গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— আটাশ মহীরূহ এক অনন্ত সুরসাধক ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ

ড. জীবন বিশ্বাসঃ দশ বছরের একটি বালক রাতের অন্ধকারে গৃহত্যাগ করেছিল কেবলমাত্র একটি অদৃশ্য—টানের পিছু ধাওয়া করে, যে টান কোনো বৈষয়িক সম্পদের ছিল না, ছিল নিখাদ সুরের ব্যাকুলতার। সুরের নেশা যাকে একবার পায়, প্রথাগত সমাজ তাকে ‘পাগল’ বলে দাগিয়ে দেয়। কিন্তু সেই বাউন্ডুলে ক্ষ্যাপামি যখন চরম আত্মত্যাগের আগ্নেয়গিরিতে গিয়ে পড়ে, তখন জন্ম নেয় এক সাঙ্গীতিক বিশ্বভুবন। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ কেবল সরোদহাতে এক পারদর্শী বাদ্যকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে ভারতীয় সংগীতের দিগ্বিজয়ী সাধক এবং নিখিল সুরের এক বিশাল মহীরূহ। তাঁর জীবন কোনো সরলরৈখিক ছকবাঁধা ইতিহাস নয়, বরং তাহলো বনের বাঁশ, পশুর চামড়া, ধাতুর তার আর মানুষের ব্যাকুল কণ্ঠস্বরকে একসূত্রে বেঁধে মহাবিশ্বের মহানাদ প্রকাশ করার এক অলৌকিক রূপকথা।

জন্মবৃত্তান্ত, স্বজন ও প্রয়াণরেখা

১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের ত্রিপুরা জেলার শিবপুর গ্রামে (বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা) সংগীতানুরাগী পিতা সবদার হোসেন খাঁ ও মাতা হেমাঙ্গিনী দেবীর কোলে জন্ম হয় এই বিরল সাধকের। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ফকির আফতাবউদ্দীন খাঁর হাত ধরে সংগীতে প্রাথমিক খড়ি হলেও তাঁর সুরতৃষ্ণা তাঁকে ভিটেমাটি থেকে উপড়ে এনে দূর—দূরান্তে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দীর্ঘ এক শতাব্দীব্যাপী কঠোর তপস্যা, নিত্যনতুন আবিষ্কার ও প্রদীপ্ত শিক্ষাদানের পর ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের মধ্যপ্রদেশের মাইহারে এই মহাগুরু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বারাণসী কিংবা রামপুরের দরবার অতিক্রম করে মাইহারের মতো এক নির্জন জনপদে থিতু হওয়া এবং সেখান থেকেই গোটা বিশ্বমঞ্চকে কাঁপিয়ে দেওয়ার এই ১১০ বছরের বিস্তৃত জীবনালেখ্যটি প্রাচ্য সংগীতের এক যুগান্তকারী রূপান্তরের মহাকাব্য।

যাযাবর শৈশব, বহুমাত্রিক শিক্ষা ও যন্ত্রানুশীলন

গৃহত্যাগী সেই বালক শৈশবে এক যাত্রাদলে যোগ দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলার গ্রামে—গঞ্জে। সেখানে জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন ও পাঁচালির মেঠো সুর তাঁর চেতনার গভীরে মাটির গন্ধ সেঁটে দিয়েছিল। পরবতীর্তে কলকাতায় এসে গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য অর্থাৎ ‘নুলো গোপাল’—এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে কণ্ঠসংগীতের কঠিন রেওয়াজ শুরু করেন। কিন্তু গুরুর অকালপ্রয়াণ তাঁকে বাকরুদ্ধ করলেও থামিয়ে দিতে পারেনি। তিনি ঝুঁকে পড়লেন যন্ত্রসংগীতের দিকে। হাবু দত্ত অর্থাৎ অমৃতলাল দত্তের কাছে শিখলেন সেতার, বাঁশি, পিকলো, ম্যান্ডোলিন ও ব্যাঞ্জো। পাশ্চাত্য সুরের জ্যামিতি ও অঙ্গুলিসঞ্চালন বুঝতে গোয়ানিজ ব্যান্ডমাস্টার মি. লোবোর কাছে বেহালা শিখলেন, আবার ভারতীয় ঘরানার বেহালার তালিমও নিলেন সমান নিষ্ঠায়। একটি মাত্র যন্ত্রে বন্দি থাকা তাঁর স্বভাব ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন সমগ্র বাদ্যযন্ত্রের শরীর ব্যবচ্ছেদ করে সুরের আসল আত্মাকে স্পর্শ করতে।

মুক্তাগাছার অনুপ্রেরণা ও রামপুরের কঠিন সাধনা

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার জগৎকিশোর আচার্যের রাজদরবারে ওস্তাদ আহমদ আলী খাঁর সরোদবাদন শুনে তরুণ আলাউদ্দীন প্রথম অনুধাবন করেন তাঁর জীবনের আসল গন্তব্য। আহমদ আলী খাঁর কাছে সরোদের প্রারম্ভিক শিক্ষা শেষে তিনি ছুটে যান রামপুরে, তানসেনের বংশধর সেনিয়া ঘরানার খলিফা ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর দ্বারে। রাজকীয় সেই দরবারে স্থান পাওয়া মোটেও সহজ ছিল না। অমানুষিক কষ্ট, প্রবঞ্চনা আর চরম দারিদ্র্য সহ্য করে তিনি ওয়াজির খাঁর কৃপা লাভ করেন। সেনিয়া ঐতিহ্যের গোপন সাঙ্গীতিক রত্নভান্ডার, ধ্রুপদের গম্ভীর কাঠামো এবং তালের জটিল গণিত নিজের রক্তে মিশিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন এক মহাগুরু হিসেবে।

মাইহারের তপোবন ও মানবিক ‘মাইহার ব্যান্ড’

মাইহার রাজ্যের মহারাজা ব্রিজনাথ সিংহ তাঁকে নিজের দরবারে সমাদরে স্থান দেন। কিন্তু আলাউদ্দীন খাঁ রাজসভার চাকচিক্যময় বিনোদনে নিজেকে বিকিয়ে দেননি, বরং নিভৃত মাইহারকে পরিণত করেছিলেন সংগীতের এক পবিত্র তপোবনে। সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় যন্ত্রসংগীতের আধুনিক ‘মাইহার ঘরানা’। তাঁর বাজনায় ধ্রুপদের আভিজাত্য, সরোদের তেজ, সেতারের সূক্ষ¥ মিড়, কণ্ঠসংগীতের ট্রিল এবং লোকসুর একই সূত্রে মিলেমিশে এক নতুন নন্দনতত্ত্ব তৈরি করেছিল। মহামারির সময়ে অনাথ হয়ে পড়া শত শত শিশুকে কুড়িয়ে এনে তিনি তৈরি করেছিলেন ঐতিহাসিক ‘মাইহার ব্যান্ড’। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের নানাবিধ যন্ত্রের মেলবন্ধনে গঠিত এই অর্কেস্ট্রা প্রমাণ করেছিলÑসংগীত কোনো রাজন্যবর্গের একচ্ছত্র অধিকার নয়, তা অনাথ শিশুর জীবনকেও এক অতিউচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করতে পারে।

গুরুরূপের কঠিন অনুশাসন ও বিখ্যাত শিষ্যবৃন্দ

গুরুরূপে তিনি ছিলেন অগ্নিসদৃশ রুদ্র, আবার অন্তরে ছিলেন জননীর মতো দয়ালু। তাঁর শিষ্যের তালিকা পর্যালোচনা করলে আধুনিক হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের মানচিত্রটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পন্ডিত রবিশংকরকে তিনি শিখিয়েছিলেন সেতারকে মানুষের কণ্ঠের মতো গাইতে। পুত্র ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর সরোদে ঢেলে দিয়েছিলেন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজিক গভীরতা। কন্যা অন্নপূর্ণা দেবীর সুরবাহারকে করেছিলেন অন্তর্মুখী সাধনার রহস্যময় ভাষা। পান্নালাল ঘোষের বাঁশিকে দিয়েছিলেন দরবারি শাস্ত্রীয় মর্যাদা, আর পন্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেতারে বুনে দিয়েছিলেন ধ্যানমগ্নতার অপূর্ব অলংকার। তিনি শিষ্যদের কেবল বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখাননি, শিখিয়েছিলেন সুরের সামনে অহংকার বিসর্জন দিয়ে সমর্পিত হতে।

বাদ্যশৈলীর আধুনিকায়ন ও নতুন রাগের জন্ম

আলাউদ্দীন খাঁ সরোদ বাজনায় ‘দারা দারা’ বাচনের জায়গায় ‘দিরি দিরি’ ধ্বনির সূক্ষ¥ ও দ্রুত কাজের প্রচলন করেন, যা যন্ত্রটির প্রকাশক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সেতারে সরোদের গাম্ভীর্য ও বলশালী টান যুক্ত করার কৌশলও তাঁরই অবদান। রাগ তাঁর কাছে কেবল আরোহন—অবরোহনের সুনির্দিষ্ট তালিকা ছিল না, রাগ ছিল এক একটি জীবন্ত সত্তা, যার নিজস্ব মেজাজ ও রূপ রয়েছে। তিনি অসংখ্য মিশ্র রাগের জন্ম দেন, যেখানে প্রাচীন রাগগুলো নতুন অলংকারে নতুন জীবন পেত।

ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ উদ্ভাবিত কয়েকটি বিখ্যাত রাগ

১। হেমন্ত, ২। দুর্গেশ্বরী, ৩। মেঘবাহার, ৪। প্রভাতকেলী, ৫। হেম—বেহাগ, ৬। মদনমঞ্জরী, ৭। আরাধনা, ৮। মাঞ্জ খাম্বাজ, ৯। ধবলশ্রী, ১০। সরস্বতী, ১১। ধনকোষ, ১২। শোভাবতী, ১৩। রাজেশ্রী, ১৪। চন্ডিকা, ১৫। দীপিকা, ১৬। মালয়া, ১৭। কেদার মাঞ্জ, ১৮। ভুবনেশ্বরী, ১৯। অর্জুন, ২০। ভাগবতী, ২১, ভীম, ২২। গান্ধী বিলাবল, ২৩। হৈমন্তী, ২৪। হেমন্ত ভৈরব, ২৫। জৌনপুরী টোড়ি।

পরিশেষ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সাধারণ গ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করে মাইহারের তপোবনে যে সুরবৃক্ষটি তিনি রোপণ করেছিলেন, তার শিকড় আজ কোনো নির্দিষ্ট ভূখন্ডে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কঠিন অনুশাসন ও নিরহংকার তপস্যা ছাড়া শিল্পে কোনো চিরস্থায়ী রূপ তৈরি করা যায় না। পার্থিব দেহ বিলীন হলেও, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যখনই কোনো সেতারের তারে প্রথম আলাপের টান পড়ে, সরোদে বেজে ওঠে গতির ঝালা কিংবা বাঁশিতে জেগে ওঠে ভোরের ভৈরব, তখনই বোঝা যায় সেই বাউন্ডুলে বালকটি আসলে কখনোই থামেননি, তাঁর রেখে যাওয়া সুরের নদীটি যুগ থেকে যুগান্তরে রয়েছে প্রবহমান।

Related Posts