জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে হয়ে গেল নীলা ড্যান্স একাডেমির || দৃষ্টিনন্দন কুচিপুুরি ও কত্থকের আসর

বাঙালী প্রতিবেদনঃ মঞ্চ সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর। দুই পাশের উইংগুলো নিথর। পশ্চাদপটও নিষ্পাপ সাদা। জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্ট সেন্টারের মাঝারি আকৃতির মঞ্চের বামপাশে সামান্য আড়াআড়ি বসে আছেন মৃদঙ্গ নিয়ে কাবিলান জেগানাথান, মন্দিরা হাতে ড. নীলা জেরিন, কণ্ঠশিল্পী অবন্তিকা শ্রীনিবাসন ও বেহালা নিয়ে তানিসা শ্রীবাস্তবা। ৯ শিশু কিশোরী শিল্পী কস্টু্যম পরে মঞ্চে এসে দুই দিকে অর্ঘ্য প্রদানের ভঙ্গিতে সামনে জোড়া দুই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে যায়। বেহালায় বেজে ওঠে আদি তালে রাগ নাটাই। বেহালার একটানা আলাপের পর মৃদঙ্গে যখন বাড়ি পড়ে আর মন্দিরায় আঘাত তখন শিল্পীরা শুরু করে কুচিপুড়িÑকাশিনাধা শাব্দাম।

লাইভ গান ও বাদনের সাথে প্রথম নাচটিই যেন পুরো আয়োজনের সিংহদুয়ার হাট করে খুলে দেয়। এতে অংশ নেয় নামিশা পাটনায়েক, অধরা সাহা, আনুশা চৌধুরী. ঈশিকা বড়–য়া, দীপান্বিতা চক্রবতীর্, পুনাম সিকদার, মনিরা জামান নাফিসা, সোফি সাইমন ও ইয়া—ওয়েন—ইয়েন। এই শিল্পীদের মধ্য থেকেই ৬ জন পরিবেশন করে কুচিপুড়ি জাতিস্মর। এই নাচটির শেষে শিল্পীরা শ্রদ্ধা জানায় কন্ঠ ও যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের। পরের নাচটি ছিল রাগ আরাভিতে রূপক তালে সরস্বতী নমস্তুতে। নাচের মধ্য দিয়ে জ্ঞান, মেধা, সংগীত ও শিল্পের প্রতি তাদের অনুরাগ বাঙ্ময় করে তোলেন অদৃতি রয়, সানিহা জামান আলভি, নবনীতা ভৌমিক এবং মাহনূর জাহান। এই পর্বে অংশ নেয়া ছোট চার শিশুর কোরিওগ্রাফি ছিল চমৎকার। পরের নাচটি ছিল রামায়ণা শাব্দাম। কুচিপুড়ির কোরিওগ্রাফিতে নৃত্যভাষায় এতে উঠে আসে রামায়ণের গল্প। এতে অংশ নেয় তিন কিশোরী নামিশা পাটনায়েক, আনুশা চৌধুরী ও ঈশিকা বড়–য়া। এর পরের নাচ বৃন্দাবনী সারাং থিলানা। এই নাচে অংশ নেয় অনুরাধা সাহা, আনুশা চৌধুরী, ঈশিকা বড়–য়া ও সোফি সাইমন। 

নীলা ড্যান্স একাডেমি আয়োজিত এই ধ্রুপদী নৃত্যের আয়োজনে গেস্ট অব অনার ছিলেন কামিনী ডান্ডাপানি। শ্রীমতি কামিনী কর্ণাটিক গান, ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকেল পিয়ানো আর ভরতনাট্যমের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পী। তিনি তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রবাসে নীলা ড্যান্স একাডেমির সূচিস্নিগ্ধ কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তিনি ড. নীলা জেরিনের তার একাডেমির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল আজকের এই পরিবেশনা বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নীলা জেরিন আজকের শিল্পীদের মতোই একসময় প্রশিক্ষণ নিয়েছে বিভিন্ন গুরুর কাছে। কামিনী ডান্ডাপানিকে ফুল ও উপহার প্রদান করেন ড. জেরিন।

দ্বিতীয় পর্বের আগেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শামা বাওয়া লাইভ মিউজিকের শিল্পীদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত পড়ে শোনান।

প্রথম পর্ব শেষ হয় মঙ্গলামের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় কত্থক নাচের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় পর্বের পুরোটিই ছিল কত্থক নৃত্যের। এবং এই পর্বে অংশ নেন তরুণী শিল্পীরা। এই সময় লাইভ মিউজিকের শিল্পী কণ্ঠে ফটিক চৌধুরী ও ড. নীলা জেরিন, তবলায় মাইক লুকশিস এবং সারেঙ্গী নিয়ে রোহান মিশ্র মঞ্চের বাম পাশে আসন গ্রহণ করেন।

কত্থক পর্বের প্রথমে ছিল গণেশ বন্দনা। তারপর তিনতালের পরিবেশনা, ঝাপতাল পরিবেশনা, সারগাম, তারানা ও গাট নিকাস এবং তিহাই পরিবেশনা। প্রতিটি অংশ শিল্পীরা হাত, মুখমন্ডল, চোখ, পায়ের পাতা ও স্পিনিংএর মধ্য দিয়ে দীর্ঘক্ষণব্যাপি কত্থকের সৌন্দর্য তুলে ধরেন। দৃষ্টিনন্দন এই পরিবেশনায় কণ্ঠে শাস্ত্রীয় সংগীত উপস্থাপন করেন ফটিক চৌধুরী, কণ্ঠে বোল উচ্চারণ করেন নীলা জেরিন। তবে নৃত্য পরিবেশনরত গ্রুপ থেকে এক এক জন করে মাইক্রোফোনে এসে বোল উচ্চারণ করেন। এসময় মাইক লুকশিস তবলায় আঙুলের অপার ও ক্ষিপ্র ব্যবহারের মধ্যে ক্লাইমেক্সে নিয়ে যান ও সারেঙ্গীতে রোহান মিশ্রর বাদন হৃদয়তন্ত্রীতে গিয়ে আঁচড় দেয়। দর্শক শ্রোতারা দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রীয়ের যুগল অনুভবে গভীরভাবে ডুবে যান। আর তবলার সাথে কত্থকের স্যাম ও তিহাই এর ক্লাইমেক্সে গিয়ে একই সাথে থেমে যাওয়া দর্শকরা উপভোগ করেন।

কত্থকের নাচে অংশ নেন ড. লিনিয়া আহমেদ কিকি, জেনি পল, রিদ্ধিমা শরাফ, শার্লিন তাজউদ, দিয়া ভনজানি, আল্পনা ভেদিয়ার, ক্রিস্টিনা ছেট্রি, লক্ষ্মী মেনন, শামিনি শেতী, শীতল মাল্লাভারাপু, বৈশালি জোসি, মুনিয়া মাহরিন, বিদিতা নাওয়ার, হৃদিকা বড়–য়া, জেসিকা বানিয়া, অর্পিতা সাহা, শৌমিতা সাহা ও জেনি পল।

একটানা দুই ঘন্টা ধ্রুপদী নৃত্য কুচিপুড়ি ও কত্থক পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধতা যখন থিয়েটার জুড়ে তখন এই পুরো নাচের কোরিওগ্রাফার ও গুরু ড. নীলা জেরিন মাইক্রোফোনে এসে এই নৃত্য অর্পন অনুষ্ঠানে আসার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ভাষায় ও কণ্ঠে সম্প্রতি তরুণ ধ্রুপদী নৃত্যের শিল্পী তাসিন ফেরদৌসের আকস্মিক প্রয়াণে গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, এটা আমাদের সকলের জন্য যেমন বুকভাঙা কষ্টের তেমনই অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি বলেন, কখনো তাসিন ফেরদৌসের নাচ দেখার সুযোগ না হলেও আমার কখনো মনে হয়নি তার সাথে আমার অদেখা সত্ত্বেও আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। আমি নিজে নাচের শিল্পী হিসাবে তার প্যাশন, ডেডিকেশন, ড্রিম ও নিজেকে সফল শিল্পী হিসাবে গড়ে তোলার যে সাধনা তা অনুধাবন করতে পারি। তিনি গভীর দুঃখের সাথে বলেন, একজন ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পীর অকালে চলে যাওয়া আমাদের সকলের জন্যই বিশাল ক্ষতি। কারণ এই ধরনের শিল্পী তৈরি হতে দীর্ঘ সাধনার প্রয়োজন।

ড. জেরিন বলেন, তাসিনের মা—বাবা, তার পরিবার, তার গুরু, বন্ধু এবং যারা তাকে চিনতো তাদের সকলের জন্য আমার এবং আমাদের একাডেমির পক্ষ থেকে সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানাচ্ছি।

এরপর তাসিন ফেরদৌস স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। 

সবশেষে নীলা ড্যান্স একাডেমির শিল্পী—শিক্ষার্থীদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেন এবং মেডেল পরিয়ে দেন তাদের নৃত্যগুরু নীলা জেরিন।

সমাপনী বক্তব্যে নীলা জেরিন এই অনুষ্ঠানে যারা নানাভাবে সহায়তা করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানান। পুরো অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন শামা বাওয়া।

উল্লেখ্য, আগামী ১৫ নভেম্বর রবিবার জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্ট সেন্টার জেপ্যাকে আয়েজিত হবে নীলা জেরিনের কত্থক নাচের অনুষ্ঠান ‘স্পন্দন ও কবিতা’ সন্ধ্যা ৬টায়।

Related Posts