বিশাল জয় নিয়ে ২০ বছর পরে ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি || তারেক রহমানের অভূতপূর্ব বিজয়

বাঙালী প্রতিবেদনঃ দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাত্র সপ্তাহের শীলিত প্রচারণা শেষে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অভূতপূর্ব ক্যারিশম্যাটিক উত্থান প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। প্রথম নির্বাচনেই তার এই সাফল্য অনেককেই উল্লসিত করেছে। পক্ষান্তরে প্রায় ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ল্যান্ড স্লাইড বিজয় গণতন্ত্রের সুবাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিবিসি বাংলা বলছেঃ নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে তার নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনী প্রচার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং তার সমর্থকেরা তাকেই বাংলাদেশেরসম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীহিসেবে বর্ণনা করে আসছে।

তার দল বিএনপিও তাকেএকক নেতাহিসেবে উপস্থাপন করেছে, যদিও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়গুলো সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রায় সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে তার দলের পক্ষ থেকে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা পেয়েছেন তিনি।

মূলত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তৈরি করা দলটি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত জনপ্রিয় হওয়ার পর আবার একটি সমস্যাসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে তাদের বড় সন্তান তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার সময়ে পদার্পণ করলো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আসাটা ছিল অনিবার্য কিন্তু তার একক নেতৃত্বের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো এবারের নির্বাচন। এর ওপরেই তার সাফল্যব্যর্থতার রাজনৈতিক পরীক্ষা শুরু হলো বলে মনে করেন তারা।

যদিও এই নির্বাচনে নেই বিএনপির দীর্ঘকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করে রাখায় তারা এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।

ফলে দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয় এককালীন মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

সংশয়, দেশে ফেরা, দলের নেতৃত্ব নির্বাচন

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান। এরপর আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

এর প্রায় সতের বছর পর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন গত ২৫ ডিসেম্বর।

দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান গত ২২শে জানুয়ারি সিলেটে দলের নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন।

তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান মেয়ে জায়মা জারনাজ রহমানকেও নানা কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে।

দলের কয়েকজন নেতা চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদে আছেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এবং সেই সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন তিনি সেগুলোর দেখভালের সাথে যুক্ত ছিলেন।

তবে দলের রাজনীতিতে তার শক্ত প্রভাব শুরু হয় ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট দুইতৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলো।

২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। পরে ২০০২ সালের ২২শে জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়।

তারেক রহমান ওই সময়ে সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং দলের তৃণমূলে যোগাযোগ তৈরি করতে পেরেছিলেন।

ঘুরে দাঁড়ানো দেশে ফেরা

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পর গ্রেফতার হয়েছিলেন তখনকার বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। মিসেস জিয়ার সাথে একই দিনে একই সাথে আটক হয়েছিলেন তার প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমানও।

আবার খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের ছয় মাস আগেই গ্রেফতার হয়েছিলেন তারেক রহমানও।

২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকেই দল পরিচালনার কাজ শুরু করেন মি. রহমান। তবে একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজা পাওয়া ছাড়াও অনেক মামলার আসামি হয়েছেন তিনি আওয়ামী লীগ আমলে।

এক পর্যায়ে তার বক্তব্যবিবৃতি প্রচার আদালতের মাধ্যমেই বন্ধ করে দেয়া হলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হন এবং ভার্চুয়ালি দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে থাকেন।

তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, অল্প দিনের মধ্যেই একদিকে তৃনমূলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ এবং অন্যদিকে দলের নীতিনির্ধারণী কাজে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মি. রহমানের দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে প্রত্যক্ষভাবে দলের হাল ধরলেন।

দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়

বিএনপির এবারই প্রথম বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিলো এবং তারেক রহমান নিজেও এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।

তিনি ঢাকা বগুড়ার দুটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে বিএনপির আগের ঘোষণা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে বিজয়ের জন্য তিনি ইতোমধ্যেই ভারত পাাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের কাছ থেকে অভিনন্দন পেতে শুরু করেছেন।

দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর তিনি গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন এবং ৩০ ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েক দিন পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।

এখন তার নেতৃত্বেই নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপির জয় নিশ্চিত হলো এবং এর ফলে ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার প্রায় দুই দশক পর দলটি আবার ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে ছিল। সেই সরকারের অন্যতম অংশীদার এবং দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সাথেই এবার নির্বাচনী লড়াই হয়েছে বিএনপির।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ৭৮টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবেই ৬৮টি সংসদীয় আসনে বিজয়ী হয়েছে।

এবার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন গণভোট একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে দুটি আসনে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ফল ঘোষণা স্থগিত রেখেছে কমিশন।

নিয়মানুযায়ী নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশের পরই তাদের শপথ পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবার কথা।

এবার তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিকে মূলত লড়তে হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। দলটি ২০০১ সালের সরকারে বিএনপির সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল।

ভিন্ন প্রেক্ষাপট সংসদ নির্বাচনের ফল

বিএনপি এবার নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও এই নির্বাচনে ছিল না দলটির দীর্ঘকালের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শেখ হাসিনা তার দলের অনেক নেতা ভারতে অবস্থান করছেন। আর দলটির যেসব নেতা দেশে ছিলেন, তাদের প্রায় সবাইকেই গ্রেফতার করে কারাগারে রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেছে সরকার ফলে এই নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।

এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে বিএনপির লড়াই হয়েছে পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সাথে। যদিও দলটি বিএনপির সাথে নির্বাচনী লড়াইয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। যদিও নির্বাচনে তাদের আসন সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী বিএনপি তার মিত্ররা মিলে এখন পর্যন্ত ২১২ টি আসনে জয়লাভ করেছেন। আরও কয়েকটি আসনে ফলাফল ঘোষণা এখনো বাকী রয়েছে।

বিএনপি এই নির্বাচনে ২৯২টি আসনে এককভাবে প্রার্থী দিয়েছিলো এবং সমমনা দলগুলোকে বাকী আটটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। তবে দলটির কুমিল্লা আসনের প্রার্থী মনজুরুল আহসান মুন্সী প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী বিএনপির সমমনা দলগুলোর মধ্যে আন্দালিভ রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি এবং নুরুল হক বিজয়ী হয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭ আসনে জিতলেও দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই নির্বাচনে হেরে গেছেন।

তবে জামায়াত জোটে থাকা এনসিপির নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আবদুল্লাহ আল আমিন আতিকুর রহমান মোজাহিদ এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।

ওদিকে বিএনপিরই বিদ্রোহী নেতাদের মধ্যে রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, এজেডএম রেজওয়ানুল হক দিনাজপুর, আতিকুল আলম শাওন কুমিল্লা এবং সালমান ওমর রুবেল ময়মনসিংহ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছেন।

গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফিরে আসার আগে ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন তারেক রহমান। ফিরে আসার মাত্র সাত সপ্তাহ পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে তিনি এখন নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, তারেকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্ট বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।

গত জানুয়ারি মাসে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম। সে সময় তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে নতুন করে গড়ে তোলা এবং সমাজে সৃষ্টি হওয়া বিভাজন দূর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন।

ওই সময় তারেক রহমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁর কাছে কী কী বিষয় অগ্রাধিকার পাবে। জবাবে তারেক রহমান প্রথমেই বলেছিলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করা।

তারেক আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়টি হবে, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে যাওয়া। আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি যা হোক, আমরা যে নীতিই গ্রহণ করি না কেনযদি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারি, তবে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

Related Posts