তাহাদের কথা পর্ব—২৮ || মারিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প পরাগ সঞ্চিতা কানেকটিকাট
মারিয়ার পোস্ট—ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) শুরু হয়েছিল তেরো বছর বয়সে। টানা চার বছর ধরে গুরুতর যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থেকে ওর এই পিটিএসডি হয়। তখন থেকেই সবসময় অজানা এক আশংকা, ভয় ওর মনে চেপে বসে। পিটিএসডি এমন একটি মানসিক অবস্থা, যে ভোগে সেই শুধু জানে। এই মানসিক অবস্থার ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মারিয়ার পিটিএসডি’র বিভীষিকাময় ইতিহাস শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়! মারিয়ার জন্ম পুয়ের্তোরিকোর রাজধানী সান হুয়ান শহরে। পুয়ের্তোরিকো যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত একটি ভূখন্ড। মারিয়া যখন খুব ছোট ছিল তখন রোড একসিডেন্টে ওর মা মারা যায়। নিজের মায়ের কথা ওর মনেও নেই। মায়ের মৃত্যুর পর ওর বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। মারিয়ার সেই সৎ মা দেহ ব্যবসাতে জড়িত ছিলেন। মারিয়ার বয়স যখন ১৩ বছর তখন ওর সৎ মা পুয়ের্তোরিকোর এক দেহ ব্যবসায়ীর কাছে মোটা অর্থের বিনিময়ে মারিয়াকে বিক্রি করে দেয়। সেই দেহ ব্যবসায়ী পুয়ের্তোরিকো থেকে মারিয়াকে আবার বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের আর এক দেহ ব্যবসায়ী চক্রের কাছে। এই হাত বদলের পালায় কিশোরী মারিয়া যেসব নির্মম অভিজ্ঞতা পার হয়েছে সেই সব লোমহর্ষক জঘন্য কাহিনী আজকে আর না’ই বললাম। এদিকে মারিয়ার দুই খালা থাকতেন বস্টনে। সেই দুই খালা যারা তাদের মৃত বোনের একমাত্র সন্তান মারিয়াকে পাগলের মতো খুঁজতে থাকেন আর শরণাপন্ন হন ন্যাশনাল ক্রাইম ইনফরমেশন সেন্টারের। তারপর এফবিআই দীর্ঘ চার বছর খোঁজাখুঁজির পর রোড আইল্যান্ডের সেই আন্ডারগ্রাউন্ড নারী পাচার চক্রের সন্ধান পায়। ওখান থেকে মারিয়াকে উদ্ধার করে তুলে দেয় ওর খালাদের হাতে। ততদিনে মারিয়ার বয়স হয় ১৭ বছর। টানা চার বছরের নির্যাতন, আর শারীরিক—মানসিক আঘাতে ক্ষত বিক্ষত ট্রমাটাইজ মারিয়া কোনো দিন আর স্বাভাবিক হতে পারেনি, কিন্তু চেষ্টা করে গেছে স্বাভাবিক একটি জীবন যাপনের।
বাইশ বছর বয়সে মারিয়ার প্রেম হয় হোরহে’র সাথে, বস্টনে ওদের বিয়ে হয়, ওর স্বামী হোরহে’র কাজের জন্য চলে আসে কানেক্টিকাটে। এখানে ওদের পর পর তিনটি বাচ্চা হয়। মেঘে মেঘে দিন গড়িয়েছে অনেক, এখন মারিয়ার বয়স ৪৩ বছর। কিন্তু শত চেষ্টা করেও মারিয়ার মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা চাপা দেওয়া যায়নি, ওর পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) প্রতিনিয়তই ওর সঙ্গী ছিল। এন্টিডিপ্রেশনের ওষুধে কাজ না হলে প্রায়ই ওকে যেতে হয়েছে হাসপাতালে। বেচারা হোরহে অনেক চেষ্টা করেও মারিয়ার সাথে এক বাড়িতে একসাথে থাকতে পারেনি, দুজন আলাদা হয়ে গেছে। দীর্ঘ বারো তেরো বছর সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি। হোরহে ফিরে যায় বস্টনে আর মারিয়া ওদের তিন ছেলে—মেয়েকে নিয়ে থেকে যায় কানেক্টিকাটে। হোরহে প্রতি মাসে বাসা ভাড়া, খাবার খরচ সবই দেয়, প্রতি সপ্তাহে ছেলে—মেয়ে আর মারিয়ার সাথে দেখা করে যায়। ওদের এখনো ডিভোর্স হয়নি কিন্তু ওরা স্বামী—স্ত্রী দুজনে আলাদা বা সেপারেশনে থাকে।
বেচারা মারিয়া যখন নিজের মানসিক সমস্যা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে তখন কিছুদিন আগে ওর ষোলো বছরের মেয়েটিরও মানসিক সমস্যা ধরা পড়েছে। নিজেকে কষ্ট দেয়ার জন্য মেয়েটি স্কুলে গিয়ে হাতের কব্জির চামড়া ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলে। এই ঘটনার পর হাসপাতাল, পুলিশ, আর সরকারের এজেন্সি ডিসিএফ (ডিপার্টমেন্ট অব চিলড্রেন এন্ড ফ্যামিলিস/ শিশু ও পরিবার বিভাগ) জড়িত হয়ে পড়ে। গত কয়েক মাস যাবৎ এতো সব কিছু সামাল দিতে গিয়ে মারিয়ার প্যানিক এ্যাটাক হয়েছিল। ৪৩ বছর বয়সী পুয়ের্তোরিকান হিস্পানিক মারিয়া আত্মহত্যা করার জন্য পুরো এক বোতল এংজাইটি বা দুশ্চিন্তা কমানোর ট্যাবলেট সবগুলো একেবারেই খেয়ে ফেলেছিলো! তারপর নিজেই ৯১১—এ ফোন করে এ্যাম্বুলেন্স করে ইমার্জেন্সিতে যায়। তারপর টানা এক মাস ম্যানচেস্টার মেমোরিয়াল হসপিটালে সাইকিয়াট্রিক ইউনিটে মানসিক চিকিৎসার পর সপ্তাহ দুয়েক আগে বাড়িতে ফিরেছে। আত্মহত্যা চেষ্টার জন্য মারিয়া ওর তিন সন্তানের কাস্টডি হারায় আর ওর হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে ডিসিএফ—এর হস্তক্ষেপে বাচ্চাদের কাস্টডি পেয়েছে ওর স্বামী হোরহে।
যা বলছিলাম, মারিয়া পাশাপাশি দুই ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে। ওর দুটি ডায়াগনোসিস হলো: পোস্ট—ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) আর সেই সঙ্গে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (উইথ সাইকোটিক ফিচার)। পোস্ট—ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা কোনো অত্যন্ত চাপপূর্ণ বা ভয়াবহ ঘটনার অংশ হওয়া বা তার সাক্ষী হওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে সেই ঘটনার ফ্ল্যাশব্যাক, দুঃস্বপ্ন, তীব্র উদ্বেগ এবং অনিয়ন্ত্রিত চিন্তা। ১৩ বছর বয়স থেকেই বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং পিটিএসডি সম্পর্কিত উপসর্গগুলো মারিয়ার ছিল। যে কারণে মারিয়া মনমরা ভাব, কোনো কিছুতে আগ্রহ না পাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা, হতাশা, ঘুমের সমস্যা এবং নিরানন্দ বা আনন্দহীন এক জীবন যাপন করছিলো। সব সময় মারিয়া কোনো না কোনো এক অজানা উদ্বেগ—আশংকাতে উত্তেজিত থাকতো, ভয়ংকর কিছু ঘটার ভয় এবং খিটখিটে মেজাজ যেন ওর নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল। আর সঙ্গে ছিল মারিয়ুয়ানা মাদক ব্যবহারের অভ্যেস। মারিয়ার দ্বিতীয় ডায়াগনোসিস মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (উইথ সাইকোটিক ফিচার) একটি অত্যন্ত গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা যা চিকিৎসা না করা হলে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ভুক্তভোগীরা বিষণ্ণতার বিধ্বংসী চরমাবস্থার পাশাপাশি সাইকোসিসের ভীতিকর বিভ্রম এবং হ্যালুসিনেশন অনুভব করেন, এবং এই দুইয়ের সংমিশ্রণের ফলে সৃষ্ট লক্ষণগুলো মানসিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অত্যন্ত দুর্বল করে দেয়। হসপিটালে যাবার আগে ওর এই বিষণ্ণতা, অস্থিরতা মাত্রা ছাড়িয়ে প্যানিক অ্যাটাক হয়ে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, আর না পেরে ও নিজেকে শেষ করে ফেলার জন্য ওষুধের বোতলের সব ওষুধ খেয়ে ফেলে, আর ওকে ম্যানচেস্টার মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
তো যা বলছিলাম, মারিয়া হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়িতে এসেছে সপ্তাহ দুয়েক আগে। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসা এই মারিয়া যেন অন্য এক মারিয়া! আগে ওর মধ্যে সবসময় একটা উদ্বেগ আর অস্থিরতা কাজ করতো, সার্বক্ষণিক অভিযোগ—আক্ষেপ করতে করতে ওর চেহারাটা কেমন বিষন্ন হয়ে থাকতো। শ্বেতাঙ্গিনী না বলে বলা যায় পিঙ্গল সোনালী পীতবর্ণের মারিয়ার বাদামি রঙের চুলগুলো সবসময় উসকো—খুসকো হয়ে থাকতো, চোখ দুটো থাকতো অস্থির—উদ্ভ্রান্ত, পোশাক—আশাকের দিকে ওর কোনো খেয়াল ছিলোনা। কিন্তু আজকে আমি এক্কেবারে অন্য এক মারিয়াকে দেখলাম। পরিপাটি পোশাক, লম্বা বাদামি রংয়ের চুলে বেণী করা। ওর সেই বিষন্ন চেহারা আর নেই! তার বদলে স্বাভাবিক, শান্ত, আত্মবিশ্বাসী অন্য এক মারিয়াকে দেখে আমি অবাক। যদিও জানি চার সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এন্টি—ডিপ্রেসেন্ট ওষুধের প্রভাবে ওর মেজাজের এই পরিবর্তন হয়েছে, তবুও কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে।
তিন সন্তানের কাস্টডি হারিয়ে ওর মনটা একটু খারাপ, কিন্তু মারিয়া তা মেনে নিয়েছে। নিজেই নিজেকে সান্ত¦না দিচ্ছে আর তাই আজকে বার বার বলছিলো ‘আমি নিজের যত্ন না নিলে অন্যদের যত্ন কিভাবে করবো?’ মারিয়া খুব ধীর—স্থিরভাবে আমাকে যা বললো, তাহলো মারিয়া ভেবেছিলো ও একা একা থাকতে পারবে না। কিন্তু ও ওর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে, ও এখন বাঁচতে চায় নিজের জন্য। ও আপাতত নিজের যত্ন নিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, এক্সসারসাইজ করা, হেলদি ডায়েট, বাসা পরিষ্কার করা, হাঁটতে যাওয়া, থেরাপিতে আর সাপোর্ট গ্রুপে অংশ নেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ করেই যেন ওর বোধোদয় হয়েছে যে এখন ওর নিজের যত্নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অবশেষে মারিয়া যেন নতুন করে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। মারিয়ার এই আমূল পরিবর্তন আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এই পরিবর্তন কি নতুন কোনো দুর্ঘটনার আলামত? নাকি জীবনের বিপরীত স্রোতে ভেসে যাওয়া এক সৈনিকের কূলে ফেরার শেষ চেষ্টা? আমার নিছক আশংকা যেন সত্যি না হয়, আবার যেন ও কোনো হসপিটালের মানসিক ইউনিটে বিভ্রান্তির গোলক ধাঁধায় নিজেকে হারিয়ে না ফেলে। মারিয়ার এই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা যেন সফল হয়।
—কানেক্টিকাট থেকে
