নির্বাচন ২০২৬ঃ অভিনন্দন বিএনপি
সবসময় বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলসমূহ এবং রাজনীতিকদের প্রতিশ্রম্নতির ফুলঝুরি দেখে আসছে দেশের জনগণ। সেইসব প্রতিশ্রম্নতি বাস্তবায়ন হলে দেশটি সোনার বাংলা হয়ে উঠত। বাস্তবে দেখা গেল রাজনীতিকরা দেশ গড়ার জন্য বা দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য ক্ষমতাসীন হননি। ক্ষমতায় আসীন হয়ে তারা নিজের এবং সাঙ্গপাঙ্গসহ আত্মীয়—স্বজনদের ভাগ্যোন্নয়ন করেছেন। রাজনীতিকদের পাশাপাশি তিনবার মিলিটারি ক্ষমতা দখল করে ক্ষমতায় গেছে। দুুই জেনারেল উর্দি খুলে রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতিক হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেছেন। তৃতীয় জন ছিলেন সিভিল সরকারের পর্দার আড়ালে। তবে তিনি উর্দি খোলেননি, রাজনীতিতে নামও লেখাননি। নির্বাচন আয়োজন করে বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে আসেন। জনগণ প্রথম দুই জেনারেলকেই আপাতভাবে স্বাগত জানিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল তারা অন্তত সিভিলিয়ান রাজনীতিকদের মত দুনীর্তিবাজ হবেন না। প্রেসিডেন্ট জিয়া আর্থিকভাবে কোনো দুনীর্তি করেছেন এমন কথা কেউ জানে না, বলেও না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরশাদ এমনই অর্থ নয়—ছয় করেছেন যে, তার শাসনামলেই লন্ডনের সানডে টাইমসের মত ব্রডশিট কাগজের অর্ধ পৃষ্ঠাব্যাপি একটি খবর ছাপা হয় ১৯৮৭ সালে। খবরের শিরোনাম ছিল ‘দ্য রিচ প্রেসিডেন্ট অব আ পৌরেস্ট কান্ট্রি’। সেই সময় তার জেনারেলদের যারা বিভিন্ন সিভিলিয়ান দায়িত্বে ছিলেন ক্যান্টনমেন্টের বাইরে তাদেরকে জনগণ ‘টেন পারসেন্ট’ বলে আখ্যায়িত করত।
রাজনীতিকদর মধ্যে সবচেয়ে সৎ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তিনি তার দলের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে কম্বল চুরির অভিযোগ করেছেন। এমন কি প্রকাশ্য জনসভায় দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেছেন ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি’।
সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই যে নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন প্রার্থীর এবং দলের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার উৎস কী? বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নীতিমালায় নিশ্চয় এই জবাবদিহিতার কথা আছে। নিশ্চয় প্রত্যেক প্রার্থীর আর্থিক সম্পদ ও আয়—ব্যয়ের হিসাব দেয়ার কথা আছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যদি সেসব শর্ত পূরণ না করে নির্বাচন করেন, সেই নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে?
আরেকটি বিষয়ও এখানে বলা জরুরী। বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ। এই দেশের ২০২৩—২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ১০ কোটি ২০ লক্ষ বা ৫৯.৫৩% মানুষ গ্রামে বাস করেন (বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী)। যে দেশে অধিকাংশ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য নানাবিধ কাজ করেন, একাধিক কাজ করেন এবং উপার্জনের বৈধতা—অবৈধতা নিয়ে মাথা ঘামান না, সে দেশের ভোটারদের খুব অল্প অর্থে কিনে নেয়া যায়। এবারের নির্বাচনে আধুনিক পদ্ধতিতে ভোটারদের কেনার তথ্য ফাঁস হয়েছে। অতএব এই অন্যায়টিও নির্বাচনের আগে হয়েছে এবং নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যারা কথা বলেছেন, কাজ করেছেন এমন তথাকথিত ব্যক্তিরা নিরবতা পালন করছেন।
এর আগে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ, বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি লতিফুর রহমানের অধীনে তিনটি নির্বাচন হয়। প্রথম নির্বাচন হয় অন্তর্বতীর্ সরকারের অধীনে। আর পরের দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম দুটি ঠিকমত হলও শেষেরটি প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে পারেননি। ফলে এই নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্বহীনতা এবং দেশ ও জনগণ বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকার কারণে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার মত অনন্য একটি কাজসহ দেশকে লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রির তালিকা থেকে তুলে আনার প্রক্রিয়ায় সফল হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করেও নিজেদের লুটপাট ও দুনীর্তি এবং নির্বাচনকে জনগণ থেকে বিযুক্ত করার কারণে ছিটকে পড়ে।
যারা অন্তর্বতীর্ সরকারে আছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরব তারা শুধু শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিভিন্ন কাজের বিরোধী হলে তারা দলীয় নেত্রীসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে থাকতেন, তারা সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগ এবং একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন না। এই জায়গাটিতেই এই অন্তর্বতীর্ সরকার এবং অন্য প্রায় সব রাজনীতিকরা ভুল করে ফেলেছেন।
১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠেননি, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী বিহারীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায়। এমনকি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও যে রাজাকার, আলবদর, আল শামসের সদস্যরা পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর সদস্যদের গণহত্যা, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজনদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, নারীদের ধর্ষণে সহায়তা করেছিল, তাদের শাস্তির ব্যাপারে বলেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ আছে হত্যা—খুন—ধর্ষণের, কেবল তাদেরই বিচার করা হবে। তিনি অন্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন করে তার পতন ঘটানোর পর এরশাদসহ অন্য কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এরশাদকে গুলশানের একটি বাড়িকে কারাগার বানিয়ে আটক রাখা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসাবে। কারণ এরশাদ পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও বেগম জিয়া কোনো প্রতিশোধ নিতে চাননি (স্মরণ করা যেতে পারে, হোটেল পূর্বাণীতে এরশাদের পুলিশ কী দুর্ব্যবহার করে দরোজা ভেঙে রুমে ঢুকে বেগম জিয়াকে গ্রেফতার করেছিল ১৯৮৬ সালে)।
অন্তর্বতীর্ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অধীনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। অন্য অন্তর্বতীর্ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনে সেই সাময়িক সরকার কোনো পক্ষে ছিল না। কিন্তু এই নির্বাচনে ড. ইউনুস নিজে নির্বাচনে না দাঁড়ালেও তার প্রিয়ভাজন দল দাঁড়িয়েছে। আর গণভোট তার নিজস্ব এজেন্ডা। তিনি জনগণের ওপর ছেড়ে না দিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রতি সমর্থন চেয়ে কথা বলেছেন। সবচেয়ে আশার কথা, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিপুল আসন পেয়ে জয়লাভ করেছে বিএনপি। কারণ বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তবে আগের চেয়ে শক্তি সঞ্চয় করেছে জামায়াত। তাদের একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, একাত্তর বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের উৎস। মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। অভিনন্দন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং এর নেতা তারেক রহমানকে। তিনি আমাদের দেশের পরবতীর্ প্রধানমন্ত্রী।
