পরাশক্তির টানাপোড়েনে বাংলাদেশের স্বার্থ || এম এ আজিজ
বিশ্বব্যবস্থা এখন একক পরাশক্তির প্রভাব থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার দিকে এগোচ্ছে। সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, বাণিজ্য, সমুদ্রপথ ও কূটনৈতিক প্রভাব—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ ও স্নায়ুযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর শক্তিধর দেশের চাপ শেষ হয়নি। বরং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা নতুন ধরনের আধিপত্যের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও কূটনৈতিক সতর্কতা বাংলাদেশের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।
বর্তমান প্রতিযোগিতার কেন্দ্রীয় অক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বাণিজ্য, জ্বালানি, সামরিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিস্তৃত। ওয়াশিংটন চীনের প্রভাব সীমিত রাখতে মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে; বেইজিংও বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান বাড়াচ্ছে। তবে উভয় পক্ষের প্রতিযোগিতা সহযোগিতা ও সংঘাত দুই সম্ভাবনাই বহন করে। তাই সংঘাতের পাশাপাশি সমঝোতার পথও বাংলাদেশের জন্য খোলা রাখা জরুরি।
এ প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ইন্দো—প্যাসিফিক, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে বিস্তৃত অঞ্চল। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, উৎপাদনকেন্দ্র, জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বড় অংশ এখানে অবস্থিত। চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অবস্থান অঞ্চলটিকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। ফলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বন্দর, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে। পাশাপাশি বিদেশি চাপও ক্রমাগত বাড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো—প্যাসিফিক কৌশলের ঘোষিত লক্ষ্য অবাধ, উন্মুক্ত, নিরাপদ ও স্থিতিশীল অঞ্চল গঠন। বাস্তবে এর একটি প্রধান বিবেচনা চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা। ২০২১ সালের কৌশলপত্রে মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা, সমুদ্র নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশাসন বদলালেও অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব অটুট। তবে নীতির অগ্রাধিকার ও প্রয়োগে পরিবর্তন ঘটতে পারে। বাংলাদেশকেও তাই এ নীতির প্রভাব সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হয় ক্রমাগত।
জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কোয়াড কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়; এটি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো নিয়ে কৌশলগত সমন্বয়ের মঞ্চ। চীন একে নিজের প্রভাব ঘিরে রাখার উদ্যোগ হিসেবে দেখে। বিপরীতে বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ২০১৩ সাল থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে বন্দর, সড়ক, রেল ও জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি এতে ঋণ ও নির্ভরতার প্রশ্নও রয়েছে। ছোট রাষ্ট্রের স্বাধীনতা জরুরি।
এ বৃহৎ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব তার অবস্থানেই নিহিত। বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে। চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ী বন্দর, উপকূলীয় সমুদ্রসীমা এবং ভারতীয় উত্তর—পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। সমুদ্রসম্পদ, নৌপথ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি আগ্রহ ও চাপের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। ভারসাম্য রক্ষায় তাই দূরদর্শী ও বাস্তববাদী রাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এখানে।
বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু ভূগোলনির্ভর নয়। বৃহৎ জনবাজার, তৈরি পোশাক শিল্প, শ্রমশক্তি, কৃষি, জ্বালানি চাহিদা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার; চীন প্রধান আমদানি ও অবকাঠামো অংশীদার; ভারত প্রতিবেশী যোগাযোগ ও জ্বালানিতে অপরিহার্য; জাপান উন্নয়ন অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ। এ বহুমুখী সম্পর্কই সুযোগ আবার এক দেশের ওপর অতিনির্ভরতা হলে ঝুঁকিও। বাজার, বিনিয়োগ ও প্রবাসী আয়ও এ বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র—বাংলাদেশ সম্পর্কে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারির পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চুক্তিতে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর মার্কিন পারস্পরিক শুল্ক ১৯ শতাংশ নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শূন্য শুল্কের সুযোগের কথা রয়েছে। পোশাকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র উপকরণ ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত শর্তসাপেক্ষ সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশকে মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের বাজার সুবিধা, শ্রম অধিকার, ডিজিটাল বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারে অঙ্গীকার করতে হয়েছে। এটাই বড় পরীক্ষা।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও ২০২৬ সালে বিস্তৃত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করেন। দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, কৃষি ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়। সফরকালে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
চীন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামেরও প্রধান উৎস। ২০২৬ সালের আগস্টে চীনা জে—১০সিই যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তুতির খবর প্রকাশিত হয়। তবে সংখ্যা, ব্যয় ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও নিশ্চিত ছিল না। সামরিক আধুনিকায়ন প্রয়োজন হলেও একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রাংশে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রতিরক্ষা ক্রয়ে মূল্য, সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কৌশলগত স্বাধীনতা যাচাই জরুরি। সতর্কতাও জরুরি।
জাপানের সঙ্গে সম্পর্কেও কৌশলগত মাত্রা বাড়ছে। ২৭ অক্টোবর ২০২৬ টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বঙ্গোপসাগরীয় যোগাযোগ, সরবরাহ শৃঙ্খল, বিনিয়োগ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা আলোচিত হয়। দুই দেশ বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট উদ্যোগকে ‘বিআইজি—বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে নতুন কৌশলগত কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার কথা জানায়। এতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলাও গুরুত্ব পেয়েছে। জাপানের এই অংশীদারত্ব বিকল্প উন্নয়ন সুযোগও বাড়াতে পারে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও পারস্পরিক নির্ভরশীল। সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও নদীর পানি সব ক্ষেত্রেই দুদেশের স্বার্থ জড়িত। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানসহ কয়েকটি বিষয়ে মতপার্থক্য সম্পর্ককে জটিল করেছে। নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চললেও সফরের সময় ও পরিবেশ অনিশ্চিত। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে পারস্পরিক মর্যাদা, বাস্তব সমস্যা সমাধান প্রয়োজন।
সবচেয়ে জরুরি দ্বিপক্ষীয় প্রশ্ন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর ২০২৬ শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা এবং বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বিধান চায়। ২ নভেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী আলোচনার জন্য কমিটি গঠন করেছেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর প্রবাহের পরিবর্তনও নতুন সমঝোতায় বিবেচ্য। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি।
মিয়ানমারের রাখাইন সংঘাত ও রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনীতিকে জটিল করছে। বাংলাদেশে আশ্রিত দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত। রাখাইনে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর পরিস্থিতি আরও কঠিন করেছে। চীন মধ্যস্থতার আগ্রহ দেখালেও প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধান অপরিহার্য। জাতিসংঘ, আসিয়ান, জাপান এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন। এতে খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির প্রশ্নও জড়িত।
বাংলাদেশের করণীয় হলো কোনো শক্তির বলয়ে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ। বিদেশি ঋণ, বন্দর, প্রতিরক্ষা চুক্তি ও বড় বিনিয়োগে স্বচ্ছতা, সংসদীয় নজরদারি এবং ব্যয়—সুফল মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান বিদেশি চাপ কমানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক লাভ, সার্বভৌমত্ব ও সমমর্যাদা। এটি অত্যন্ত অপরিহার্য।
পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অনিবার্য বাস্তবতা। তবে এর পরিণতি পূর্বনির্ধারিত নয়। ভৌগোলিক অবস্থানকে সম্পদে রূপান্তর করতে হলে দক্ষ কূটনীতি, শক্তিশালী অর্থনীতি, বৈচিত্র্যময় রপ্তানি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি গড়ে তুলতে হবে। কোনো দেশের নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপকরণ না হয়ে বাংলাদেশকে নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ভিত্তি হবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
