যা দেখেছি যা বুঝেছি—৩৫ || মনিরুল ইসলাম, সাবেক রাষ্ট্রদূত

মতামত মতবাদ


পৃথিবীতে কত মতামত মতবাদ তার হিসাব পাওয়া দুরূহ। নানা মুনির নানা মত। মতামত থেকেই মতবাদের সৃষ্টি, দৃঢ় মতামতই মতবাদ। ব্যক্তিগত মতামতের সমষ্টিই হল সামাজিক মতামত। মতামত সর্বজন স্বীকৃত কোনো ফ্যাক্ট নয়, ট্রুথ নয়, অলঙ্ঘনীয় অনতিক্রম্য নয়। কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও ফমুর্লা ছাড়া কোনো সামাজিক তত্ত্বেরই চিরস্থায়ী সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা নেই। অথচ এই মতামত থেকে সৃষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে যুগে যুগে সংসারে এসেছে বিবাদ—বিভেদ, পৃথিবীতে এসেছে ক্রুদ্ধ যুদ্ধ। নির্যাতিত নির্বাপিত হয়েছে অসংখ্য প্রাণ। তাই ইচ্ছা করল আমারও একটা মতামত রেখে যাই: অন্যের মতামতের জন্য নিজের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করো না। 

বলুক না—বলুক, সব বিষয়ে সবার একটা মতামত থাকে। নিশ্চিত অভয় আর অবাধ স্বাধীনতা দিলে সবাই তার নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে পারে। সুতরাং কোনো একটি ‘বিশ্বাস’ সর্বজনগ্রাহ্য অপরিহার্য ব্যাপার নয়। কিছু প্রতিষ্ঠিত মতবাদেও মানবসমাজ বহুধাবিভক্ত। আমার মতামত আমি প্রকাশ করতে পারি, চাপিয়ে দিতে পারি না। চাপিয়ে দেয়ার সংকল্প থেকেই আসে পৃথিবীর সকল সংঘাত। বিভিন্ন ধর্ম—বর্ণের মানুষকে যেমন আমরা সহজভাবে গ্রহণ করি, তাদের মতামতকেও স্বাভাবিকভাবে স্বীকার করতে হবে।

মানুষের প্রবৃত্তি হল নিজের কথা/মতামত অন্যকে শুনিয়ে বিশ্বাস করানো। কায়েমি স্বার্থবাদীরা আপনাকে নিজেদের দল—উপদল—শাখাদলে টেনে নিয়ে যাবে, নিজ নিজ প্রভাববলয় বৃদ্ধির জন্য। আর এভাবে চলতেই থাকে লেজে—গোবরে বিভক্তির খেলা। কারণ, সকল মানবমন কখনো কিছুতেই এক হতে পারে না, হবেও না কোনোদিন। না—হওয়াই স্বাভাবিক। একই মতামত সবাই পোষণ করবে না, একই মতবাদ সবাই গ্রহণ করবে না। না করুক, সমস্যা নেই, যদি মিলেমিশে সবাই একত্রে সহাবস্থানে থাকতে পারি। একটি বাগানে যেমন বিভিন্ন ধরনের ফুল থাকলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, মানবসমাজেও বৈচিত্র্য থাকলে জীবনের আকর্ষণ বাড়ে।

মানুষ পুরোপুরি (১০০%) ভাল হতে/থাকতে চায় না বা পারে না, অথচ ধর্ম মানুষকে সকল মন্দ ত্যাগ করে শুধু ভাল হতে বলে। আসলে মানুষের মন থাকে আধা ভাল, আধা মন্দÑএই ভাল, এই মন্দ। আধেকে আধেকে মিলে পূর্ণ হয় তার মন। সেজন্যই সমাজপতিদের মতো একচ্ছত্র বিলাসী শক্তিধর হতে চায়। চাইবেই, এটাই তো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কেন যে আমরা মানুষের উপর দেবত্ব আরোপ করে তাকে মহামানব হিসাবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পাই। 

পানির ধর্ম কি? নীচে গড়িয়ে পড়া। আগুনের ধর্ম দহন, বাতাসের ধর্ম চলন। মানুষের ধর্ম কি? তার আসল ধর্ম প্রতিযোগিতা করে উপরে ওঠা, হিংসা করা, দখলে রাখা। তাই সে যে ধর্মের লেবাসই পরুকÑকিছু পাপী, কিছু দাগী, কিছু মিশ্রণ থাকবে সব ধর্মাবলম্বীর মধ্যে। 

শুধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স¦ার্থে মানুষ মানুষকে মতবাদ দিয়ে ভাগ করে রাখে, বোকা মানুষের পঙ্গপাল আবার চতুর মানুষের কথায় বিভক্ত হয়। মারামারিও করে। নেতারা বসে স্ট্রাটেজি ঠিক করে। নিজ মতবাদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য কিছু বুদ্ধিমান নেতা করেছে কিন্তু অপদার্থ অনুসারীরা অন্ধ হয়েছে। মতামত—মতবাদের অন্ধ অনুসারী কেন সৃষ্টি হয়? মতামতের ক্ষেত্রে মেরুকরণ হয়, মানুষ দুই প্রান্তের কোনো একটাতে চলে যায়। মানুষ যেমন ঘরের মধ্যখানে থাকতে চায় না, দেয়ালঘেঁষে একপ্রান্তে ঘুমায়, তেমনি মতবাদের ক্ষেত্রেও তারা ভারসাম্যের চেয়ে প্রান্তকেই পছন্দ/নিরাপদ মনে করে।

মুশকিল হল কিছু মানুষ তার মতামত মতবাদ নিয়ে অন্ধ হয়ে যায়, যাকে বলে ব্রেন—ওয়াশ। কেউ হিংসা—বিদ্বেষে একরোখা একচোখা হয়ে যায়। আসলে এটা হল ব্রেন—ব্লকড্, দরজা বন্ধÑঅন্য কিছু ভিতরে ঢোকে না, ঢুকলেও স্থান পায় না। তারা বুঝতে পারে না যে দরজা বন্ধ করে রাখলে অন্তরে আলো পড়ে না, সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায় না। এটা একটা রোগÑদুরারোগ্য ছেঁায়াচে ব্যাধি। ইদানীং ফেসবুকে এমন অনেক ক্রনিক রোগী দেখা যায়।

তাহলে কী করা? এই আপাত নৈরাজ্যের সমাধান কি? সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়া। যার যা ইচ্ছা বলুক করুক, সেভাবে চলুকÑশর্ত শুধু অন্যের ক্ষতি না করে চলা। দরকার অন্যের বিশ^াস কর্ম ও কথায় উত্তেজিত ক্রুদ্ধ খড়গহস্ত না হয়ে ধৈর্যধারণ করা, অন্যের মতামতে মতবাদে সম্মান প্রদর্শন করা। এখানে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভগ্ন শহর হার্গেসায় এসে দেখি সবাই রোজা। বললাম, আমিও রোজা! বিপ্লবীদের ভাষায় এটা আপোষকামিতা কিন্তু আমার মতে এটা তাদের বিশ^াসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিচক্ষণতা। যদি তাদের জীবনাচরণকে সম্মান করতে না পারি, তাহলে কেন আসলাম এখানে তাদের মাঝে?

নতুন জায়গায় ভিন্ন সমাজে অন্যরকম কিছু দেখলে আমরা মেনে নিতে পারি না। জঙ্গলে গেলে জংলী হও, সভায় সভ্যজন। যখন যেখানে যাও, বিদ্যমান ব্যবস্থা অনুসরণ করো, মেনে নাও, নীরব থাকো। না পারলে ভদ্র শান্তভাবে তোমার দ্বিমতের কারণ ব্যাখ্যা করো। কেউ তোমার কথা মেনে নেবে, কেউ শুনবে না, বিরোধিতা করবে। করুক, এটাই স্বাভাবিক। কোনো পক্ষেরই অনমনীয় হওয়া উচিৎ নয়।

সবাই যার যার মতো চললে সমাজের শৃঙ্খলা? যে সমাজে যে মতবাদে আপনার কিছুটা হলেও মিলে যায়, তাদের সাথে চলুন। বাঙালি থাকবে বাঙালির মতো, পশ্চিমা থাকবে পশ্চিমের মতো। ভালমন্দ তুলনা করতে গেলেই বাধে বিপত্তি। নিজ গোষ্ঠীতে নিজেদের মধ্যেও মতানৈক্য থাকতে পারে। তাই মতান্তরের সাথে, বৈপরীত্যের সাথে সহাবস্থান করতে শিখুন। ধীর—শান্ত চিত্তে বৈচিত্র্যকে নিয়ে ভাবুন, নিজের যুক্তির সাথে তার যুক্তি নিয়েও চিন্তা করুন। বলুন, তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার কিন্তু চলো আমরা সহাবস্থান করি।

সব মতবাদই কোনো এক বা কিছু মানুষের মতামত, সুতরাং এটাই স্বাভাবিক যে সবাই তা মানবে না। নিজের বিশ^াস ধারণ করেও অন্যের বিশ^াসকে সম্মান করো, তাকেও তার বিশ^াস ধারণ করতে দাও। অর্ধেক তোমার পক্ষে, অর্ধেক থাকবে বিপক্ষে। অর্ধেক মতবাদ তোমার পছন্দ হবে, অর্ধেক পছন্দ হবে তোমার বিপক্ষের। দুই আধা আধি নিয়েই গঠিত/পূর্ণ হবে ‘এক’ মানবসমাজ। তাদের অনন্যতার মধ্যেও ঐক্য বিরাজমান। একটা বস্তুতে যেমন ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু পাশাপাশি অবস্থান করে বস্তুটাকে সৃষ্টি করে, তেমনি ভিন্ন প্রকৃতির মানুষও সহাবস্থান করে সমাজ সৃষ্টি করে।

পৃথিবীর রকমভেদ দেখে বিরক্ত হই কিন্তু পৃথিবী তো আমার মতে চলবে না, পৃথিবী চলবে যত কোটি মানুষ, তত কোটি মতে। একই জল বিভিন্ন রঙের গ্লাসে রাখলে সেরকম রঙ ধারণ করে, তেমনি একই বিষয়Ñযেমন সত্য, পাপ, ন্যায়Ñবিভিন্ন মানবমনে প্রতিফলিত হয়ে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষিত হয়। তাই আমরা সবাই একমত হতে পারি না। আর সেজন্যই নতুনতর চেতনা—উদ্ভাবনা এগিয়ে যাচ্ছে।

জোর করে বিশ^াসের পরিবর্তন করো না, ভাল লাগলে বিরোধীদের কেউ কেউ একদিন তোমার বিশ^াসেও আসতে পারে, তুমিও তার বিশ^াসে/দলে ভিড়তে পারো। দল পরিবর্তন না হলেও মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না, সবাইকে নিজ নিজ পথে চলতে দাও। আর অন্যের দেয়া মতামত প্রতিষ্ঠার জন্য মারপিট করা তো মহাবোকামি।  অন্য একজনের মতামত তৃতীয় কাউকে গেলানোর জন্য নিজের সুন্দর জীবন কদর্য করো না। বিশ্বাসের চেয়েও জীবনের মূল্য বেশি। জীবন থাকলেই আসে বিশ্বাস, জীবন না থাকলে বিশ^াস দিয়ে কী হবে। সুতরাং বিশ^াসের জন্য মরে যেয়ো না, অন্যকে মেরে ফেলো না। পৃথিবীর ক্ষণিক জীবনে দরকার শুধু শান্তি, সেজন্য দরকার সহাবস্থান সহানুভূতি।

জানি, তাও হবে না, শান্তির পাশাপাশি অশান্তিও চলতে থাকবে। চলুকÑঅস্থির হয়ো না, কারণ সবই আধাআধি। পাশাপাশি দুই আধাআধি বয়ে চলুক। চিরবহমান দুই বিপরীত ে¯্রাতধারা: সাম্য—অসাম্য, ন্যায়—অন্যায়, সত্য—মিথ্যা সমান্তরালে বয়ে যাওয়া কেউ থামাতে পারবে না। এক ে¯্রাত থামিয়ে অন্য ে¯্রাত চলতে পারে না, সময়ে একটা অন্যটার চেয়ে দুর্বল বা শক্তিধর হতে পারে কিন্তু মরে যাবে না, মারতে যেয়ো না। সবই যখন আধাআধি, তুমি এক আধে/দলে থেকে অন্য আধেক/দলকে মারতে চাও কেন? তাহলে প্রকৃতির দুই আধাআধি মিলে জিনিসটা এক/পূর্ণ/সম্পূর্ণ হবে কীভাবে।
শেষকথা, মতামত মতবাদের ক্ষেত্রে প্রান্তিক বা চরমপন্থী হলেই বিপদ, নিজের এবং অন্যের। কোনোকিছু নিয়ে অত্যুৎসাহী না হয়ে মডারেট বা উদারপন্থী হয়ে মাঝামাঝি থাকতে হবে, ‘আধাআধি’র মধ্যপন্থাই স্বাভাবিকতা। প্রকৃতির এই সত্যকে গ্রহণ করে নিতে পারলে হয়ত মানবসমাজে সংঘাত—সংহার কিছুটা কমে আসবে, ব্যক্তিজীবন সুখী ও শান্তিপূর্ণ হবে।


Related Posts