প্রাক নির্বাচনী প্রত্যাশা ও স্বাধীনতা বিরোধীদের হার আনিস আহমেদ

এই লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে, তখন বাংলাদেশে নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। নির্বাচনের ফলাফলও পাওয়া যাবে এমন কি ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কোন একটি দল প্রস্তুতিও নেবে। কেউ কেউ এই নির্বাচনকে অভূতপূর্ব বলছেন, আমি বলবো নজিরবিহীন। এখানে নজিরবিহীন শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করছি। কারণ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, যারা প্রায় ৭৮ বছরের পুরনো দল, তাদেরকে বাদ দিয়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর কেবল বড় বা পুরনো বলেই নয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ২৩ বছরের ইতিহাসে, আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে প্রায় সকল বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। তাছাড়া জাতীয় পার্টির মতো আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ দলগুলোও এই নির্বাচনে নেই। হাস্যকরভাবে অন্তর্বর্তী সরকার বলছে যে আওয়ামী লীগকে তো নিষিদ্ধ করা হয়নি, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত অস্তিত্ব নির্ভর করছে তার কার্যক্রমের ওপর। তাহলে কেমন ধরনের পরিহাস। আবার বলা হলো নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারবে কি না তার সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন। যেন মনে করানো হলো যে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। নির্বাচন কমিশন তৎক্ষণাত জানিয়ে দিল যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না এবং সেই সঙ্গে তাদের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা বাতিল করলো। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় স্বভাবতই নির্বাচন কমিশন এই পদক্ষেপ নিলো। এটা যে কোনোভাবেই অংশগ্রহণমুলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দৃষ্টান্ত নয়। সে জন্যই বোধ করি এই নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমগুলোতে। 

আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ ফেব্রুয়ারির রাত, আর বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ সেখানে এটি নির্বাচনের দিন। তবে সেখানে ভোর হওয়ার বেশ আগেই এমনকি শোনা যাচ্ছে যে মধ্যরাত থেকে ভোট কেন্দ্র দখলের জন্য জামায়েতে ইসলামি দল তৎপর হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে শোনা যাচ্ছে পিরোজপুর আসনে রাতের আঁধারে ব্যালট বাক্স ভরার কাজ চলছে, বিএনপি দপ্তরে জামায়েত শিবির হামলা চালিয়েছে, পটুয়াখালীতে ৫০ লাখ টাকাসহ আটক পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা, জনৈক জামায়েত নেতার মৎস্য প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তাছাড়া শরীয়তপুরে জামায়েতের কার্যালয় থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধারের খবরও রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন গণভোটের আগের দিন টি জেলায় জামায়াতে ইসলামী বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর কাছ থেকে টাকা উদ্ধার, আটক এবং একজনকে দন্ডাদেশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে নীলফামারীতে ৭৪ লাখ টাকাসহ জামায়াতের এক নেতাকে আটক করা হয়। আর লক্ষ¥ীপুরে বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় ১৫ লাখ টাকা। নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে জামায়াত নেতা বেলাল উদ্দিন প্রধানকে আটক করা হয়। ঢাকা আসনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে অনুপ্রবেশের চেষ্টা কারচুপির আশঙ্কার অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তাঁর দাবি, এনসিপি জামায়াতশিবিরের কর্মীরা বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা করছে। আরামবাগ আশপাশের বাসাবাড়ি, মেস মাদ্রাসায় অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ জন সশস্ত্র অবস্থায় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এই রকম এক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাধারণ নির্বাচন।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিএনপি নেতৃত্বাধীন একটি জোট এবং জামায়েতে ইসলামি এনসিপি আরেকটি জোট প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। আমার নিজের মনে হচ্ছে এই নির্বাচনে যারাই জয়ী হন না কেন, বর্তমান ন্যারেটিভের বড় রকমের কোন পরিবর্তন আসবে না। তারেক রহমানের নতুন নেতৃত্বে বিএনপি আগেকার বিএনপি থেকে খুব যে নতুন কোন অবস্থানে রয়েছে তা নয়। তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা বেগম খালেদা জিয়ার মতো তারেক রহমানও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবজনক ইতিহাসের পক্ষেই কথা বলেছেন। কিন্তু সে ইতিহাস নির্মাণের নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে নীরব থেকেছেন, যেমনটি পরে জিয়া এবং বেগম জিয়াও বঙ্গবন্ধুর কথা উল্লেখ করেননি মূলত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের তোয়াজ করার জন্যই। এখন যদি তারেক রহমান সেই অবস্থান পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেন, তাহলে তাঁর জামায়েতবিরোধী রাজনীতি সাফল্য অর্জন করবে। তিনি আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের রাজনীতি করার অধিকার দিলে প্রশংসিত হবেন। তাছাড়া মিথ্যা মামলায় যাঁরা এখনও কারাগারে ভুগছেন তাঁদের মুক্তি দেয়ার জন্যও তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নিলে নন্দিত হবেন। তবে সেটা কি তিনি করবেন? নাকি তিনি কথিত জুলাই সনদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে আমূল পরিবর্তনকে অনুমোদন দেবেন!

ইতিমধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। জানতে পেরেছি নির্বাচন হয়েছে সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণভাবে। ফলাফলে অনেক এগিয়ে আছে বিএনপি। জামায়াত অনেক পিছনে। অতএব আগামী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান। আমি খুশি একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধী দল হেরে গেছে। আমার প্রত্যাশা যেন পূর্ণ হয়। আগামী প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে আমি আগাম অভিনন্দন জানাই।

Related Posts