হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্টকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা || বিশ^জুড়ে নতুন আশাবাদের জন্ম

বাঙালী প্রতিবেদনঃ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং স্ত্রী পেং লিউয়ানকে নিয়ে এন্ড্রুজ এয়ারফোর্স বেস থেকে হোয়াইট হাউজে পৌঁছলে তাদের লালগালিচা সংবর্ধনা দেয় হোয়াইট হাউজ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ফাস্টর্লেডি মেলানিয়া তাদের স্বাগত জানান। তারা হোয়াইট হাউহজের ব্যালকনি থেকে মিলিটারি গার্ড অব অনার ও কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় আকাশ দিয়ে দুটি ফাইটার বিমান উড়ে যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ঘুরে দেখান। তারা ওভাল অফিসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন এবং ডিনারে যোগ দেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শি’র সাথে বৈঠককে ‘গ্রেট মিটিং’ বলে উল্লেখ করেন। সিবিএস নিউজ বলছে, প্রেসিডেন্ট শি জানান, অনেক ইস্যুতে তাদের মধ্যে ‘কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ হয়েছে। তবে কোন্ কোন্ সমঝোতা হয়েছে তা জানাননি। প্রেসিডেন্ট শি বলেন, আমেরিকার সাথে চীনের সুসম্পর্ক সেই স্বাধীনতার সময় থেকে। প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন তার শাসনামলে চীন থেকে পোর্সেলেইন কিনেছিলেন। তিনি বলেন, এত বছর পর দুই দেশ আরেকটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে একটি বল্ড ঈগল ভাস্কর্য উপহার দেন। স্টেট ডিনারে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আমাদের ভবিষ্যত যে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সাফল্যর সে কথা সব মানুষ জানুক। তিনি বলেন, আমি এবং প্রেসিডেন্ট শি দুজনই জানে আমরা দুই সিস্টেমকে প্রতিনিধিত্ব করি, কিন্তু আমাদের জনগণের যে বন্ধন তা দীর্ঘস্থায়ী।

এই দুই বিশ্বনেতার মুখোমুখি ডিনার টেবিলে বসা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কথায় বিশ্বজুড়ে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে বৈঠক হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, শি’র সঙ্গে তাঁর ‘দারুণ বৈঠক’ হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি তাইওয়ানের স্বাধীনতা এবং ইরান যুদ্ধ নিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন দুই নেতা।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি জিন পিং ট্রাম্পকে তাইওয়ান প্রশ্নে সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। চীনের ভূখন্ডগত অখন্ডতার বিষয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান ‘স্পষ্ট’ বলেও উল্লেখ করেন শি।

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখন্ড বলে দাবি করে চীন। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। বৈঠকের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের তাইওয়ানকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।

এর আগে শি জিন পিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিউয়ান গত বুধবার সন্ধ্যায় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান। ওয়াশিংটন ডিসির পার্শ্ববর্তী মেরিল্যান্ডে জয়েন্ট বেস এ্যান্ড্রুজে তাঁদের স্বাগত জানান ট্রাম্প ও ফাস্টর্ লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। ১১ বছর পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই সামরিক ঘাঁটিতে গিয়ে কোনো বিদেশি নেতাকে স্বাগত জানালেন। এর আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

বাণিজ্যে সমঝোতার চেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে ১১ মাস আগে একটি চুক্তি করেছিল। সেটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প ও শি’র মধ্যে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন সেক্রেটারি অব ট্রেজারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে আলোচনায় চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন তাঁরা।

কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধা কমানো এবং চীনের ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এআই নিয়ে আলোচনা

বৈঠকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নিয়েও আলোচনা হয়েছে। নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সামরিক সক্ষমতার ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে দুই দেশই উদ্বিগ্ন। এ প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়েও দুই দেশের উদ্বেগ রয়েছে।

শি বৈঠকে ট্রাম্পকে বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দুই দেশ হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। এআইকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের পাশাপাশি এর বিকাশ যেন সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা বেইজিং ও ওয়াশিংটনকে নিশ্চিত করতে হবে।

বৈঠকের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, এআই বা তাঁর ভাষায় ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হবে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কোনো বিধিনিষেধের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বৈঠকের শুরুতে শি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। দুই দেশের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখা, পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া বাড়ানো এবং সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পক্ষেও মত দেন শি।

ইরান নিয়ে আলোচনা

সিনহুয়া জানিয়েছে, শি চান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত জুনে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) শর্তে ফিরে যাক। ওই সমঝোতায় যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। ১৭ জুন সই হওয়া সমঝোতা কয়েক দিনের মধ্যেই ভেস্তে যায়। এরপর পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হলেও জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনের ফাঁকে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে।

Related Posts