গভর্নর্স আইল্যান্ডে ফারহানা ইয়াসমিনের চিত্র প্রদর্শনী || স্মৃতির নদীতে অন্তর্জীবনের প্রতিধ্বনি
ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলাদেশী—আমেরিকান চিত্রশিল্পী ফারহানা ইয়াসমিনের একক চিত্র প্রদর্শনী ‘রিভারিন’ বা ‘প্রকৃতির আত্মা’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ৬ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত গভর্নর্স আইল্যান্ডের ১৬ নোলান পার্কে। ট্রাস্ট ফর গভর্নর্স আইল্যান্ড ২০২৬ সালের রেসিডেন্স কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের কর্মসূচি বিটুইন রিভার এন্ড হারবর: স্টোরিজ দ্যাট ক্যারি আস—এর অংশ হিসেবে এই প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। শিল্পী ফারহানা ইয়াসমিনের জীবনবৃত্তান্তে চুয়াডাঙ্গার শৈশবের সঙ্গে গ্রামীণ প্রকৃতি, জল, মাছ ধরা, ডিঙি নৌকা ও শাপলা তোলার স্মৃতি গভীরভাবে যুক্ত, ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর প্রবাসজীবন। ফারহানা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক এবং ইউওডা—তে স্নাতকোত্তর শিল্পশিক্ষার পাশাপাশি ২০২৬ সালে গভর্নর্স আইল্যান্ডে শিল্পী—আবাসন ও একক প্রদর্শনীর তথ্যও রয়েছে। রিভারিন শীর্ষক শিল্পী—বিবৃতিতে তিনি নদীকে একই সঙ্গে ভূদৃশ্য ও ‘ নোস্তাত্ত্বিক আয়না’ হিসেবে দেখেছেন। অমসৃণ স্তরের ওপর তরল রঙের প্রলেপ দিয়ে পৃষ্ঠকে ‘জীবন্ত ত্বক’—এর মতো করে তোলার কথাও বলেছেন। এই ধারণাটি তাঁর শিল্প বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রÑবুনট এখানে অলংকারমাত্র নয়; তা স্মৃতির মতোই স্তরিত ও ছিদ্রবহুল, কখনো প্রকাশ করে, কখনো আড়াল করে। তাই ফারহানার কাজকে তার নিজস্ব বস্তুগত ভাষাতেই পড়া অধিক তাৎপর্যপূর্ণ: মুখ, মাছ, নকশাদার কাপড়, প্রতিফলক ঝালর, জাল ও ধাতু—সবকিছু মিলে দৃশ্যমান পরিচয় এবং মানুষের অন্তরে বহন করা অদৃশ্য অভিজ্ঞতার সীমারেখাকে অস্থির করে তোলে।
নারীমুখের প্রথম প্রতিকৃতিটিকে পাঠকের শনাক্তকরণের সুবিধার্থে এখানে ‘অন্তর্লীন নদী’ নামে চিহ্নিত করা হলো। নকশায় ঘন পটভূমির কেন্দ্রে বিশাল এক নারীমুখ; চারদিকে লাল মাছ, চিবুকের নিচে সরু নৌকাসদৃশ আকৃতি, নিচে নীল উল্লম্ব রেখার ছন্দ। স্বচ্ছ অলংকারের স্তর মুখের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ত্বক ও পরিবেশের সীমা ক্রমে মুছে যায়। বড় দুটি চোখ বিন্যাসটিকে ধরে রাখলেও মুখটি সহজ কোনো মনোস্তাত্ত্বিক পাঠে ধরা দেয় না। যেন পরিচয় এখানে স্থির নয়; জলস্মৃতি, অলংকার, শরীর ও স্থানের সমবায়ে তা ক্রমাগত গঠিত হচ্ছে।
দ্বিতীয় প্রতিকৃতির সাময়িক নাম ‘স্রোতের মুকুট’। এখানে মাছ আর পরিবেশের অনুষঙ্গমাত্র নয়, বরং চিহ্নের কাছাকাছি। ভ্রম্নর ওপর সারিবদ্ধ ক্ষুদ্র কালো মাছ, মাথার দুই পাশে অলংকৃত গাঢ় আকৃতির ভেতরে বৃহত্তর মাছ, আর মাথার ওপর উঠে যাওয়া উজ্জ্বল গোলাপি—লাল শাখাবিন্যাসÑসব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অস্থির মুকুট। সোনালি—ধূসর নকশার মধ্যে নারীর দৃষ্টি সরাসরি, কিন্তু সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নয়। অলংকার যেন এখানে দৃশ্যমান চিন্তার রূপ—স্মৃতি, ভঙ্গুরতা ও নিজেকে নির্মাণ করার নানা স্তরের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু কোনো একমাত্রিক অর্থে স্থির হয় না।
‘প্রতিফলনে আচ্ছাদিত’ নামে চিহ্নিত তৃতীয় ছবিটি প্রচলিত চিত্রকর্মের চেয়ে একটি পরিবেশনার আলোকচিত্রিক দলিল হিসেবে পড়া অধিক যুক্তিযুক্ত। শিল্পীর নিজস্ব পোর্টফোলিওতে গভর্নর্স আইল্যান্ডের কাজগুলোর মধ্যে তাঁর পরিবেশনাশিল্প স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ রয়েছে। কালো পোশাকের আসীন মানব—অবয়বটির মুখ ও শরীরের অধিকাংশই ঝরে পড়া রুপালি প্রতিফলক উপাদানে ঢাকা। এখানেই কাজটির গভীর বৈপরীত্য: যে বস্তু দেহটিকে তীব্র আলোয় দৃশ্যমান করে, সেই বস্তুই তার ব্যক্তিগত মুখচ্ছবি মুছে দেয়। আলো একই সঙ্গে উন্মোচন ও আড়াল। শুধু হাত দুটি উন্মুক্ত থাকায় দর্শক সুরক্ষা ও বন্দিত্ব, বহিরঙ্গের দীপ্তি ও ব্যক্তিগত সত্তার নিভৃততার মাঝখানে স্থির হয়ে থাকে।
শেষ কাজটির সাময়িক নাম ‘ভঙ্গুরতার বর্ম’। এখানে প্রতিকৃত মুখ থেকে শিল্পী এগিয়ে যান নির্মিত দেহবস্তুর দিকে। নকশাদার কাপড়, লাল ও সবুজ জাল, ধাতব গোলক এবং বাইরে বেরিয়ে থাকা কালো পেরেক বা স্ক্রু মিলে তৈরি করেছে প্রোফাইলসদৃশ এক কাঠামোÑযার সৌন্দর্যের সঙ্গে বিপদের অনুভূতি অবিচ্ছেদ্য। কোমল বস্ত্রের মুখোমুখি কঠিন ধাতু; অলংকার যেন আত্মরক্ষার স্থাপত্যে পরিণত হয়েছে।
চারটি কাজ পাশাপাশি রাখলে একটি লক্ষণীয় অগ্রগতি স্পষ্ট হয়Ñআঁকা মুখ থেকে প্রতীকমণ্ডিত মুখ, সেখান থেকে আচ্ছাদিত দেহ, এবং শেষে নির্মিত দেহবস্তু। ফারহানা ধীরে ধীরে প্রতিকৃতিকে বাহ্যিক সাদৃশ্য থেকে সরিয়ে বস্তুগত উপস্থিতির দিকে নিয়ে যান। মুখ হয়ে ওঠে স্মৃতি জমে থাকার স্থান; শরীর হয়ে ওঠে এমন এক পৃষ্ঠ, যাকে অলংকৃত করা যায়, ঢেকে রাখা যায়, আঘাত করা যায়, রক্ষা করা যায়Ñআবার নতুন করে নির্মাণও করা যায়।
শেষ পর্যন্ত আমরা এখানে কেবল ‘প্রকৃতি’ বা স্থিতিস্থাপকতার কোনো সরল ঘোষণা দেখি না। বরং আরও জটিল একটি সত্যের মুখোমুখি হই: পরিচয়ের একটি দৃশ্যমান পৃষ্ঠ আছে, কিন্তু কোনো পৃষ্ঠই মানুষের সম্পূর্ণ সত্য বলে না।
ফারহানা ইয়াসমিনের শিল্পে তাই স্মৃতিরও একটি ত্বক আছে—আর সেই ত্বক প্রতিনিয়ত বদলে যায়।
