যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল আল—সাইয়েদ

আল জাজিরা প্রতিবেদনঃ নীল রঙ ধরে রাখলো মিশিগান। তবে গড়লো নতুন ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে মিসরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল আল—সাইয়েদকে কংগ্রেসে পাঠালো মিশিগানবাসী। আবদুল আল—সাইয়েদকে হারাতে ইসরায়েল—লবি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। এ কথা সবাই জানেন যে, আল—সাইয়েদকে নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন মিশিগানের ডেমোক্র্যাটরা। আর তাতেই ‘আশার আলো’ দেখেছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির নেতা—কর্মী—সমর্থকরা। এমনকি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এল—সাইয়েদকে ‘তাচ্ছিল্য’ করতে ছাড়েননি। সবারই উদ্দেশ্য ছিল, এল—সাইয়েদের পরাজয়। 

বিরোধীদের চোখে সাইয়েদের সবচেয়ে বড় দোষ—তিনি ফিলিস্তিনপন্থি। তিনি জাতিগতভাবে মিসরীয়। স্রেফ মিসরীয় হওয়ার কারণে তাকে মুসলিম ব্রাদারহুড বলে দাগিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি শক্তিশালী ইহুদি লবি। কিন্তু, বিরোধীদের সব প্রত্যাশার ‘ভাতে যেন ছাই দিলো’ খোদ মিশিগান।

নিজের ভোট বিজয়কে উদযাপন করলেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। কটাক্ষ করে ধন্যবাদ দিলেন ইসরায়েলি লবি এআইপিএসি বা অ্যাইপেক—কে। বিজয় ভাষণে সাইয়েদ দাবি করলেন এই দাতাগোষ্ঠী তাকে হারাতে ৪২ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল।

গত মাসে নির্বাচনী প্রচারণায় সাইয়েদ বলেছিলেন, ‘তারা আমার নাম, আমার ধর্মবিশ্বাসকে সমস্যা মনে করেন। কিন্তু, গ্যাসের দাম বাড়াতে এগুলোর কোনোটাই দায়ী নয়। নতুন বাড়ি কেনার ক্ষমতাকে সাধ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগুলোর কোনোটাই দায়ী নয়।’

তার এমন বার্তা থেকে কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায় ব্যক্তির লড়াই সম্পর্কে। ৪ নভেম্বর সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, ডেমোক্রেটিক পার্টির আব্দুল সাইয়েদ প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির মাইক রজারসকে পরাজিত করেছেন।

উল্লসিত সমর্থকদের সাইয়েদ এবার বললেন, ‘কেন রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যে আমার নাম ও প্রার্থনার ভঙ্গি নিয়ে তুচ্ছ—তাচ্ছিল্য করেছিলেন, তা বাচ্চাদের বোঝাতে অনেক অভিভাবককে হিমশিম খেতে হয়েছেন। তাদেরকে বলে দিন, ওরা হেরে গেছে।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেটের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল—সাইয়েদ। মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন রাজনীতিক এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন বলছে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ৪২ বছর বয়সী সাইয়েদ অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে জয় পেয়েছেন। এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

তার নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমোক্রেটিকদের মধ্যেও নানা বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও নির্বাচিত হলে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তুলে নেওয়ার বিষয়ে নিজ দলের মধ্যে বিভক্তি ছিল।

আল—সাইয়েদের শৈশব ও শিক্ষাজীবন

মিশিগানের রচেস্টার হিলসে জন্ম আবদুল আল—সাইয়েদের। তার বাবা—মা মিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে আসার আগে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ালেখা ও কাজ করেছেন তিনি। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক হন সাইয়েদ। ২০১১ সালে রোডস স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। ২০১৪ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০১৫ সালে মিশিগানের সবচেয়ে বড় শহর ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন তিনি। শহরটির আর্থিক সংকটের পর জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের দায়িত্ব ছিল তার ওপর।

২০১৭ সাল পর্যন্ত এ পদে ছিলেন সাইয়েদ। এরপর ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্রেটিকদের প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে হেরে যান।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও ভেটেরানবিষয়ক বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কাউন্টির অন্তর্ভুক্ত ডেট্রয়েট শহরও।

Related Posts