যেসব কারণে স্ট্রোকের ঝঁুকি বাড়ে
স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালির দুর্ঘটনাকেই স্ট্রোক বলা যায়। এই দুর্ঘটনায় রক্তনালি বন্ধও হতে পারে, আবার ফেটেও যেতে পারে। এ কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। স্ট্রোক সম্পূর্ণই মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতাজনিত রোগ।
স্ট্রোকে আক্রান্তের হার দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবেই এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার বেশি লক্ষ করা গেলেও যে কোনো বয়সেই তা হতে পারে। ৫০ বছর বয়সের পর প্রতি ১০ বছরে স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। নারীদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার কিছুটা কম।
যেসব কারণ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে—
♦ অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড়ো কারণ। রক্তচাপের রোগী যারা নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার করে না বা কয়েক দিন খেয়ে প্রেশার কমে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেয় বা মনে করে উচ্চরক্তচাপে তার শারীরিক কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তাই রক্তচাপের ওষুধ সেবন করে না।
♦ ধূমপান, তামাকপাতা, গুল, জর্দা, মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবন।
♦ অতিরিক্ত টেনশন, হৃদরোগ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে বেশি মাত্রায় চর্বি বা অতিমাত্রায় কোলেস্টেরলের উপস্থিতি।
♦ অনিয়ন্ত্রিত অলস জীবন যাপন করা, বেশি বেশি চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়া, স্থূলতা বা অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় গ্রহণ এবং অধিক পরিমাণে লবণ খাওয়া।
♦ কিছু কিছু ওষুধ যা রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় যেমন অ্যাসপিরিন, ক্লপিডগ্রেল প্রভৃতি ব্যবহারে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
♦ ঘুমের সময় নাক ডাকা, ঘুমের সময় শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গ।
♦ যে কোনো ধরনের প্রদাহ অথবা ইনফেকশন এবং জন্মগতভাবে ব্রেনে কিংবা মস্তিষ্কে সরু রক্তনালি থাকা।
♦ অনেক সময় বংশানুক্রমে বা পূর্বের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও দূরবর্তী রক্তনালি বন্ধ হওয়ার কারণেও স্ট্রোক হতে পারে।
যারা আগে থেকে বিভিন্ন রকমের হূদেরাগে ভোগে যেমন: ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ, হার্টের ভাল্বে সমস্যা, অনিয়মিত হূৎস্পন্দন, ইতিপূর্বে মিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি। স্ট্রোকের লক্ষণসমূহ :
♦ শরীরের কোথাও বা একাংশ অবশ ভাব লাগা কিংবা দুর্বল বোধ করা বা প্যারালাইসিস। পা, হাত, মুখ অথবা শরীরের ডান বা বাম অংশ অবশ হয়ে যাওয়া, পা দুটিতে দুর্বল বোধ করা।
♦ চলাফেরা করতে না পারা, চলাফেরায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রমে অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়া।
♦ কথা বলতে সমস্যা হওয়া, বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পতিত হওয়া, কথা জড়িয়ে আসা, অস্পষ্ট হওয়া এবং একেবারে কথা বলতে বা বুঝতে না পারা।
♦ এক চোখ বা দুই চোখেই ক্ষণস্থায়ী ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টি ঘোলা লাগা বা একেবারেই না দেখা।
♦ হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘোরা, হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য হতবিহবল হয়ে পড়া, বমি বমি বোধ অথবা বমি করা।
♦ স্ট্রোকের মারাত্মক উপসর্গ হচ্ছে অজ্ঞান হওয়া, খিঁচুনি, তিব্র মাথাব্যথা ও বমি।
স্ট্রোক হলে কী চিকিৎসা দিতে হবে :
♦ রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। যদি খেতে না পারে, তবে নাকে নল দিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রস্রাব ও পায়খানা যাতে নিয়মিত হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রয়োজনে প্রস্রাবের রাস্তায় ক্যাথেটার দিতে হবে। চোখ, মুখ ও ত্বকের যত্ন নিতে হবে। বেডসোর প্রতিরোধ করার জন্য নিয়মিত পাশ ফেরাতে হবে।
♦ উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি অনেক স্ট্রোক রোগীর হার্টের রোগ থাকে। এসব ক্ষেত্রে কারডিওলজিস্টের পরামর্শের প্রয়োজন হয়।
♦ অন্যান্য চিকিৎসা স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী করা হয়। রক্তক্ষরণের কারণে স্ট্রোক হলে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
♦ একজন স্ট্রোক রোগীর প্রয়োজন হয় নিউরোলজিস্ট ও নিউরোসার্জনের। অনেক স্ট্রোক রোগীর অপারেশন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
♦ অনেক রোগীর শ্বাসকষ্ট, বেডসোর প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়। সুতরাং রেসপিরেটরি মেডিসিন স্পেশালিস্ট, প্লাস্টিক সার্জনসহ সবার সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
♦ রোগীর অঙ্গ সঞ্চালন করে জড়তা কাটিয়ে তুলতে রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপিস্ট প্রয়োজন হয়।
♦ রোগী কথা বলতে না পারলে প্রয়োজন স্পিচ থেরাপিস্টের।
♦ স্ট্রোক কেয়ার ইউনিট, সমন্বিত স্ট্রোক কেয়ার টিমের ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসায় আসবে সুফল, রোগী ও রোগীর স্বজন হবে চিন্তামুক্ত, রোগী লাভ করবে আরোগ্য।
