন লাল মাংশ, ক্রিম রেড ওয়াইন ইতাদি গ্রহণের মাধ্যমেও এটি রক্তে বেড়ে যায় আর কিডনি যদি তা অধিক পরিমাণে ফিল্টার করতে না পারে এক্ষেত্রে ইউরিক অ্যাসিড শরীরে বেড়ে যায়।

সময়ের সঙ্গে ইউরিক অ্যাসিড অস্থিসন্ধিতে ক্রিস্টাল রূপে জমা হতে থাকে। এতে ধীরে ধীরে জয়েন্ট ফুলে যায়, প্রদাহ হয় ব্যথা হয়। আর সেই সঙ্গে অস্থিসন্ধি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। স্বাভাবিক মুভমেন্ট বাধাগ্রস্ত হয়। গাউট সাধারণত হাত পায়ের আংগুলের ছোট জয়েন্টস থেকে শুরু করে হাতের কব্জি, হাঁটু টাকনু গিড়া আক্রান্ত হয়।

Related Posts