৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ নর্থ ডেকোটা লাভ মেডিসিনঃ লুইস আরড্রিখ || আবদুল্লাহ জাহিদ, নিউইয়র্ক

আমেরিকার নর্থ ডেকোটা। দিগন্তজোড়া প্রেইরি ভূমি, বাতাসে দুলতে থাকা ঘাস, দূরে বিস্তৃত আকাশ, আর তার নিচে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট জনপদ। এখানে শীত আসে নির্মম কঠোরতা নিয়ে, গ্রীষ্ম আসে ধুলোমাখা পথ ধরে। এই বিশাল ভূখন্ডে বহু প্রজন্ম ধরে বাস করে আসছে আমেরিকার আদিবাসী ওজিবওয়ে বা চিপেওয়া জনগোষ্ঠী। তাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, প্রকৃতির প্রতি গভীর আস্থা, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস।

এই ভূখন্ডেই মার্কিন ঔপন্যাসিক লুইস আরড্রিখ নির্মাণ করেছেন তাঁর অসাধারণ উপন্যাস লাভ মেডিসিন। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাস কেবল কয়েকটি পরিবারের প্রেম, বিরহ ও সংঘাতের গল্প নয়; এটি আমেরিকার আদিবাসী জীবনের এক বহুস্বরিক আখ্যান। এখানে ভালোবাসা কখনো আশ্রয়, কখনো অভিশাপ; পরিবার কখনো নিরাপত্তার জায়গা, কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের উৎস। আর মৃত্যু? মৃত্যু এখানে জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং স্মৃতির মধ্য দিয়ে নতুন করে ফিরে আসার এক রহস্যময় পথ।

লুইস আরড্রিখের এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর কোনো একক নায়ক বা নায়িকা নেই। কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা পালাক্রমে নিজেদের গল্প বলেন। একজনের কাছে যে ঘটনা প্রেমের, অন্যজনের কাছে সেটিই বিশ্বাসঘাতকতার। একজন যাকে পাপ মনে করেন, অন্যজনের কাছে তা বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা। এইভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষের কণ্ঠ মিলিয়ে তৈরি হয় এক বিশাল পারিবারিক ইতিহাসÑযেখানে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে ভালোবাসা, ঈর্ষা, বিশ্বাস, ধর্ম, দারিদ্র্য এবং পরিচয়ের সংকট পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

কাহিনীর মূল সুর ও পটভূমি

উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি পরিবারÑক্যাশপো এবং ল্যামারটিন। এদের পারিবারিক জীবন, প্রণয়, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুনর্মিলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসে নর্থ ডেকোটার রিজার্ভেশনের কঠোর বাস্তব জীবন। এখানে ইতিহাস কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়; তা বর্তমানের প্রতিটি পদক্ষেপে ছায়ার মতো অনুসরণ করে।

কাহিনীর সূচনা ঘটে শীতের এক বিষণ্ণ রাতে, যখন পরিবারের প্রবীণ নারী রোজ মেরি ক্যাশপো বরফাবৃত হাইওয়ে ধরে নিজের ঘরে ফেরার পথে তুষারঝড়ে হারিয়ে যান। তার এই আকস্মিক ট্র্যাজিক মৃত্যু যেন পুরো উপন্যাসের ওপর এক দীর্ঘ ছায়া ফেলে। তাঁর প্রস্থান পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের মনে এমন কিছু গোপন অনুভূতির জন্ম দেয়, যা পরবর্তী দশকগুলোতে তাদের জীবনকে নানা দিকে চালিত করে।

ভালোবাসার অন্ধ আকুতি ও মায়াবী অন্ধবিশ্বাস

উপন্যাসের নামকরণটি অত্যন্ত প্রতীকী। জীবনের না পাওয়ার বেদনা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং হারানো ভালোবাসাকে ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টায় এই জনপদের মানুষেরা ভরসা রাখে প্রাচীন বিশ্বাস ও লোকজ চিকিৎসায়Ñযাকে বলা হয় ‘লাভ মেডিসিন’।

কাহিনীর অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র লুলু ল্যামারটির এবং প্যাট্রিয়াক ইলিপ ক্যাশপোর মধ্যকার আজীবন জটিল প্রেম এই উপন্যাসের প্রাণকেন্দ্র। ইলিপের স্ত্রী নাকোমি কিংবা পরিবারের অন্য প্রবীণেরা ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখতে এবং হৃদয়ের দূরত্ব ঘোচাতে নানা রকম ভেষজ ও টোটকার আশ্রয় নেন। কিন্তু লুইস আরড্রিখ অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, মানুষের মনকে জাদুমন্ত্র দিয়ে পুরোপুরি জয় করা যায় না; বরং ভালোবাসার আসল নিরাময় লুকিয়ে আছে ক্ষমা, আত্মত্যাগ এবং নাড়ির টানের গভীরে।

আত্মপরিচয় ও প্রজন্মগত সংঘাত

লাভ মেডিসিন—এর চরিত্রগুলো কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত ভাগ্য নিয়ে লড়েন না, তারা আধুনিক মার্কিন সংস্কৃতি এবং নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ওজিবোয়া সংস্কৃতির মধ্যকার এক অদ্ভুত শূন্যতায় বাস করেন।

—তরুণ প্রজন্মের লিপশা মরিসিÑযিনি জুন—এর রক্তবহন করেন, নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে বেড়ান। লিপশার চরিত্রে ফুটে ওঠে উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের আধুনিক বিচ্ছিন্নতাবোধ। তিনি তার দাদি নাকোমি এবং পরিবারের অন্য প্রবীণদের কাছ থেকে শেকড়ের টান অনুভব করেন। লিপশার নিষ্পাপ অথচ গভীর অন্তর্দৃষ্টি পুরো উপন্যাসের ট্র্যাজেডিগুলোকে এক ধরনের মানবিক সান্ত্বনা এনে দেয়।

এখানে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতবিক্ষতÑকেউ মদের নেশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে, কেউ বা হারিয়ে যাওয়া সন্তানের শোকে পাথর হয়ে যায়। কিন্তু এই যন্ত্রণার মাঝেও তাদের বেঁচে থাকার তাগিদ, রসিকতাবোধ এবং একে অপরের প্রতি অন্তরের টান পাঠককে এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্নতায় আচ্ছন্ন করে।

লেখক পরিচিতি:

লুইস আরড্রিখ বর্তমান মার্কিন সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক এবং আদিবাসী কণ্ঠস্বরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম। ১৯৫৪ সালে মিনেসোটার লিটল ফলস—এ জন্ম নেওয়া আরড্রিখের রক্তে মিশে আছে জার্মান—আমেরিকান এবং ওজিবোয়া (চিহপোয়া) সংস্কৃতির ধারা। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নর্থ ডেকোটার ওয়াহপেটন এলাকায়, যেখানে তাঁর পিতা আদিবাসী বোর্ডিং স্কুলে কাজ করতেন। এই পটভূমিই তাঁর রচনায় এক প্রামাণিক ও নাতিশীতোষ্ণ রূপ নিয়ে এসেছে।

ডার্টমুথ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে মাস্টার্স করেন তিনি। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লাভ মেডিসিন’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং এটি মর্যাদাপূর্ণ ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

আরড্রিখের সাহিত্যকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের ইতিহাস, তাদের মৌখিক ঐতিহ্য, এবং আধুনিক সভ্যতার ধাক্কায় তাদের পারিবারিক কাঠামোর রূপান্তরকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাষায় ফুটিয়ে তোলা। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে দ্র বিট কুইন, ট্র্যাকস, দ্য মাস্টার বুচার্স সিংগিং ক্লাব এবং পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাস দ্য নাইট ওয়াচম্যান। তিনি বর্তমানে মিনেসোটার মিনিয়াপলিসে বসবাস করেন এবং সেখানে আদিবাসী সংস্কৃতির সুরক্ষায় একটি স্বাধীন বুকস্টোর পরিচালনা করেন।

Related Posts