একাত্তরের প্রবাসী যোদ্ধা সুলতানা আলমের ৪ ছেলে ফুটবলে আলো ছড়াচ্ছেন

শামীম আল আমিনঃ বাঙালির গল্পে যেমন থাকে মুখরোচক খাবার, তেমনই থাকে আবেগ। আর সেই আবেগই কখনো কখনো ইতিহাস হয়ে যায়.. বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব২০ ফুটবল দল সম্প্রতি সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে আমাদেরকে গর্বিত করেছে। আর এই সাফল্যে যে দুটি নাম সবচেয়ে বেশি আলো ছড়িয়েছে তাহলোঃ রোনান সুলিভান এবং ডেক্লান সুলিভান। তারা শুধু প্রতিভাবান ফুটবলারই নন, তারা এক ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করছেন।

তাদের নানি সুলতানা আলম একজন সাহসী নারী, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানি অস্ত্রভর্তি জাহাজ অবরোধ আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে গড়ে তুলেছিলেন আন্তর্জাতিক জনমত। সেই ঐতিহাসিক প্রতিবাদইষড়পশধফবনামে পরিচিত। এই ঘটনা নিয়ে রিচার্ড কে টেলর একটি বই লিখেছেন, নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র একই নামে। আজ তার নাতিরা সেই লালসবুজের জার্সি পরে মাঠে লড়ছে যেন ইতিহাসেরই অসাধারণ এক পরম্পরা!

কয়েক বছর আগে আমেরিকান কৃতি ফুটবলার এবং সুলিভান ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কুইন গিয়েছিলেন ফিলাডেলফিয়ার একটি বাংলাদেশী রেস্তোরাঁলবঙ্গ কাবাব অ্যান্ড ক্যাফেতে। নান আর গরুখাসির মাংসের স্বাদ নিতে নিতে গল্প জমে ওঠে রেস্তোরাঁর মালিকের সঙ্গে। মালিক বললেন তার বাড়ি ঢাকায়। কুইন হেসে উত্তর দিলেন— ‘আমার নানির বাড়িও তো ঢাকায়!’ যদিও তিনি কখনো ঢাকায় যাননি।

এই ছোট্ট কথোপকথনেই যেন খুলে গেল এক নতুন অধ্যায়..

কুইনএর ক্লাব ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন সেই গল্পের ভিডিও নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করে। ভিডিওটি নজরে আসেসেভ দ্য ফুটবলনামে একটি সংগঠনের, যারা বিদেশে জন্ম নেয়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেশের সংযোগ সৃষ্টির চমৎকার একটি কাজ করে চলেছে। তারা যোগাযোগ করে সুলতানা আলমের সঙ্গে। শুরু হয় সেই স্বপ্নযাত্রা..

অবশেষে সেই পথ ধরে বাংলাদেশে যান রোনান সুলিভান ডেক্লান সুলিভান। সেখান থেকে মালদ্বীপের মালে, সাফ শিরোপার মঞ্চে।

দুই ভাই এলেন, দেখলেন, জয় করলেন।

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব২০ দলের সাফ জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন তারাÑরোনানের অবিস্মরণীয় পানেনকা, ডেক্লানের দৃঢ় পারফরম্যান্স, সব মিলিয়ে যেন এক রূপকথা! তাদের ভাই কুইন সুলিভান খেলা দেখছিলেন ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের ড্রেসিং রুম থেকে। সেখানে তার পোস্ট করা ভিডিওতে চিৎকার করে বলেন, ‘চিপ ইটঅর্থাৎ বল চিপ করো, ফাইনালের টাইব্রেকারে রোনান করলেনও তাই। বাংলাদেশের একটি দলের জয়ের উল্লাস তখন দেখা গেছে আমেরিকান ফুটবলের সর্বোচ্চ লিগের একটি দলের ড্রেসিং রুমেও।

বিদেশে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ এটাই প্রথম নয়। যুক্তরাজ্যের লেস্টার সিটির হামজা চৌধুরীর যাদু রীতিমতো এক জাগরণ তৈরি করেছে বাংলাদেশের ফুটবলে। তবে এই পথ মূলত: দেখিয়েছিলেন ডেনমার্ক থেকে আসা জামাল ভূঁইয়া।

তবে সুলিভান ভাইদের এই কৃতিত্ব আমার হৃদয়ে বাড়তি আদর পেয়েছে কেননা আমিও আমেরিকায় বসবাসকারী এক বাংলাদেশী। আর তাদের নানি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আর সেই সঙ্গে এই পরিবারটি সত্যিকারের ফুটবল পরিবার।

সুলতানা আলমের মেয়ে হেইকে তার স্বামী ব্রেন্ডান সুলিভান দুজনই ছিলেন ফুটবলার। তাদের চার ছেলের সবাই ফুটবলে আলো ছড়াচ্ছে। বড়ছেলে কুইন সুলিভান ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন এর তারকা, আমেরিকার জাতীয় দলের সঙ্গেও যুক্ত। এবারের বিশ্বকাপেও দেশের হয়ে দেখা যেতে পারে তাকে। অন্যদিকে বয়সভিত্তিক দলে খেলা কাভান সুলিভান আমেরিকার অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ প্রতিভা, যাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। যমজ ছোট দুই জনের কথা তো এখন আপনাদের জানাই।

একটি পরিবারÑযাদের শিকড় ঢাকাতেও রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা রয়েছে, আর যাদেরবর্তমানদেশের ফুটবলে আবেগময় অনন্য অবদান।

হয়তো সেদিন ফিলাডেলফিয়ার সেই খাবার টেবিলে বসে শুরু হয়েছিল গল্পটা। আজ তা গর্জন তুলেছে স্টেডিয়ামে, লালসবুজের পতাকার নিচে। 

টুপি খোলা অভিবাদন সুলিভান পরিবারকে।

Related Posts