মধ্যমেয়াদী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারার কারণ || ৫ হাজার ডলারের টোপ কাজে লাগল না

বাঙালী প্রতিবেদনঃ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মাথার ওপর ৩৫টি মামলার রায় নিয়ে এবং বেশ কয়েকটি চলমান ফেডারেল মামলা নিয়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করেন। ঐ বছরের নির্বাচনী ফলাফলে আমেরিকার মানচিত্র লাল হয়ে যায়। যেমন ১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটনের বিজয়ে এবং ২০০৮ সালে বারাক ওবামার বিজয়ে মানচিত্র নীল হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশীসহ আমেরিকার ভোটাররা আশা করেছিলেন ক্ষমতাহীন চার বছরে আইনি জটিলতায় পড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে নাস্তানাবুদ হয়েছিল, নিশ্চয় তা থেকে তার বোধোদয় হবে। তিনি নিশ্চয় দ্বিতীয় মেয়াদে ভোটারদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। কিন্তু কি যেন সোজা হয় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৫ এর ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করে প্রথম দিনেই প্রায় ১০০টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। এই প্রায় ১০০টি নির্বাহী আদেশের সবগুলিই নিশ্চয় জনবিরোধী ছিল না। কিন্তু বেশির ভাগই ছিল এ দেশের দরিদ্র, স্বল্প আয়ের ইমিগ্রান্ট, যাদের গায়ের রং সাদা নয়, তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য। বলতে গেলে তখন থেকেই এ দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ আতংকগ্রস্ত হয়ে ওঠে। তাদের চিকিৎসা সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে, খাদ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে, উচ্চশিক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়ে, বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়।

শুধু আমেরিকায় নয়, যেসব দেশ আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে তাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করে শুধু সেসব দেশের বাণিজ্যে জটিলতা সৃষ্টি করলেন না, এসব পণ্যের মূল্য এমনভাবে বেড়ে গেল যে তার দায় গিয়ে পড়ল আমেরিকার জনগণের পকেটে। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া ইরান আক্রমণ করে কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন ভাঙচুরের মধ্যে ফেললেন তা নয়, হোমওয়ার্ক না করার কারণে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সৃষ্ট পেট্রোল ও পণ্য পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল বন্ধ বা বাধাপ্রাপ্ত হলে গ্যাসের দাম বেড়ে আকাশচুম্বি হয়। আর এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপি। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ‘বিগ বিউটিফুল বাজেট’ নামে যে বাজেট ঘোষণা করেন, তাতে আমেরিকার একমাত্র ধনী ছাড়া বিভিন্ন স্তরের মানুষ ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে। তিনি তার ভেতরের রাগ—ক্ষোভ—ঈর্ষা—প্রতিশোধপরায়ণতা কোনো কিছুই গোপন না করে তার সব কিছুই সম্পূর্ণ নগ্ন করে দেখিয়ে দেন।

প্রেসিডেন্ট আমেরিকার গণতন্ত্রের অন্যতম তত্ত্বাবধায়ক, সংবিধান সমুন্নত রাখার ওয়াচডগ, এদেশের মানুষের কাছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তাঁরই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে ড্যামেজ করেছেন। তিনি ইতিহাস ঐতিহ্য বোঝেন না। গ্রান্ড বল রুম বানানোর জন্য হোয়াইট হাউজের একাংশ ভেঙে ফেলেন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া। নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন সর্বোচ্চ আর্ক পটোম্যাক রিভারের তীরে। আর কেনেডি সেন্টার থেকে আটলান্টিক মহাসাগর সর্বত্র বিভিন্ন স্থাপনায় নিজর নাম বসাতে চান। তিনি আমেরিকার প্রয়োজন দেখিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চান। তিনি ভেনেজুয়েলা থেকে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে আনেন। তিনি স্বীকার করেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের জন্য আমেরিকা প্রায় ২৯ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে ইউএসএইডের মাধ্যমে। তিনি নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।

খুব সংক্ষেপে এই হচ্ছে প্রেসিডেন্টের কর্মকান্ড। যে কেউ, যে কেউ বলবে প্রকৃতির নিয়ম হচ্ছে খুব বেশি বাড়লে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতা হারাবে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে নয়, এক বছর ৯ মাসের মধ্যে যে কংগ্রেস ছিল প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বড় সাহস, যা ইচ্ছা তাই করার লাইসেন্স, যে কংগ্রেসে তার কোনো কাজের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস ছিল না তার দলের কারো, সেই কংগ্রেস তিনি এমনভাবে হারালেন, যা অনেক ক্ষেত্রে ফিলিবাস্টার প্রম্নফ, অনেক ক্ষেত্রে ভেটো প্রম্নফ হবে বলে মনে হচ্ছে।

মানুষের লোভের শেষ নেই। ক্ষমতা থাকলে সেই লোভ হয়ত বেড়ে যায় বহুগুণ। কিন্তুসেই প্রবাদটি আবার নতুন করে প্রমাণ হলো, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। ভবিষ্যতে আর কি কি ঘটবে, তাও নিশ্চয় দেখা যাবে। যদিও তারপরও মানুষের শিক্ষা হবে না। সবচেয়ে আশার কথা, ক্ষমতাসীনরা লোভী হলেও, আমেরিকার ভোটাররা ৫,০০০ ডলারের লোভের মরীচিকায় পা দেয়নি।

Related Posts