আমেরিকার মধ্যমেয়াদী নির্বাচনের ভোট বিপ্লবে || ডেমোক্রেট ও মুসলমানদের উত্থান
বাঙালী প্রতিবেদনঃ গত মঙ্গলবারের মধ্যমেয়াদী নির্বাচনে ইতিহাস তৈরি করল নানা মাত্রার অজ¯্র ঘটনা। এইসব ঘটনায় নির্বাক রিপাবলিকানরা, বিস্মিত ডেমোক্রেটরা এবং উল্লসিত মুসলমানরা। এদের বাইরে রয়েছে লক্ষ লক্ষ ইমিগ্রান্ট, হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কোটি শিক্ষার্থী ও স্বল্প আয়ের মনুষ। এক কথায় এই নির্বাচন এমন এক ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে যা আমেরিকার এবং বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন পর্যায়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যারা সম্পৃক্ত এদেশের সাথে, তাদের নীতি নির্ধারণ, ব্যবসা—বাণিজ্য ও জীবনযাপনে বিশাল পরিবর্তন আনবে। কারণ জয়—পরাজয় নিয়ে মানুষের পূর্ব ধারণা থাকলেও এমন বিশাল জয় এবং ভয়াবহ পরাজয় ছিল কল্পনাতীত। সর্বশেষ প্রাপ্ত (শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত) খবর অনুযায়ী নিউইয়র্ক টাইমস বলছে সিনেটে ডেমোক্রেটরা পেয়েছে ৫৪টি আসন, আর রিপাবলিকানরা ৪৪টি। হাউজে ডেমোক্রেটরা পেয়েছে ২৫৩টি আর রিপাবলিকান পার্টি ১৬২টি। বাকি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল আসেনি। উল্লেখ্য, সিনেটের মোট আসন সংখ্যা ১০০ এবং হাউজের ৪৩৫। এই নির্বাচনে আমেরিকার ২৬টি স্টেটে ২৫৫ জন মুসলমান ভোটে প্রার্থিতা দিয়েছিলেন। এই প্রথম কোনো মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হলেন। এই ভোট বিপ্লবের কিছু খবর এখানে দেয়া হলোঃ
ডেমোক্র্যাটরা যা করবেন
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ নির্বাচনের রাতটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য এক স্বপ্নের মতো ছিল, যার বাস্তবতা জানুয়ারিতে এসে ধরা দেবে। মঙ্গলবার রাতে তাদের উল্লসিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। কেননা এক বিরাট বিজয়ের পর নতুন বছরের শুরু থেকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেবে ডেমোক্র্যাটরা।
‘আজ থেকে আমেরিকার মহান প্রত্যাবর্তন শুরু হলো,’ উচ্ছ্বসিত হাউজ ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরি ঘোষণা করেন।
মাসব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণার সময় নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর— যেমন দুর্নীতির তদন্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পেট্রোলের খরচ কমানো এবং ইরান যুদ্ধ সীমিত করা, তারা এখন পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবায়নের পথে আরও কঠিন পথচলা শুরু করবে।
ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন মানে এই নয় যে ডেমোক্র্যাটরা এখনই তাদের পরিকল্পনায় থাকা আইন প্রণয়নের বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন শুরু করতে পারবে।
কারণ, তাদের হাতে কংগ্রেস থাকলেও, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এখনো আইন প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রয়েছে।
যা ঘটেছে তাকে ডেমোক্র্যাটদের ‘জনগণের ম্যান্ডেট’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, বিবিসিকে এমনটাই বলেছেন মার্কিন সিনেটর ক্রিস কুনস। তিনি সতর্ক করে বলেন, দলটি এখনো ‘গভীরভাবে অজনপ্রিয়’।
‘আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা কাজ করতে পারি, মূলত তাদের উদ্বেগ ও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি, বিশেষ করে কম মজুরি এবং বাড়তে থাকা খরচ নিয়ে।’
ডেমোক্র্যাটরা যা অর্জন করতে পারে
শক্তিশালী ওভারসাইট কমিটির নেতৃত্ব দেবেন, যা ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরকে বেশ কঠিন করে তোলার ক্ষমতা রাখবে।
নির্বাচনের রাতে জয়সূচক ফলাফল আসতে শুরু করার পর এক বিবৃতিতে এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বলেন, ‘আইনজীবীর সাহায্য নিন’।
মার্কিন সিনেট ও হাউজ, উভয় কক্ষেই কমিটিগুলোর তদন্ত করার ক্ষমতা আছে, যা ব্যবহার করে তারা প্রেসিডেন্ট এবং তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ওঠা কথিত স্বার্থের সংঘাত এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে পারে।
মঙ্গলবার, সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর একটি তালিকা দেন গার্সিয়া। ট্রাম্পের পরিবার, কর্পোরেট দুর্নীতি, ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের বিরুদ্ধে ওঠা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং এপস্টিন ফাইলগুলো নিয়ে সরকারের কার্যকলাপ।
প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভা ও বিচার বিভাগীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করা বা আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে সিনেটের।
উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্পের মেয়াদে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে যদি কোনো শূন্যপদ তৈরি হয়, তাহলে সিনেট ডেমোক্র্যাটরা তাদের নতুন ক্ষমতা ব্যবহার করে মনোনয়ন আটকে দিতে পারেন। অথবা ট্রাম্পকে আরও মধ্যপন্থি প্রার্থী বেছে নিতে বাধ্য করতে পারেন, যিনি দ্বিদলীয় সমর্থন পাবেন।
প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট করার ক্ষমতাও হাউজের রয়েছে — যা কোনো কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরানোর জন্য কংগ্রেসের প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে দুইবার তাকে ইমপিচ করেছিল, যদিও সিনেট শেষ পর্যন্ত উভয় ক্ষেত্রেই তাকে খালাস দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
কিন্তু যেহেতু ইমপিচমেন্ট মামলায় একজন প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করতে সিনেটে দুই—তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ৬৭ ভোট প্রয়োজন হয়, তাই এই বিষয়টি সম্ভবত ডেমোক্র্যাটদের নাগালের বাইরেই থাকবে।
ডেমোক্র্যাটরা যা করতে হিমশিম খেতে হতে পারে
নির্বাচনের আগেই কংগ্রেসের কার্যকারিতা নিয়ে সুস্পষ্ট হতাশা ছিল আমেরিকানদের মধ্যে।
অক্টোবরে প্রকাশিত গ্যালাপের এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত ভোটারদের মাত্র ১৪ শতাংশ আইনপ্রণেতাদের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট ছিলেন।
হোয়াইট হাউজে একজন রিপাবলিকান, কিন্তু কংগ্রেস পরিচালনা করছেন ডেমোক্র্যাটরা, এর ফলে আমেরিকানরা আরও বেশি অচলাবস্থার মুখোমুখি হতে পারেন।
ট্রাম্পের কাছে কংগ্রেসের পাস করা আইন প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা আছে যা তিনি সমর্থন করেন না এবং কংগ্রেস কেবল উভয় কক্ষ থেকে সুপারমেজরিটি দিয়ে তাকে অগ্রাহ্য করতে পারে। মঙ্গলবারের সাফল্য সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
মঙ্গলবার রাতে তার দল একের পর এক সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার সময়, ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে কথা বলার সময় সমঝোতার সুর তুলে ধরেন ।
‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব, এবং আপনি জানেন, তাদের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় থাকব। আমরা সম্ভবত কিছু একটা ঠিক করে নেব,’ তিনি বলেন।
কিন্তু কয়েক মিনিট পরে, ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে তার প্রচারণার লাল টুপির ছবি পোস্ট করেন যার সামনে ‘ভেটো’ শব্দটি খোদাই করে লেখা। ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসের প্রতি তার এই দ্বৈত সত্তার কৌশলটি একটি মূল বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
যদিও ট্রাম্পের বিরোধিতা ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এনে দিয়েছে, আইনপ্রণেতারা মঙ্গলবার রাতে স্বীকার করেছেন, এটা যথেষ্ট নাও হতে পারে।
‘এটা অপ্রতিরোধ্যভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার এজেন্ডা ও নীতির প্রত্যাখ্যান,’ কুনস বিবিসিকে বলেন।
‘কিন্তু আমরা যদি অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করি, বা আমরা যদি নিজেদের মধ্যে খুব বেশি লড়াই করি, তাহলে আমরা এই মুহূর্তটি হারাতে পারি।’
ভেটোর হুমকি সত্ত্বেও জেফরি বলেছেন যে, তার দল মেডিকেইডের মতো স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিগুলোতে (যা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী ব্যবহার করে) এবং ওবামাকেয়ার মার্কেটপ্লেসে রিপাবলিকানদের করা উল্লেখযোগ্য কাটছাঁটগুলো পুনর্বহাল করতে চায়।
রিপাবলিকানরা হারার পাঁচটি কারণ
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ যদিও মধ্যবর্তী এই নির্বাচনগুলোয় বরাবরই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের খারাপ সময় যায়, তবে এবার রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়কে হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের একটি জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ ভোটার থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমে আসা পর্যন্ত— এখানে পাঁচটি কারণ তুলে ধরা হলো, যার জন্য রিপাবলিকানরা এতগুলো আসনে হেরেছে।
১. বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়
যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ভোটাররা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোয় মাঠ পর্যায়ে সেই ক্ষোভ ছিল সুস্পষ্ট।
‘গ্যাসের দাম, গ্রোসারি পণ্যের দাম, সবকিছুরই দাম বাড়ছে,’ নির্বাচনের আগে নর্থ ক্যারোলাইনার একজন ভোটার বিবিসিকে বলেন। তিনি আরও জানান যে, এই নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকানদের বদলে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।
সব ধরনের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দাম ৩.৭ শতাংশ বেড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য সেপ্টেম্বরে রেকর্ড করা প্রতি গ্যালন ৬.৫২ ডলার (৪.৮৩ পাউন্ড)—এর সামান্য নিচে ছিল।
ভোটার জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দশজনের মধ্যে আটজন ভোটার (৭৯ শতাংশ) বলেছেন যে গত এক বছরে মুদ্রাস্ফীতির কারণে তারা ও তাদের পরিবার গুরুতর বা মাঝারি ধরনের দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
আর দশজনের মধ্যে ছয়জনেরও বেশি উত্তরদাতা এর জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন এবং বলেছেন যে, তাদের মতে প্রেসিডেন্টের নীতির কারণেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দাম বেড়েছে।
২. অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধ
মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হলো ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। এর প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়, যা বিশ্বের তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
সেই সময় থেকেই মার্কিন ভোটারদের পেট্রোল পাম্পে এর মূল্য দিতে হচ্ছে।
যুদ্ধটি অধিকাংশ আমেরিকানদের কাছে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাগা রিপাবলিকানদের কাছেও এটি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফাস্টর্’ নির্বাচনী কর্মসূচির একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মতো মনে হয়েছে, যেখানে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন যে আর কোনো যুদ্ধ হবে না।
একটি ভোটার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় দশজনের মধ্যে ছয়জন (৬৩%) বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে, তিন—চতুর্থাংশ ভোটার (৭৪%) বলেছেন যে, কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সংঘাতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান কারণ ছিল।
নির্বাচনের পরের দিন সকালে ট্রাম্প পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের ভূমিকা স্বীকার করলেও ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।
৩. ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে সুশৃঙ্খল বার্তা
ডেমোক্র্যাটদের জয়ের এই ঢেউয়ের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছে কিছু শক্তিশালী প্রার্থীর কারণে, যারা বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোয় নিজেদের খাঁটি ও আন্তরিক প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
তারা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ সম্পর্কে একটি সুশৃঙ্খল বার্তা বজায় রেখেছিলেন।
প্রাক্তন শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টনও তাদের বিশ্বাস নিয়ে এমনভাবে কথা বলেছেন যা যথাক্রমে টেক্সাস ও কানসাসে মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুস অপ্রত্যাশিতভাবে জয়লাভ করেছেন। সাবেক এই শিশু বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ভার বহনযোগ্য করার যেসব আশ্বাস দিয়েছেন তা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, কারণ দেশটির অনেকেই এই ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করে।
সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল—সাইয়েদ, যিনি মিশিগানে সিনেটর হিসেবে জয়ী হয়ে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে রেখেছিলেন, তিনি ‘রাজনীতি থেকে অর্থ দূর করুন, অর্থ আপনার পকেটে আনুন’— এই স্লোগানটিকে মূল ভিত্তি করেছিলেন।
জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অসফ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দুর্নীতিকে তার মূল বার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। যে স্টেটে ট্রাম্প দুবার জয়ী হয়েছেন, সেখানে ৩৯ বছর বয়সী এই নেতার সহজ জয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুজবকে আরও উসকে দেবে।
এমনকি ট্রাম্প নিজেও ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করে ফক্স নিউজকে বলেছেন যে তারা ‘ভালো কাজ করেছে।’
অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী দুর্বল প্রচারণার জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন, যেগুলোতে ভোটারদের উদ্বেগের ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
৪. ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা রিপাবলিকানদের জন্য একটি বোঝা
যেসব বিষয় নিয়ে ভোটাররা সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট ছিলেন, যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ, তার মধ্যে দুটি সরাসরি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল, যার ফলে ২০২৪ সালে তাকে সমর্থনকারী কয়েকটি স্টেট বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
তিনি তার সমর্থকদের উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় ভোটারদের কল্পনা করতে অনুরোধ করেন যে, ব্যালটে তিনিই আছেন।
কিন্তু মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এক দশকেরও বেশি সময় থাকার পর, কেউ কেউ এই ফলাফলকে ট্রাম্পের পরিচিতির জৌলুস কমে আসার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে, নিজেকে রিপাবলিকান প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং মনে হচ্ছে তা হিতে বিপরীত হয়েছে।
ভোটের আগের মাসগুলোতে জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল যে, অনেক আমেরিকান চেয়েছিলেন ট্রাম্প যেন আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগের ওপর আরও বেশি মনোযোগ দেন।
৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মত পরিবর্তন আবার
দুই বছর আগে কিছু হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়া ট্রাম্পকে একটি নির্ণায়ক জয় পেতে সাহায্য করেছিল। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরিস্থিতিটা উল্টে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
টেক্সাস—মেক্সিকো সীমান্ত বরাবর অবস্থিত প্রধানত হিস্পানিক অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় ডিসট্রিক্টগুলোয় ডেমোক্র্যাটরা হাউজের তিনটি আসনেই জয়লাভ করেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক—সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলো রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ২২ শতাংশেরও বেশি ভোট দিয়েছে।
দেশের অন্য যেকোনো প্রধান জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর তুলনায় এই পরিবর্তন বেশি, বলেছেন তথ্য প্রতিবেদক জেফ অ্যাডেলসন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ইমিগ্রেশন আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের মধ্যেই এই পরিবর্তনটি এসেছে, যেখানে অধিকাংশ (৫৬ শতাংশ) আমেরিকান আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।
কৃষ্ণাঙ্গ—সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকেছে।
আমেরিকার রাজনীতিতে মুসলমানদের উত্থান
বাঙালী প্রতিবেদনঃ আমেরিকান থিংক ট্যাংক দ্য ক্রিশ্চিয়ান সেঞ্চুরি বলছে, ৯/১১এর পর থেকে সংঘবদ্ধভাবে মুসলিম বিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর কারণে যে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তারই ফলশ্রম্নতিতে আমেরিকান মুসলমানদের সংগঠিত হওয়ার জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়। কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স বা কেয়ার এর বরাত দিয়ে থিংক ট্যাংকটি সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে আমেরিকার ২৬টি স্টেটে ২৫৫ জন মুসলিম নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন। এই তথ্য মধ্যমেয়াদী নির্বাচনের আগের। তখন পর্যন্ত মিশিগানে আবদুল আল—সাঈদ নির্বাচিত হননি সিনেটর হিসাবে।
উল্লেখ্য অবদমন করতে চাইলে, অনেক কিছু অন্যায়ভাবে বা জোরপূর্বক দমন করা যায় না। মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমর ও মিশিগান থেকে রাশিদা তস্নাইবের কংগ্রস সদস্য হওয়ার পর যতটা না আলোচনায় আসেন তারা, তার চেয়ে অনেক বেশি আলোড়ন তোলেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি নির্বাচিত হওয়ায়। আর এই মধ্যমেয়াদী নির্বাচনে মিশিগান থেকে এপিডেমিওলজিস্ট আবদুল আল—সাঈদকে ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছুটে যান মিশিগানে। অপর পক্ষে আবদুলের পক্ষে দাঁড়ান সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
ফরেইন পলিসি ইন ফোকাস নামক অন্য একটি থিংক ট্যাংকও ২ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে বলছে, ইসলামোফোবিয়ার উত্থানের কারণেই নতুন প্রজন্মের মুসলিম তরুণ—তরুণীরা এগিয়ে আসছে এবং নির্বাচিত হতে চাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোহরান মামদানির বিজয় তাদের বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, গত মধ্যমেয়াদী নির্বাচনে ইউএস সিনেট, হাউজ ও স্টেট পর্যায়ের নির্বাচনে ব্যালটে ছিল প্রধানত ১২ জন মুসলিম প্রার্থীর নাম। তাদের মধ্যে জয়লাভ করেছেন ৯ জন প্রার্থী। এই ১২ জন প্রার্থী হলেন আবদুল আল—সাঈদ, রাশিদা তস্নাইব, ইলহান ওমর, ডারিয়ালিজা আভিলা শেভানিয়ার, আরিব কাওয়াস, এডাম হ্যামাওয়ে, আয়শা ওয়াহাব, রুয়া রোমান, লেটিশিয়া গ্লুমার, লতিফা সাইমন, আব্বাস আলাওই ও মরিয়ম খান।
যারা জয়লাভ করেছেন তারা হলেন: আবদুল আল—সাঈদ (সিনেটর, মিশিগান থেকে), এডাম হ্যামাওয়ে (নিউজার্সির কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ১২ থেকে), রাশিদা তস্নাইব (মিশিগানের কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ১২ থেকে), ইলহান ওমর (মিনেসোটার কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৫ থেকে), ডারিয়ালিজা আভিলা শেভানিয়ার (নিউইয়র্কের কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ১৩ থেকে), আন্ড্রে কারসন (ইন্ডিয়ানার কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৭ থেকে), লতিফা সাইমন (ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ১২ থেকে), আরিব কাওয়াস (নিউইয়র্কের স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট ১২ থেকে), আব্বাস আলাউই (মিশিগানের স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট ২ থেকে), নাবিলা সাঈদ (ইলিনয়ের স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট ২৬ থেকে)।
এছাড়াও ইলিনয় থেকে জিতেছেন স্টেট কংগ্রেসে দারিন লা হুড, কলোরাডোর স্টেট সিনেটে ইমান জোহেদ, রুয়া রোমান জর্জিয়ার স্টেট সিনেটে, ইলিনয়ের স্টেট হাউজে আবদেল নাসের রাশিদ। আরো জিতেছেন মিনেসোটা স্টেটে জয়নাব মোহাম্মেদ, ওহাইয়ো স্টেটে মুনিরা আবদুল্লাহি, কানেকটিকাট স্টেটে মরিয়ম খান ও সউদ আনোয়ার, ডেলওয়ার স্টেটে মদিনাহ উইলসন—এ্যান্টন, টেক্সাস স্টেটে সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি এবং পেনসিলভেনিয়া স্টেট হাউজে তারিক খান।
