দিনবদলের লক্ষণ কিন্তু দেখছি না || সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শিল্প—সাহিত্যের চর্চা কখনোই নিরুপদ্রব ছিল না, এখনো নেই। আমরা, বাংলাভাষীরা, নানা ধরনের বিপদাপদের মধ্যে থাকি। অন্যরা তাদের ভাষা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। আমাদের ভূমি, গ্যাস—তেল—বন্দর লুণ্ঠন করার ষড়যন্ত্র করে। বাণিজ্যের নামে একপেশে দেশবিরোধী চুক্তি চাপিয়ে দেয়। সমুদ্রে পানির উচ্চতা ফুঁসে ওঠে; আমাদের এই অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ বলে খবর আসে। এর মধ্যে আবার এক ভয়ংকর নতুন বিপদের আভাস দেখা যাচ্ছে; ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশের ওপর প্রবহমান আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অমানবিক চেষ্টার পেছনে রয়েছে বিশ্বব্যাংক ও প্রবাসী ধনী ভারতীয় মহাজনদের পুঁজি এবং ভারতের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার। আমরা যাই কোথায়?

পানির অপর নাম যে জীবন সেটা বাঙালির জন্য যতটা সত্য অনেকের জন্যই ততটা সত্য নয়। বাঙালির স্থলভূমি যেমন মনোভূমিও তেমনি নদীনির্ভর। নদী না থাকলে এই ভূমির নিজস্বতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে; এর মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, মাছ সব প্রাণীর পক্ষেই বেঁচে থাকা তো অবশ্যই, টিকে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। বাংলার অর্থনীতিতে খাদ্যে বাসস্থানে যেমন বাঙালির কল্পনা অনুভূতি, চিন্তা—ভাবনায় আচার—আচরণেও তেমনি নদী যেভাবে রয়েছে সেভাবে অন্য কিছু নেই। বাঙালির জীবনযাপন ও সংস্কৃতির প্রতিটি এলাকায় নদী প্রবহমান, সেই নদী ধ্বংসের তৎপরতা সফল হলে বাঙালি বদলে যাবে। রাজনৈতিক দ্বিখণ্ডীকরণে যে অনিষ্ট হয়েছে তা চূড়ান্ত রূপ নেবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। এই মারাত্মক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ অবশ্যই রুখে দাঁড়াবে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষদেরও পিছিয়ে থাকার কথা নয়। ফারাক্কা বাঁধ পশ্চিমবঙ্গের উপকার করেনি, অপকার ঘটিয়েছে অপূরণীয়। এখন যা আসছে বলে আশঙ্কা তার তুলনায় ফারাক্কা তো কিছুই নয়। নদী—প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তাই কেবল স্থানীয় হবে না, তাকে হতে হবে সেই সঙ্গে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক। শুধু পশ্চিমবঙ্গের বলে নয়, ভারতের বিবেকবান মানুষরাও ওই দানবীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে ধ্বনি তুলবেন বলে ভরসা করি; বিশ্বজুড়ে ওই পদক্ষেপ ধিকৃত হবে এও আমাদের আশা।

বিপন্ন আমরা বিশ্বায়নের আগ্রাসনের কারণেও। ওই হাঙরের ভয়ংকর গ্রাস বিশ্বব্যাপী দরিদ্র দেশ ও দরিদ্র মানুষের সমস্ত আশা—ভরসাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। শিল্প তার উদরে চলে গেছে, কৃষিকেও সে বাদ দিচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো দেশের পণ্য বিশ্ববাজারে যাবে এটা প্রায় অসম্ভব, কিন্তু আমাদের ওপর অসম্ভব জোরালো চাপ রয়েছে বাংলাদেশের বাজারকে ধনী দেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার। ধনী দেশগুলো নিজেদের দেশে কৃষিতে ভর্তুকি দেয়, ক্ষেত্র বিশেষে রপ্তানি মূল্যকে উৎপাদন মূল্যের এক—তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনতেও দ্বিধা করে না; কিন্তু তারা গোঁ ধরে বসে থাকে গরিব দেশগুলো নিজেদের দেশে কৃষিতে ভর্তুকি দিতে পারবে না, দিলে শাস্তি পাবে। গরিব দেশগুলো শিল্পে অনগ্রসর, তাদের নির্ভরতা কৃষির ওপর; বিশ্বায়ন সেই কৃষিকেও বাঁচতে দেবে না। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে প্রতিবাদ উঠছে, প্রতিরোধ সংগঠিত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধিবেশন তাই ধনীদেশগুলোর আজ্ঞামতো চলছে না। কানকুনে সংস্থার অধিবেশন ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক এই প্রতিরোধে বাংলাদেশকেও যোগ দিতে হবে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অস্থির রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে।

কথা ছিল দিনবদলের, সেটা ঘটছে কি? না, ঘটছে না। এমনকি আওয়াজটা পর্যন্ত ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। তা লোকে কি সত্যি সত্যি আশা করেছিল যে দিনবদল ঘটবে? না, করেনি। অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের আশাবাদী হতে শিক্ষা দেয়নি। তবে একেবারেই কাছে ছিল বিগত সরকারের দুঃশাসন, দুর্নীতি, অর্থ লুণ্ঠন পাচারের ও চোরাচালানি তৎপরতা ইত্যাদি কর্মব্যস্ততায় মানুষ এতটাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল যে, অন্তত ওই খপ্পরে আর পড়তে হবে না এটা ভেবেই দলে দলে গিয়ে হাজির হয়েছিল ভোট কেন্দ্রে। এখন যতই সময় যাচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে, দিনবদল ঘটবে না। যে হাওয়া ইতোমধ্যে বইতে শুরু করেছে তা নরম নয়, গরম বটে, আরও যদি গরম হয় তাহলে মানুষ গভীর হতাশা ও ক্ষোভের ভিতর নিপতিত হবে—এমনটাই আশঙ্কা।

লোকে গণতন্ত্র চায় এবং স্বৈরাচার পছন্দ করে না—তা সেই স্বৈরাচার সামরিক, কিংবা নির্বাচিত যে ধরনেরই হোক না কেন। মানুষ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার এলে দেশে যথার্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে। গণতন্ত্র জিনিসটা আসলে কী তা বোঝা মুশকিল এবং সাধারণভাবে এটা বলা অসঙ্গত নয় যে, গণতন্ত্র কি নয় তা বলা যতটা সহজ, গণতন্ত্র কী তা বলা ততটা সহজ নয়। তার একটা কারণ, গণতন্ত্রের ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে, আমরা শাসিত হয়েছি নানাবিধ স্বৈরাচারের দ্বারা, যা কখনো এসেছে প্রকাশ্যে অন্য সময়ে ছদ্মবেশে। তা ছাড়া ওটাও সত্য, আমাদের বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থায় যথার্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তবে গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায় না তা আমরা বিলক্ষণ জানি। সেটাও জেনেছি অভিজ্ঞতা থেকেই। যেমন আমরা জানি গণতন্ত্র মানে সংখ্যাগরিষ্ঠের একচ্ছত্র আধিপত্য নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভে ও দাপটে জনগণের দুর্দশা যে কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছতে পারে, সে ব্যাপারে ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে।

লোকে তাদের প্রত্যাখ্যান করে এবার বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিরঙ্কুশ, সেই বলে বলীয়ান হয়ে তারা যদি আগের শাসকদের মতোই আচরণ করে তবে কেবল যে জনগণের ক্ষতি হবে তা নয়, যারা এখন দেশ শাসন করছেন তাঁদের জন্যও ব্যাপারটা বিপজ্জনক হবে, সন্দেহ নেই।

গণতন্ত্রের জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে স্থানীয় শাসন। স্থানীয় শাসনের অর্থ হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তার এই বিকেন্দ্রীকরণের মূল কথাটা হলো তৃণমূলে স্থানীয় মানুষরাই নিজেদের দেখভাল করবেন, কর্তৃত্ব থাকবে তাদের হাতেই; কেন্দ্রীয় শাসন অবশ্য থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, তবে সে শাসনের পরিধি যতটা খাটো হবে সমাজের ততটাই উপকার ঘটবে। স্থানীয়ভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, স্থানীয় লোকেরা যতটা সম্ভব নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নেবেন। কিন্তু শাসনক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণে এ পর্যন্ত কোনো সরকারই উৎসাহ দেখায়নি। অথচ আমাদের সংবিধানের ৪৯, ৫৯ ও ৬০ ধারায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে, স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অধীনেই থাকবে। বলা আছে, স্থানীয় শাসন স্থানীয় মানুষদের স্বার্থের তদারকি করবে; আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়নও বাস্তবায়নের দায়িত্বও হবে তাদেরই। স্থানীয় সরকার করারোপ করা এবং নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের অধিকারও পাবে।

সংবিধানের অনেক কিছুই কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, তবে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিধানগুলো কিন্তু এখনো অক্ষতই রয়ে গেছে। তাই আশা করা গিয়েছিল, দিনবদলের হাওয়া ওইখান থেকেই বইতে শুরু করবে। নতুন বিধি তৈরি করে স্থানীয় সরকারকে সুযোগ দেওয়া হোক একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। কিন্তু জাতীয় সংসদে আইন পাস করে উপজেলায় সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সংসদ সদস্যরা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন, তাঁদের পাশ কাটিয়ে উপজেলা পরিষদ সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে না। এ ঘটনা কেবল যে অপ্রত্যাশিত তা নয়, অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জকও বটে। এমনিতেই রাজধানী অতিকায় হয়ে উঠেছে, গ্রামে কর্মের সংস্থান নেই, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক; গ্রাম শুকিয়ে যাচ্ছে, পানির অভাবে তো বটেই, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের অভাবেও। এ ঘটনা তাৎপর্যহীন নয় যে, জাতীয় সংসদের যে সদস্যরা এমন কোনো ইস্যু নেই যা নিয়ে বিভক্ত হন না, অথচ স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা হরণের বিষয়ে তাদের ভিতর কোনো অনৈক্য দেখা যায়নি। এতে অবশ্য বিস্ময়ের কোনো ব্যাপার নেই। তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে চান, জনগণের ক্ষমতা কমিয়ে। আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে পর্যুদস্ত করা কোনো শুভ লক্ষণ নয় এবং দাবি করি যে, আইন সংশোধন করে ক্ষমতা উপজেলা পরিষদের হাতে অর্পণ করা হোক। সেটা না করলে দিনবদল তো হবেই না, বরঞ্চ উল্টোটাই ঘটবে।

সমাজে ভালো দৃষ্টান্তের বড়ই অভাব। সে দৃষ্টান্ত সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া যাচ্ছে না শাসক শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছাত্রসংগঠনের কাছ থেকেও। দিনবদলের দায়িত্ব তাই তাদেরই নিতে হবে যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। মুশকিল হলো তাঁরা সংগঠিত নন। জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়ালে তাঁদের জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়াটা অবধারিত। এতে বোঝা যায়, তাঁদের পথটা টাকা খরচ করে এবং মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হওয়ার নয়, তাদের পথটা হলো আন্দোলন। আন্দোলনেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে বলে ভরসা করি।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts