৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ নেভাদা গার্লচাইল্ডঃ টুপেলো হাসম্যান || আবদুল্লাহ জাহিদ
আমেরিকার নেভাদা বললে চোখের সামনে প্রথমেই ভেসে ওঠে লাস ভেগাসের ঝলমলে আলো, ক্যাসিনোর রঙিন রাত, কিংবা রেনোর বিনোদনজগত। কিন্তু সেই আলোর ঠিক পেছনেই আছে আরেক নেভাদাÑধূলো, দারিদ্র্য, ভাঙা পরিবার, মদ, জুয়া, সরকারি সাহায্যের চেক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নেভাদা। টুপেলো হাসম্যান তাঁর প্রথম উপন্যাস গার্লচাইল্ডে আমাদের নিয়ে যান সেই অন্ধকার প্রান্তরেÑরেনোর কাছাকাছি এক জরাজীর্ণ ট্রেলার পার্কে। সেখানেই বড় হচ্ছে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রোরি ডন হেন্ড্রিক্সÑমেয়ে, যার বয়স অল্প, অথচ জীবনের নিষ্ঠুর পাঠ সে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চেয়েও বেশি পড়ে ফেলেছে। উপন্যাসটি ২০১২ সালে থেকে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে আমেরিকান লাইব্রেরি এসোসিয়েশনসহ একাধিক স্বীকৃতি লাভ করে।
গার্লচাইল্ড—কে প্রচলিত অর্থে নিছক ‘প্রেমের উপন্যাস’ বলা কঠিন। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু সেই প্রেম গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো নয়। আছে মায়ের প্রতি মেয়ের আকুল ভালোবাসা, নারীদের পরস্পরের প্রতি অসম্পূর্ণ মমতা, একটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়ের আকাক্সক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনকে ভালোবাসতে শেখার সংগ্রাম। এই অর্থে গার্লচাইল্ড প্রেমের এক গভীরতর কাহিনীÑযেখানে ভালোবাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপ হয়ে ওঠে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
স্প্যানিশ Calle de las Flores কথাটির অর্থ প্রায় ‘ফুলের রাস্তা’। নামটি শুনলে যে সৌন্দর্যের ছবি মনে আসে, বাস্তবের Calle তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি রেনোর উপকণ্ঠে এমন এক ট্রেলার পার্ক, যেখানে স্বপ্নের চেয়ে হতাশার বাসিন্দা বেশি। একসময় জায়গাটিকে মধ্যবিত্ত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল; কিন্তু বিনিয়োগকারীরা সরে যায়, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত ‘de las Flores’ অংশটিও সাইনবোর্ড থেকে হারিয়ে যায়, থেকে যায় শুধু ÔCalleÕ, শুধু রাস্তা।
এই ভগ্ন জনপদই রোরি ডনের পৃথিবী।
এখানে মানুষ বেঁচে থাকে মাসের প্রথম ও পনেরো তারিখের অপেক্ষায়Ñ বেতন বা সরকারি সাহায্যের টাকা আসবে, কিছু বিল মেটানো হবে, আবার কিছু টাকা হারিয়ে যাবে জুয়া, মদ কিংবা অন্য কোনো আসক্তির অন্ধকারে। গার্লচাইল্ড—এর নেভাদা তাই পর্যটকের নেভাদা নয়; এটি আমেরিকার সেই প্রান্তিক মানুষের ভূগোল, যাদের গল্প সচরাচর মূলধারার সাহিত্য কিংবা সমাজ দেখতে চায় না।
রোরি ডন হেন্ড্রিক্স উপন্যাসটির কথক এবং প্রাণকেন্দ্র। তার চারপাশের মানুষ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, সে এমন একটি পরিবারে জন্মেছে যেখানে ব্যর্থতা যেন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। ফলে আশ্চর্য রকম মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও নিজের সম্পর্কে তার ধারণা ভয়াবহ রকম নিচু। অথচ স্কুলে রোরি অসাধারণ।
সে পড়তে ভালোবাসে, বানানে দুর্দান্ত, পরীক্ষায় ভালো ফল করে। শিক্ষকরা তার মেধা দেখে বিস্মিত হন। কিন্তু Calle —র বাস্তবতায় ভালো ছাত্রী হওয়াটাও কখনো কখনো বিপদ। কারণ মেধা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়; আর আলাদা হওয়া মানেই নিজের দারিদ্র্যকে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া। এমনকি একটি spelling bee —তে আরও এগিয়ে গেলে তাকে এমন এক সামাজিক জগতে যেতে হবে, যার উপযুক্ত পোশাক বা পারিবারিক সামর্থ্য তার নেইÑএই উপলব্ধি তার প্রতিভার আনন্দকেও সংকুচিত করে দেয়।
রোরি’র ট্র্যাজেডি এখানেইÑসে এত বুদ্ধিমান যে নিজের বন্দিত্ব বুঝতে পারে, অথচ এত ছোট যে সেই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় জানে না।
রোরি’র মা জোহানা জো উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল চরিত্রগুলোর একটি। তাঁকে সহজে ‘খারাপ মা’ বলে বিচার করলে হাসম্যানের উপন্যাসের গভীরতাই হারিয়ে যাবে।
জোহানা নিজেও এক ভাঙা জীবনের উত্তরাধিকার বহন করছেন। অল্প বয়সেই মা হয়েছেন, তাঁর চার ছেলে বাবার সঙ্গে থাকতে চলে গেছে। তিনি ট্রাক স্টপে কাজ করেন, মদ্যপান করেন, পুরুষের দৃষ্টি ও টিপসের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজের জীবনই যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তখন মেয়েকে নিরাপদ পৃথিবী দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর কোথায়?
তবু তিনি রোরি’কে ভালোবাসেন।
সেই ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা তাঁর জানা নেই। দিনের আলোয় মা—মেয়ের সম্পর্ক কখনো রুক্ষ, কখনো দূরত্বপূর্ণ। কিন্তু রাতে, রোরি ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে, মা দরজার কাছে এসে তাকে আদরের একটি নামে ডাকেন—-‘girlchild’। সেই ডাকের মধ্যেই উপন্যাসের নামের গভীর আবেগ লুকিয়ে আছে।
এই সম্পর্ক গার্লচাইল্ড—এর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রেমের সম্পর্ক। একজন মা তাঁর মেয়েকে ভালোবাসছেন, কিন্তু নিজের ক্ষত, দারিদ্র্য ও আসক্তির কারণে তাকে যথেষ্ট রক্ষা করতে পারছেন না। আর একটি মেয়ে মায়ের দুর্বলতা বুঝতে শিখেও তাঁকে ভালোবাসা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারছে না।
রোরি’র দাদি র্শালি রোজ নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক নন। তাঁর নেশা জুয়া। তিনি স্লট মেশিনের আকর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেন না। তাঁর জীবনেও পুরুষ, সহিংসতা, দারিদ্র্য ও ভুল সিদ্ধান্তের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
এখানে হাসম্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনেনÑদারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; কখনো কখনো এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত একটি মানসিক ও সামাজিক উত্তরাধিকার।
দাদি থেকে মা, মা থেকে মেয়েÑনারীদের জীবনে একই ধরনের বিপদ যেন বারবার ফিরে আসে।
মানুষ যখন রোরিকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন আশ্চর্যভাবে একটি বই তার আশ্রয় হয়ে ওঠেÑ দ্য গার্ল স্কাউট হ্যান্ডবুক।
লাইব্রেরি থেকে পাওয়া পুরনো বইটি রোরি বারবার পড়ে। কীভাবে হারিয়ে গেলে পথ খুঁজতে হয়, কীভাবে বিপদে টিকে থাকতে হয়, কীভাবে দায়িত্ববান ও সাহসী হতে হয়Ñএসব নিয়ম তার কাছে নিছক গার্ল স্কাউট হওয়ার নির্দেশনা নয়; হয়ে ওঠে জীবনযাপনের সংবিধান।
কারণ রোরি প্রকৃত গার্ল স্কাউটের মতো নিরাপদ মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হচ্ছে না। তার চারপাশে ক্যাম্পিংয়ের বিপদের চেয়ে ভয়ংকর বিপদ রয়েছে ঘরের মধ্যেই।
এই জায়গায় হাসম্যান অসাধারণ এক সাহিত্যিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছেন। গর্ল স্কাউট হ্যান্ডবুক যে আদর্শ আমেরিকান শৈশবের কথা কল্পনা করেÑনিরাপদ পরিবার, শৃঙ্খলা, সততা, আত্মনির্ভরতা— রোরির জীবন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তবু বইটির নিয়মগুলোকে নিজের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে সে যেন নিজেই নিজের অভিভাবক হয়ে উঠতে শুরু করে।
লাইব্রেরিও তাই উপন্যাসে বিশেষ তাৎপর্য পায়। মিসেস রিডরিক নামের লাইব্রেরিয়ান রোরির জীবনের অল্প কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একজন, যিনি তাকে অপমান বা শোষণ না করে মানুষ হিসেবে দেখেন। বইয়ের তাকের মাঝখানে রোরি যে শান্তি পায়, তা নিজের ঘরেও সবসময় পায় না।
উপন্যাসের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অংশ শুরু হয় যখন মা জোয়ানা কাজের প্রয়োজনে রোরিকে প্রতিবেশী কিশোরী ক্যারলের তত্ত্বাবধানে রেখে যেতে বাধ্য হন।
ক্যারল নিজেও নিরাপদ নয়। তার বাবা, যাকে সবাই হার্ডওয়ার ম্যান নামে চেনে, নিজের মেয়েকেও নির্যাতন করেছে। সেই মানুষটির শিকার হয়ে পড়ে রোরিও।
এখানে হাসম্যান যৌন নির্যাতনকে উত্তেজক দৃশ্য হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন একটি শিশুর মনের মধ্যে সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে ভয়, লজ্জা, নীরবতা ও আত্মঘৃণায় পরিণত হয়। বইয়ের বিন্যাসেও এই ট্রমা দৃশ্যমান। কিছু ভয়াবহ ঘটনার জায়গায় কালো দাগের মতো কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে, যেন ভাষাও সেখানে থমকে গেছে।
একপর্যায়ে রোরি মাসের পর মাস কথা বলা বন্ধ করে দেয়। বাইরে থেকে সে হয়তো স্কুলে যাচ্ছে, বই পড়ছে, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে; কিন্তু ভেতরের শিশুটি ভয়াবহভাবে আহত।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, যে বড়দের তাকে রক্ষা করার কথা, তাদের অনেকেই নিজেরাই আহত, আসক্ত, অসহায় কিংবা বিপজ্জনক।
এই পর্যায়ে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারেÑএত অন্ধকারের মধ্যে প্রেমের গল্প কোথায়?
আসলে গার্লচাইল্ড—এর প্রেম প্রচলিত নারী—পুরুষের রোমান্টিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং উপন্যাসটি বারবার প্রশ্ন তোলেÑএকটি মেয়ে ভালোবাসা চিনবে কীভাবে, যদি তার চারপাশে ভালোবাসার প্রায় সব নমুনাই বিকৃত হয়?
কেউ ভালোবাসে কিন্তু রক্ষা করতে পারে না। কেউ স্নেহের নামে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। কেউ পরিবার হয়েও নিরাপদ নয়। কেউ ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শরীরের ওপর আক্রমণ চালায়।
এই বিভ্রান্ত পৃথিবীর মধ্যে রোরিকে নতুন করে শিখতে হয়Ñভালোবাসা মানে ভয় নয়; ভালোবাসা মানে নিজের সত্তাকে বিলীন করা নয়; এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে রক্ষা করাও ভালোবাসার একটি রূপ।
রাষ্ট্র রোরিকে দেখে একটি কেস হিসেবে। স্কুল দেখে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে। সমাজ দেখে টেইলার—পার্ক গার্ল হিসেবে। কিন্তু রোরি নিজেকে কীভাবে দেখে?
এই বিভিন্ন কণ্ঠের সংঘাতেই উপন্যাসের সত্য তৈরি হয়।
কাগজের সরকারি রিপোর্টে হয়তো কয়েকটি বাক্যে একটি পরিবারের অবস্থা লেখা যায়, কিন্তু সেই রিপোর্ট বলতে পারে না রাতে একটি শিশু কীভাবে ভয় পায়, কেন সে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, কিংবা কেন পুরনো গার্ল স্কাউট হ্যান্ডবুক বুকে নিয়ে সে নিরাপত্তা খোঁজে।
হাসম্যান পাঠককে হলিউড—ধাঁচের মুক্তি দেন না। কোনো ধনী আত্মীয় এসে রোরিকে উদ্ধার করে না; কোনো আদর্শ পুরুষ এসে তার জীবন বদলে দেয় না; এমনকি সমাজও হঠাৎ ন্যায়পরায়ণ হয়ে ওঠে না।
বরং ধীরে ধীরে রোরি নিজেই বুঝতে শেখে, উদ্ধারের অপেক্ষা করলে হয়তো কেউ আসবে না।
তাকে নিজেকেই নিজের পাশে দাঁড়াতে হবে।
গার্লচাইল্ড পড়ার পর মনে থাকে একটি মেয়ে রোরি ডন হেন্ডিক্স।
ধুলোময় Calle —র মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট মেয়ে। তার হাতে পুরোনো Girl Scout Handbook । চারপাশের বড়রা নিজেদের জীবন সামলাতেই ব্যর্থ। অথচ শিশুটি শিখছে কীভাবে পথ হারালে দিক খুঁজে নিতে হয়। এটাই সম্ভবত উপন্যাসটির সবচেয়ে সুন্দর প্রতীক।
লেখক পরিচিতি: টুপেলো হাসম্যান
টুপেলো হাসম্যান সমকালীন মার্কিন কথাসাহিত্যিক। তিনি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। গার্লচাইল্ড তাঁর প্রথম উপন্যাস; ২০১২ সালে এটি প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি প্রকাশের পর তাঁর স্বতন্ত্র ভাষা, রোরি ডন—এর অভিনব কণ্ঠ এবং আমেরিকার প্রান্তিক জীবনের নির্মোহ অথচ সহানুভূতিশীল চিত্রায়ন ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করে।
