ব্রিকস মুদ্রার ভূ—রাজনৈতিক অর্থনীতি—৬ ড. আনিস রহমান পেনসিলভেনিয়া
এই খাতভিত্তিক ঝুঁকির প্রধান কারণগুলো হলো:
ক. বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রপ্তানির সংকোচন (এষড়নধষ ঞৎধফব ঈড়হঃৎধপঃরড়হ): উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। যদি বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলার এবং ব্রিকস মুদ্রার দুটি ব্লকে বিভক্ত হয়, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের বাণিজ্যের জন্য দুটো ভিন্ন মুদ্রায় লেনদেন এবং রিজার্ভ রাখতে হবে। এর ফলে লেনদেনের খরচ (ঞৎধহংধপঃরড়হ ঈড়ংঃং) বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং অতিরিক্ত মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি (ঊীপযধহমব জধঃব ঠড়ষধঃরষরঃু) বাড়বে, যার ফলস্বরূপ উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি সুবিধা হারাবে।
খ. বিদেশী বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব (ঋউও উবঃবৎৎবহপব): বিনিয়োগকারীরা সর্বদা স্থিতিশীলতা এবং পূর্বাভাসযোগ্যতা চায়। নতুন ব্রিকস মুদ্রা যদি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় বা ডলারের মতো নির্ভরযোগ্য না হয়, তবে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা (যারা ডলারে রিটার্ন চায়) উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
গ. আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি (জরংরহম ওসঢ়ড়ৎঃ ঈড়ংঃং): উন্নয়নশীল দেশগুলো খাদ্য, তেল এবং মূলধন সরঞ্জাম (ঈধঢ়রঃধষ এড়ড়ফং) আমদানির জন্য ডলারে অর্থ প্রদান করে। যদি ডলার—বিমুখতা তৈরি হয় এবং ডলারের সহজলভ্যতা কমে যায়, তখন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান আরও দ্রুত হ্রাস পাবে। ফলে জ্বালানি এবং কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আশু প্রতিকার (জবসবফরবং ভড়ৎ উবাবষড়ঢ়রহম ঘধঃরড়হং)
ডলার—বিমুখতার এই ভূ—রাজনৈতিক টানাপোড়েনের শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত হবে নিম্নলিখিত তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া:
১. অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার: সুশাসনের মান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। (যা পূর্ববর্তী প্রবন্ধগুলোতেও জোর দেওয়া হয়েছে)।
২. মুদ্রার বৈচিত্র্যকরণ: শুধুমাত্র একটি একক মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল না থেকে, ইউরো, জাপানি ইয়েন বা সিঙ্গাপুর ডলারের মতো আরও স্থিতিশীল মুদ্রায় রিজার্ভ রাখা এবং বাণিজ্যের জন্য দ্বিপাক্ষিক মুদ্রা অদলবদল (ঈঁৎৎবহপু ঝধিঢ়ং) চুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
৩. স্থানীয় বন্ড বাজারের বিকাশ: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী ও তরল স্থানীয় বন্ড মার্কেট তৈরি করা। এর ফলে বিদেশী বিনিয়োগ স্থানীয় মুদ্রার মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যা বাহ্যিক অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেবে।
এজেন্টিক বিপ্লব: জেনারেটিভ এআই থেকে স্বায়ত্তশাসিত কর্মক্ষমতা
২০২৫ সালে প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল জেনারেটিভ এআই থেকে ‘এজেন্টিক এআই’—তে রূপান্তর। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা কেবল উত্তর দেয় না, বরং স্বায়ত্তশাসিত যুক্তি প্রয়োগ, কাজ সম্পাদন এবং ওয়ার্কফ্লো পরিচালনা করতে সক্ষম। ২০২৪—২৫ সালে জেনারেটিভ এআই দিয়ে টেক্সট বা ছবি তৈরির উন্মাদনা থাকলেও ২০২৬ সালকে ‘এজেন্টিক এআই’—এর প্রকৃত বছর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের দিকে ৪০% এন্টারপ্রাইজ অ্যাপ্লিকেশন বা ব্যবসায়িক সফটওয়্যারে কাজ—ভিত্তিক এআই এজেন্ট যুক্ত থাকবে, যা ২০২৫ সালের শুরুতে ছিল ৫% এরও কম। এই বিবর্তন ৫টি ধাপে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রথম ধাপে প্রতিটি অ্যাপে এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা সহকারী যুক্ত হয়েছে যা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার কথা। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশেষ কাজ সম্পাদনে সক্ষম এআই এজেন্ট আসবে। তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি অ্যাপের ভেতর একাধিক এআই এজেন্ট একে অপরকে সহযোগিতা করবে। চতুর্থ ধাপে ২০২৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন অ্যাপের মাঝে এআই এজেন্টদের একটি ইকোসিস্টেম বা নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। এবং পঞ্চম ধাপে ২০৩০ সালের পর এআই এজেন্টই হবে সফটওয়্যার ব্যবহারের স্বাভাবিক মাধ্যম। এই প্রযুক্তির প্রভাবে ২০৩৫ সালের মধ্যে এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার রাজস্বের ৩০% আসবে এই এআই এজেন্ট থেকে, যার বাজার মূল্য হবে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার।
পেরোভস্কাইট—সিলিকন ফ্রন্টিয়ার: জ্বালানি সার্বভৌমত্বের নতুন সংজ্ঞা
বস্তুবিজ্ঞান ও ন্যানোপ্রযুক্তি গবেষণাগারের সাফল্য ২০২৫ সালে শিল্প স্কেলে পৌঁছেছে। এর একটি উদাহরণ হল পেরোভস্কাইট—সিলিকন ট্যান্ডেম সৌর কোষ, যা প্রচলিত সিলিকন প্যানেলের সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। প্রচলিত সিলিকন প্যানেলের তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ দক্ষতা ২৯% এবং বাণিজ্যিক আউটপুট সাধারণত ২৪% এর মধ্যে থাকে। বিপরীতে, ট্যান্ডেম কোষগুলো সিলিকন এবং পেরোভস্কাইট—এই দুটি ভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে সূর্যের আলোর বর্ণালীর আরও বড় অংশ শোষণ করতে পারে, ফলে এর তাত্ত্বিক দক্ষতা ৪৩% পর্যন্ত হতে পারে। ২০২৫ সালে এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণে বড় অগ্রগতি হয়েছে। এই প্রযুক্তি কম জায়গায় বেশি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে বলে এটি শহরের ছাদ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য আদর্শ।
উপসংহার: বহুমুখী বিশ্বের সন্ধানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পথনকশা
ব্রিকস জোটের উদ্দেশ্য ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো, কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জটি একটি অপ্রমাণিত একক মুদ্রা প্রবর্তনের মাধ্যমে নয়, বরং নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সুশাসনের মানদন্ড উন্নত করে হওয়া উচিত। প্রথম পর্বে যেমন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে ‘দৃষ্টান্তের শক্তি’ (চড়বিৎ ড়ভ ঊীধসঢ়ষব) উপেক্ষা করা ব্রিকসের মূল দুর্বলতা, তেমনি এই ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যে: একটি বিশ্বস্ত রিজার্ভ মুদ্রা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক আকারের ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে আইনের শাসন (জঁষব ড়ভ খধি), বাজার অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপহীনতা, এবং আন্তর্জাতিক পুঁজি প্রবাহের প্রতি অবাধ উন্মুক্ততার ওপর। ব্রিকস মুদ্রা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা একটি রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা হতে পারে, তবে এটির জন্য বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ডলারের আধিপত্য কেবল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি ব্যবস্থার নাম যেখানে তারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। তবে আবেগপ্রসূত হয়ে ডলারকে পুরোপুরি বর্জন করাও বর্তমানে আত্মঘাতী হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য একটি ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ অর্থনৈতিক কূটনীতিই হবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। একদিকে ব্রিকসের নতুন পেমেন্ট সিস্টেম এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সুবিধা গ্রহণ করা, অন্যদিকে পশ্চিমা বাজারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক মুক্তি নিহিত। ব্রিকস মুদ্রা সফল হোক বা না হোক, এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তা বিশ্বকে একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বহুমুখী (গঁষঃরঢ়ড়ষধৎ) ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হবে। শেষ পর্যন্ত, একটি বিশ্বস্ত রিজার্ভ মুদ্রা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক আকারের ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা এবং বাজারের উন্মুক্ততার ওপর—যা ব্রিকস জোটকে ভবিষ্যতে প্রমাণ করতে হবে।
২০২৬ সালের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পূর্বাভাস। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জে.পি. মর্গানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মার্কিন ও বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার সম্ভাবনা ৩৫%। তবে এজেন্টিক এআই—এর প্রভাবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে। বৈশ্বিক হেডলাইন মূল্যস্ফীতি ৪.৪% এ নেমে আসবে বলে ধারণা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রে এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি (প্রায় ৩.০%) থাকতে পারে। ২০২৬ সালে মার্কিন প্রবৃদ্ধির হার ১.৮%, চীনের ৫.০% এবং ইউরো জোনের ১.১% হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সংস্কারের ওপর নির্ভর করে ৪.৮% এ পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাইভেট ক্রেডিট এবং জ্বালানি রূপান্তর খাতে অর্থায়ন গুরুত্ব পাবে এবং এশিয়ার বাজারগুলো বৈশ্বিক বিনিয়োগের বড় অংশ আকর্ষণ করবে। সংক্ষেপে, ২০২৬ সাল হবে প্রযুক্তির বাস্তবিক প্রয়োগের বছর। তবে ঐতিহাসিক ভূ—রাজনৈতিক বিভাজন এবং সার্বভৌমত্ব কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা এই অগ্রগতিকে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যোগাযোগঃ
ধহরং@ধহরংৎধযসধহ.ড়ৎম
িিি.ধহরংৎধযসধহ.ড়ৎম
