বিশ^ সংবাদ মাধ্যমে এই নির্বাচন
বিশেষ প্রতিবেদনঃ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে ঐদিনই খবর প্রচার করে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমে। এখানে কয়েকটি খবর উদ্ধৃত করা হলো।
বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান, আল—জাজিরা এবং সিএনএনসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে নির্বাচনের চিত্র ও বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।
এএফপি
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভোট দেওয়ার পর একে একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ থেকে মুক্তি পেয়ে ‘নতুন স্বপ্নের’ পথে যাত্রা বলে অভিহিত করেছেন। এএফপি বলছে, প্রায় ১০ লাখ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের কড়া পাহারায় এই ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির তারেক রহমান তাঁর দল ক্ষমতা যাওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনের আগে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ‘তথ্য—সন্ত্রাস’ নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বিষয়টি এএফপি বড় করে তুলে ধরেছে। তাদের মতে, কোটি কোটি তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্যের ‘সুনামি’ বয়ে গেছে।
রয়টার্স
বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তরুণ ভোটার বা জেন—জির প্রত্যাশাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। রয়টার্স বলছে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া এই তরুণেরা মূলত কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং নির্ভয়ে কথা বলার অধিকারের দাবিতে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ ভোটারের এই দেশে প্রার্থীরা যদি আগের মতো পুরোনো ধারার রাজনীতি করেন, তবে তা সফল হবে না। এ ছাড়া কৃষি খাতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মতো গ্রামীণ জনপদের দাবিগুলোও তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ২৪ বছর বয়সী প্রমিলা রানী দাসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘুরা সব সময় একটি ‘ট্যাগ’ নিয়ে বেঁচে থাকে। তারা এমন এক নতুন বাংলাদেশ চায়, যেখানে ধর্ম—বর্ণনির্বিশেষে সবাই মানুষ হিসেবে শান্তিতে বাস করতে পারবে।
আল—জাজিরা
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল—জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ ‘গণতন্ত্রের ট্রেনে’ চড়ে বসেছে এবং দ্রুতই গন্তব্যে পৌঁছাবে। নির্বাচন কমিশন জানায়, বেলা ২টা পর্যন্ত ভোট পড়ার হার ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে এই নির্বাচনকে ২০০৮ সালের পর প্রথম ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সংবিধানে পরিবর্তনের বিষয়ে আয়োজিত ‘গণভোট’ বা রেফারেন্ডামকে তারা অভ্যুত্থানের একটি অন্যতম উত্তরাধিকার হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আল—জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই নির্বাচন মূলত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের মধ্যে লড়াই। তারেক রহমান যেখানে দুর্নীতিবিরোধী প্রচারে এগিয়ে আছেন, সেখানে শফিকুর রহমান তাঁর দলকে একটি আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য শক্তি হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
বিবিসি
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই প্রথম নির্বাচন। ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে ভোট গণনা শুরু হওয়ার তথ্য জানিয়ে বিবিসি বলছে, এবারের লড়াই মূলত বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। ২০২৪ সালের গণ—আন্দোলনে নিহতদের বিচার এবং হাসিনা সরকারের ওপর আনা দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটও তাদের প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
ভোটাররা কেবল সংসদ নির্বাচনের জন্যই নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তনের ওপর একটি গণভোটেও অংশ নিয়েছেন। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই গণভোটটি মূলত ‘পুরোপুরি ভেঙে পড়া’ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সংস্কার করার একটি প্রচেষ্টা।
দ্য গার্ডিয়ান
যুক্তরাজ্যের আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের একক সাক্ষাৎকারের ওপর। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ফেরা তারেক রহমানকে আগামীর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে গার্ডিয়ান লিখেছে, তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা আপসহীন নীতির অঙ্গীকার করেছেন।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে এবং যেকোনো নতুন সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সিএনএন
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে একটি ভিন্ন ও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। তাদের মতে, ‘বিপ্লবে জিতেছে জেনারেশন জি, কিন্তু নির্বাচনে রাজত্ব করছে পুরোনো রাজনীতিকেরাই’।
সিএনএন বলছে, তরুণেরা যে নতুন ধারার রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিল, রাজপথের সেই আকাক্সক্ষা নির্বাচনের মাঠে পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটেনি। এ ছাড়া নারীদের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে ইসলামপন্থী দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে তরুণদের একাংশের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার অনুভূতির কথাও উল্লেখ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
