ভালোবাসার চোরাবালি নুসরাত কবির নিউইয়র্ক
তোমাকে আমার মাঝেমাঝে শেষ বেলার রৌদ্রের মত মনে হয়। সারা দিনের কাজের শেষে একটু আলো পাওয়ার জন্য কী চেষ্টা! কাজের পরে পার্কিং লটে পৌঁছে দেখা যায় তুমি দাঁড়িয়ে আছো। আমার খুব ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে তোমায় কিছু বলতে, চেষ্টা করি কিন্তু পারি না। অপরিসীম বাঁধা পায়ে শেকড় হয়ে ধরা দেয়। বন্ধের শনি, রবিবার মনে করতে পারি অথবা পারি না। মনে পড়ে আজও, স্কুলে নতুন বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান তৈরি হলে চমকে উঠতাম, যেন ভীষণ শব্দে গাছের পলাতক পাখি আমি। কারণ সেই অনুষ্ঠানে তোমার গানের সুর ও গান শুধুই থাকবে আমাকে নিয়ে।
কৈশোরে আমি যে মানুষটাকে জানতাম, ও বিদায় বেলায় খুব কেঁদেছিলো। আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলো আমায়। পরম মমতায় বলেছিলো আমি কি তোমায় আলিঙ্গন করতে পারি? ও সাথে গাঢ় চুমু দিতে চেয়েছিলো কপালে। এরপর কাঁদতে কাঁদতে হাহাকার জাগানিয়া স্মৃতি নিয়ে, অজস্র গল্প দিয়ে অভিমানে চলে গেল। এই গল্প আমি কাউকে কোনোদিন বলিনি। কিছু গল্প আমরা কাউকে বলতে পারি না। মুখ ফুটে বলতে গিয়ে এক অপরীক্ষিত জড়তা আমাদের থামিয়ে দেয়। বুকের ভেতর সুখ সুখ গন্ধ দেওয়া যে গল্প, আমরা তা কাউকে কেন বলতে পারি না তুমি কি জানো? তবে জানো, আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। ভীষণ কষ্ট। মনে হচ্ছিল ভেতরটা কেউ ফালিফালিকরে দিচ্ছে। কিন্তু আমি টু শব্দও করিনি। এরপর আর কারো জন্য এমনতর কষ্ট হবে আমি ভাবিনি। এরপর তুমি এলে। শেষ বেলার ট্রেন। তোমায় ধরতে গিয়ে ধরতে পারি না। আমার কি কষ্ট হয় আমি জানি না। অথবা কিছু বিষয় আমি স্বীকার করি না। হয়তো বিশাল কলেবরের স্বীকারোক্তি অবয়ব চায় না। সমসাময়িক কোলাহল থেকে অপরিচিত নিঃশ্বাস বহু জগতে আমি থাকতে পারি। তাই আজন্ম অস্তিত্বহীন আমি। এই যে তোমায় ধরতে গিয়ে, ট্রেনে উঠতে গিয়ে থেমে যাই, এটাও হয়তো আমার খামখেয়ালি সুখ। নিজেকে জ্বেলে এই আমার ভালোবাসারস্বাদ। নিজেকে শেষ করি। জীবনে সবসময় সমুদয় হিসেব মেলে না। আমি ২০২৫ সনের নারী। অবিশ্বাস্য মায়ায় হৃদকম্পনের মৃদু আওয়াজের নৈঃশব্দে্যর ধাক্কায় অবসাদগ্রস্ত এক বিকেলে অপ্রকাশ্য হয়ে আমি কেন এক স্টেশনে রবো। তুমি জানবে কেউ একজন আছে, যারতোমায় না জানা গল্প বলার ছিল। যা তুমিও বলোনি, আমিও শুনিনি।
অনেকক্ষণ অনেক কাব্যিক ও স্বপ্নিল কথাগুলো বললাম, আসলে সে চলে যাওয়ার পর ভাবছি। আমি বিবাহিত তা জেনেও কেন এই লুকোচুরি। এক বিদেশীর কাছে কখনো আশা করিনি। যাক বিদেশে কাজে গিয়ে জানলাম, বিদেশিরা বিবাহিত বোঝে বাম হাতের অনামিকাতে রিং পরা দেখে। ওরা কখনো রিং খোলে না, যখন সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় তখনই খুলে ফেলে। কিন্তু আমরা বাঙালিরাতো এগুলোর ধারে কাছেও না। আবার তাও জানলাম, আমাদেরই মতো ওরাও গভীর প্রেমে পড়ে, আবার প্রচন্ড অভিমানও করে।
মানুষটি আমার স্কুলের কলিগ। একজন অসম্ভব সুদর্শন বিদেশী টিচার হয়েও, কি যে দেখেছিলো আমার মাঝে বুঝিনি। প্রতিদিন সকালে স্কুলের মেইন লবিতে অপেক্ষায় থাকতো। মাঝে মাঝে বিশ্বাস হতো না। ভাবতাম হয়তো আমি নয়, অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করে। তাই অনেকদিন সময় বদলে দেখেছি। তাতে আরো বিপদ হতো, সরাসরি যে কোনো বাহানায় আমার ক্লাসে এসে অভিমান করে তাকাতো। সবই হতো চোখের ভাষায়, কারণ টিচিং জবে খোলামেলা পছন্দ অপছন্দ এসব চলে না। ম্যানেজমেন্টের খবর গেলে চাকরি যাবে, এমন কি প্রেমিক—প্রেমিকা একসাথে কাজ করলেও কেউ বুঝতে পারবে না।
দিন দিন যন্ত্রণা ও অনুসরণ করা যেন বিরামহীন ছিলো। তাই একদিন সকালে নিজে তার ক্লাস রুমে সরাসরি জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কি চাও!’ হেসে বলে, আমার সাথে কফি খাবে! আমি শুনে নিস্তব্ধ। সেই সুযোগে আমার হাতের ফোন নিয়ে বলে, ফেস বুকে রিকোয়েস্ট দিয়েছি। আমার নাম্বারটাও সেভ করে দিলাম। আমি তো অবাক হয়ে পাথর হয়ে যাই, বলে কি! অবশেষে বললাম, তোমাকে না প্রথম স্কুল ইয়ারের শুরুতে বলেছিলাম আমি বিবাহিত। তুমিও বলেছিলে তোমারও গার্লফ্রেন্ড আছে,তবে কেন? হাসে আর বলে, আমি তো এখন আর ওর সাথে থাকি না। আমি তখন বললাম, তুমি থাকো না, কিন্তু আমি থাকি আমার পরিবারের সাথে। আর সেকেন্ডের বেশী থাকিনি, চলে যাই আমার ক্লাসে। পরের দিন লবিতে দেখি কেউ নেই, মনে মনে ভাবি যাক কাজ হয়েছে। ওমা, সারাদিন কোথাও দেখিনি। পরে আমার এক কলিগ, স্কুলের সব খবর যার কাছে থাকে, সে বললো রিচ গতকাল রিজাইন দিয়ে দিয়েছে। আজ থেকে কোনো মিউজিক টিচার নেই। চলে যাওয়াতে কষ্ট হচ্ছে কিছুটা, আর স্কুলেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে। রিচ অসম্ভব ভাল ও মিশুক মিউজিক টিচার ছিলো, স্কুলের বাচ্চারা খুবই পছন্দ করতো। দেখতেও ছিলো সুদর্শন ও স্মার্ট। এভাবে ভালোবাসার চোরাবালিতে ধীেও ধীেও হারিয়ে যায় কয়েক মাসের মোহ।
