গ্রিনল্যান্ডের হিম—আলিঙ্গনে বন্দি নিউইয়র্ক || ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক
প্রকৃতির পরিহাস বড়ই বিচিত্র এবং গূঢ়। এই তো সেদিন যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ক্রয় বা অধিগ্রহনের একটি ভূ—রাজনৈতিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, প্রাথমিকভাবে সারা বিশ্ব আক্ষরিক অর্থেই তখন স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। কারণ ট্রাম্পের সেই স্পর্ধিত অভিলাষ যতটা না বাস্তবসম্মত ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ঔপনিবেশিক আমলের এক বিস্মৃত খামখেয়ালিপনার পুনরুত্থাওন স্পষ্ট ইঙ্গিত। বিশ্বের বৃহত্তম এই তুষারাবৃত দ্বীপটি দখলের সেই প্রস্তাবটি যখন বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক বিস্ময় এবং হাস্যরসের খোরাক জুগিয়েছিল, প্রকৃতি তখন নেপথ্যে সাজিয়েছিল এক অমোঘ পাল্টা কূটচাল। আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডকে রাজনৈতিকভাবে বা রিয়েল এস্টেট চুক্তির মাধ্যমে অধিগ্রহণ করতে না পারলেও, উত্তর মেরু যেন তার সমস্ত হিমশীতল প্রতাপ নিয়ে উল্টো আমেরিকাকেই ‘অধিগ্রহণ’ করে নিয়েছে। তবে এই দখলদারিত্ব কোনো মানচিত্রের সীমানা পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়, বরং এক নাছোড়বান্দা এবং হাড়কাঁপানো বায়ুমণ্ডলীয় আধিপত্যের মাধ্যমে। এই ‘গ্রিনল্যান্ডীয় কূটচাল’ কোনো কৌশলগত সম্পদ হিসেবে নয়, বরং একের পর এক বিধ্বংসী তুষারঝড়ের রূপ ধরে আবির্ভূত হয়েছে, যা আমেরিকার পূর্ব উপকূলকে, বিশেষ করে নিউইয়র্ককে এক ভয়ানক ও আপাত—বৈপরীত্যপূর্ণ জলবায়ুগত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার মত এক পরাক্রমশালী রাষ্ট্রকে প্রকৃতির এক হিমশীতল উপহাসের কাছে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। এ প্রসংগেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
সাম্প্রতিক রেকর্ড ভাঙা তুষারের স্তূপ সরিয়ে নিউইয়র্কবাসী যখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তখন একটি প্রশ্ন বারবার জনমনে উঁকি দিচ্ছে, পৃথিবী যদি উষ্ণই হয়, তবে আমরা এমন রেকর্ড পরিমাণ তুষারে জমে যাচ্ছি কেন? একজন সাধারণ পর্যবেক্ষকের কাছে এই প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ এবং নিউইয়র্ক মহানগরের স্থবিরতা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল তত্ত্বের পরিপন্থী মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবে এই সংশয় মূলত সাময়িক আবহাওয়াগত চরমভাব এবং দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনের ধারার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারারই ফসল। বাস্তবে, সাম্প্রতিক এই নজিরবিহীন তুষারঝড়গুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কোনো বিচ্যুতি বা ‘এক্সেপশন’ নয়, বরং এটি সেই মহাজাগতিক সংকটেরই এক অত্যন্ত পরিশীলিত এবং উদ্বেগজনক সূচক। আমরা বর্তমানে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থেকে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত অধ্যায়ে পদার্পণ করছি, যাকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ‘গ্লোবাল উইয়ার্ডিং’ (এষড়নধষ ডবরৎফরহম) বা ‘বৈশ্বিক খামখেয়ালিপনা’ বলে অভিহিত করছেন। এখানে মেরু অঞ্চলের ভারসাম্যহীনতা কেবল তাপমাত্রাই বৃদ্ধি করে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে আবহাওয়াকেও চরমভাবে অনিশ্চিত ও বিধ্বংসী করে তোলে।
চরম শৈত্যের নেপথ্য বিজ্ঞান: দুর্বল মেরু—প্রাচীর
এই প্রাকৃতিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিহিত রয়েছে মেরু ঘূর্ণাবর্ত (চড়ষধৎ ঠড়ৎঃবী)—এর শক্তিক্ষয় এবং তার ফলে জেট স্ট্রিম (ঔবঃ ঝঃৎবধস)—এর পথচলার অস্থিরতার মধ্যে। প্রথাগতভাবে, উত্তর মেরুর প্রচণ্ড শীতল বাতাস এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বাতাসের তাপমাত্রার বিশাল ব্যবধান একটি শক্তিশালী ও বৃত্তাকার বায়ুপ্রবাহের প্রাচীর তৈরি করত। এই প্রাচীরটি শীতল বাতাসকে উত্তর মেরু অঞ্চলেই কারারুদ্ধ করে রাখত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে আর্কটিক অঞ্চল বৈশ্বিক গড় হারের তুলনায় প্রায় চার গুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন’ (অৎপঃরপ অসঢ়ষরভরপধঃরড়হ) বলা হয়। যখন উত্তর মেরু দ্রুত উষ্ণ হয়, তখন মেরু ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের তাপমাত্রার সেই চিরাচরিত ব্যবধান বা ‘গ্রেডিয়েন্ট’ সংকুচিত হয়ে আসে। এর ফলশ্রুতিতে জেট স্ট্রিম তার শক্তি ও গতি হারিয়ে ফেলে এবং আঁকাবাঁকা পথে বা সর্পিল গতিতে বইতে শুরু করে। যখন জেট স্ট্রিম এভাবে বিচ্যুত হয়, তখন মেরু অঞ্চলের হিমশীতল বায়ু তার সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ আমেরিকা ও ইউরোপের জনবহুল অঞ্চলগুলোতে আছড়ে পড়ে। ফলে, যদিও বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা উর্ধ্বমুখী, তবুও স্থানীয়ভাবে নিউইয়র্কবাসীদের এমন চরম শৈত্যের সম্মুখীন হতে হচ্ছে যা আগে কেবল মেরু অঞ্চলেই দেখা যেত। এটি একটি বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতার সংকেত, যা প্রমাণ করে যে উত্তরের বরফ গলা মানে কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নয়, বরং আমাদের দোরগোড়ায় মেরু অঞ্চলের হিমাঙ্ক—নিচে থাকা বায়ুর অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশ।
আর্দ্রতার আক্রমণ ও নিউ ইয়র্কের তুষার—পরীক্ষা
তুষারপাতের ভয়াবহতার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য হলো উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা। ক্লসিয়াস—ক্ল্যাপিরন সম্পর্ক (ঈষধঁংরঁং—ঈষধঢ়বুৎড়হ ৎবষধঃরড়হ) অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির জন্য তা প্রায় ৭ শতাংশ বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। আটলান্টিক মহাসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার পরিমাণও অনেক বেড়েছে। যখন এই আর্দ্রতা—সমৃদ্ধ উষ্ণ বাতাস মেরু অঞ্চল থেকে নেমে আসা হাড়কাঁপানো শীতল বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন তা বিপুল পরিমাণ তুষার হিসেবে ঝরে পড়ে। এটি বিংশ শতাব্দীর সেই শুষ্ক ও মনোরম তুষারপাত নয়, এটি একটি অস্থির গ্রহের ভারী, সিক্ত এবং ধ্বংসাত্মক তুষারঝড়, যা অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
নিউইয়র্ক শহর এই জলবায়ুগত অস্থিরতার এক জীবন্ত গবেষণাগার। এই শহরের আকাশচুম্বী দালান, সাবওয়ে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বিংশ শতাব্দীর স্থিতিশীল ঋতুচক্রের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই ‘ওয়েদার হুইপল্যাশ’ বা ‘আবহাওয়াগত চাবুক’ মোকাবিলা করার জন্য এই অবকাঠামো মোটেও প্রস্তুত নয়। কয়েক দিনের ব্যবধানেই নিউ ইয়র্কবাসী রেকর্ড ভাঙা শরৎকালীন উষ্ণতা থেকে সরাসরি সাইবেরীয় ধাঁচের তুষারঝড়ের কবলে পড়ছেন। এই চরম পরিস্থিতির জন্য নিউ ইয়র্কবাসীকে যে ‘চরম মূল্য’ দিতে হচ্ছে তা কেবল ডলার বা পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক অস্তিত্বগত সংকট। জরুরি উদ্ধারকাজ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, এবং ট্রান্সপোর্টেশন গ্রিড অচল হয়ে যাওয়ার ফলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তার ভার বহন করা সাধারণ করদাতাদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ছে।
বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে এক বৃহত্তর সত্য
নিউইয়র্কের মতো বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ঘটমান তুষারঝড়গুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের ‘বিপরীত প্রমাণ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা এক ধরনের বিপজ্জনক বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। রাতে সূর্য নেই দেখে সৌরশক্তিকে অস্বীকার করা যেমন ভুল, তেমনি একটি তীব্র তুষারঝড় দেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে অস্বীকার করা আরও বড় সংকটজনক ভুল। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতি নয় বরং এগুলো এক বিপর্যস্ত জীবমণ্ডলের নতুন কোনো ভারসাম্যে পৌঁছানোর চরম আর্তনাদ। উত্তর মেরু থেকে আসা এই অনাকাক্সিক্ষত শীতল বাতাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভূ—রাজনীতির ময়দানে গ্রিনল্যান্ড কেনা বা না কেনা আমাদের আয়ত্বে থাকলেও, জলবায়ুর আন্তঃদেশীয় সীমানা নির্ধারণ করা আমাদের ক্ষমতার একেবারে বাইরে। গ্রিনল্যান্ড কেনা হয়নি ঠিকই, কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের সেই হিমশীতল বৈরী আবহাওয়া আজ আমেরিকাকে তার নিজ আঙিনায় বন্দি করে ফেলেছে। এটি একটি পরিহাসমূলক সত্য যে, আমরা যখন দূরবর্তী দ্বীপের সম্পদের লোভে মত্ত, প্রকৃতি তখন আমাদের ঘরের ভেতরের চিরচেনা পরিবেশকেই আমূল বদলে দিচ্ছে। নিউ ইয়র্কের এই অভিজ্ঞতা আসলে সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কতা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরা কেবল একটি উত্তপ্ত পৃথিবীর দিকেই যাচ্ছি না, বরং আমরা একটি অস্থির, উন্মত্ত এবং অসংলগ্ন এমন একটি পৃথিবীর দিকে ধাবিত হচ্ছি যেখানে আবহাওয়া হবে সম্পূর্ণ অননুমেয়।
পরিশেষ—
সাম্প্রতিক এই তুষারঝড় আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, প্রকৃতি কোনো রাজনৈতিক সীমানা বা মানুষের অহংবোধের তোয়াক্কা করে না। আমাদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোতে এখন আর কেবল ‘উষ্ণায়ন’ শব্দটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আমাদের প্রস্তুত হতে হবে আসন্ন ‘চরম অস্থিরতা’ প্রতিরোধের জন্য। নিউইয়র্কের তুষারশুভ্র রাজপথগুলো আজ কোনো রোমান্টিক শীতের দৃশ্য নয়, বরং এগুলো হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সেই রূঢ় বাস্তবতা যা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, ‘প্রকৃতির হিসাবের খাতাটি আজ অত্যন্ত জটিল এবং তার দেনা আমাদের মেটাতে হচ্ছে চড়া দামে’। আমরা যদি এখনই মেরু অঞ্চলের এই আর্তনাদ শুনতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যতে এই ‘চরম মূল্য’ দেওয়ার ক্ষমতাও আমাদের আর থাকবে না। কাজেই ‘এখনই সময়’ প্রস্তুত হওয়ার।
