যা দেখেছি যা বুঝেছি—৬ || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত

ডড়ৎফং পধৎৎু সড়ৎব বিরমযঃ ঃযধহ ঃযব ংঢ়রৎরঃ নবযরহফ ঃযব ড়িৎফং.

শব্দটা শুনলেই মানুষ ভয়ে অঁাতকে ওঠেÑঅভিশাপ, অভিশাপ! গল্প ইতিহাস লোকগাথা ধর্মকথায় অভিশাপের কত যে রোমাঞ্চকর কাহিনী শোনা যায়। যারা বিশ্বাস করে না, তারাও থেকে দশহাত দূরে থাকতে চায়। রাগে হিংসায় উন্মত্ত হলে অনেকে বলে, ‘গজব পড়েছে, আল্লাহর গজব!’ কেউ আবার একটু সহনীয় করে বলে, ‘কুফা কুফা লেগেছে, কুফায় ধরেছে বা পেয়েছে। কেউ ভাষান্তর করে: বদদোয়া লেগেছে। অনেকে বলে, কারো (কু)নজর লেগেছ, কেউ চোখ দিয়েছে। অভিশাপ বলে যদি কিছু না থাকে, তবু কেন আকস্মিক অস্বাভাবিক অপ্রত্যাশিত বিপদে মানুষ এরূপ ভাবে? অভিশাপের অপর পিঠ হল আশীর্বাদ, যার জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে থাকেÑমাথা নুইয়ে ধরে, হাত বাড়িয়ে দেয়। আশীর্বাদ থাক, অভিশাপ নিয়েই কিছু কথা পাড়ি।

টরন্টো থেকে ঢাকায় এনে ছেলের প্রতি শেষকর্তব্য পালন করার পর আমার ব্যস্ততা শেষ হয়, অস্থিরতা বাড়ে। আম্মাকে বলি, ‘মাগো, কোথায় কী ভুল করলাম আমি? কেন এমন হলো?’ প্রতিবার ঘুরেফিরে জননী বলেন, ‘কার যে কী অভিশাপ পড়ল বাবা, তোমার উপর!’ বাকি কথা বুঝিয়ে বলতে চান না কষ্ট পাব বলে। কিন্তু বুঝতে পারি, আম্মা বলতে চাচ্ছেন, কোনো কারণে আমার উপর কারো অভিশাপ পড়েছে বলেই অনিন্দ্য চলে গেল, আমার জীবনে দুঃখশোকের অমানিশা ধেয়ে এল। ধারণা আপন কারো কাছ থেকেই পেয়েছেন তিনি। ঘোরতর বিপদে স্বজনরা মনে করে আপনি দুর্বল অথবা আপনার উপর অভিশাপ পড়েছে। আপনিও তা ভাবেন অজান্তে। সামাজিকতার কারণে আর কেউ প্রকাশ্যে বলেনি আমাকে অভিশাপ তত্ত্বের কথা। নিজেদের লোকই তাদের আবিষ্কৃত পরীক্ষিত তত্ত্বেরহাতেনাতে প্রমাণিত ফলহিসাবে এটাকে অভিশাপ হিসাবে দেখাতে চায়। বুদ্ধিমান বলে তারা নিজেদের মুখে বলে না কিন্তু সহজসরল মা আমার ব্যাকুলতা দেখে বলে ফেলেন, ‘কার যে অভিশাপ——’ 

আরেকটা উদাহরণ। আমি তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক। অবসরপ্রাপ্ত এক রাষ্ট্রদূতকে অফিসের গোপনীয় লেখালেখি দিতে রাজি না হওয়ায় আমাকে বললেন, ‘আমি অভিশাপ দিচ্ছি, তুমি কোনোদিন অ্যাম্বাসেডর হতে পারবে না।এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্ভব সবোর্চ্চ পর্যায়ে চেষ্টা করেছেন। পরিণত বয়সেও আমার কেন জানি ভয় হয়েছিল সত্যি বুঝি আমি আর রাষ্ট্রদূত হতে পারব না, অভিশাপ কাজে লেগে যাবে।

পত্রিকা খুললেই দেখা যায় এজগতে প্রতিদিন প্রতিদেশে কত মাতাপিতা সন্তান হারাচ্ছেন অকালে। পাঠকের কাছে তা সেদিনের খবর, পরদিন নতুন খবর খোঁজে। যারা স্বজন, জীবনভর তারা কাঁদে। এই তত্ত্বমূলে সবাই কোনো না কোনোভাবে অভিশাপের শিকারÑকোনো অন্যায় বা দুষ্কর্মের প্রায়শ্চিত্তের ভোগদার। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এইঅভিশপ্তমাবাবাদের পক্ষে আজ আমি কিছু কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করেছি।

রাশিয়ার বেসলানে ১৮৬ জন স্কুলছাত্র এবং নরওয়ের উতয়া দ্বীপে ৬৮ জন যুবকযুবতী বিনাদোষে প্রাণ হারিয়েছেন বন্দুকের গুলিতে। কানেক্টিকাটের স্যান্ডিহুকে বিশজন শিশু প্রাণ হারায় গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রুজশিপে প্রায় তিনশকিশোর দেহত্যাগ করে সাগর গভীরে শীতল জলে। গাজায় প্রাণ হারালো কত শিশু? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন পিয়ার্স চারপুত্রকেই হারান। রবীন্দ্রনাথ হারিয়েছেন চার ছেলেমেয়েকে। লতিফুর রহমান মেয়ে শাজনীনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন গভীর মমতায়। কত সুসন্তান চলে যায় পিতামাতার সামনেÑআত্মহনন, দুর্ঘটনা, ব্যাধি ইত্যাদি নামে। ভূমিকম্পসহ বেশি আর দিতে হবে না মর্মান্তিক ঘটনার উদাহরণ। ইতিহাসে উদাহরণ সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিদিনÑঅনাকাঙ্খিত কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। শুধু ভাবুন ওইসব পিতামাতা কী পাপ করেছিলেন যে অভিশাপ পড়ল

পৃথিবীতে কোটি কোটি প্রাণকণা, মানবভ্রƒ, মানবশিশু অকালে ঝরে যাচ্ছে তাদের জনকজননীকে শোকাচ্ছন্ন করে। সব না হলেও অনেকক্ষেত্রেই কেউ না কেউ বলে, ‘অভিশাপ। অভিশাপের কারণেই হয়েছে।অর্থাৎ মাবাবা অভিশপ্ত। এইসব মাবাবাকে অভিশপ্ত বললে আমার বড় কষ্ট হয়। তবু কিছু লোক বলেÑকেউ ক্যাজুয়ালি, কেউ সিরিয়াসলি। অনেকে সাহিত্য করে বলে, ‘অপঘাতে অপমৃত্যু সকল মৃত্যুই কারো না কারো কাছে মর্মান্তিক।মৃত্যুশব্দের আগেঅপযোগ করে মৃতব্যক্তি এবং তার শোকসন্তপ্ত স্বজনকে লাঞ্ছিত কেন করি!

পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা মর্মান্তিক চেহারা বিধবার নয়, এতিমের নয়Ñমৃতসন্তানকোলে পিতার বা মাতার। ঈশ্বর যদি হাতেনাতে মানুষের প্রার্থনা মঞ্জুর করতেন, আমি প্রতিদিন প্রতিক্ষণে প্রার্থনায় বলতাম, ‘মানুষকে সন্তানশোক দিয়ো না, প্রভু। আজও কেন মৃতসন্তান দেখি পিতার কোলে? আর না, প্লীজ আর না!’ কিন্তু থামছে না, থামবেও নাÑতার প্রতিষেধকও নেই। সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের শোকানুভূতিও সবোর্চ্চ, যা সন্তানবিয়োগে অনুভূত হয়। যুগে যুগে সবদেশে অসময়ে আকসি¥কভাবে প্রাণ হারিয়ে মাবাবাকে দিশাহারা করে দিচ্ছে কতসহস্র পুত্রকন্যা। অভিশাপ তত্ত্বানুসারে তাহলে কি সকল মাবাবাই ছিলেন অভিশপ্ত? এই অভিশাপ জিনিসটা তাহলে কী?

ওয়েবস্টার ডিকশনারি বলেছে: পঁৎংব, ধহ রহাড়পধঃরড়হ ড়ৎ ঢ়ৎধুবৎ ভড়ৎ ফরারহব ঢ়ঁহরংযসবহঃ ড়ৎ যধৎস ঃড় পড়সব ঁঢ়ড়হ ংড়সবড়হব... ংড়ষবসহ ঁঃঃবৎবহপব রহঃবহফবফ ঃড় রহাড়শব ংঁঢ়বৎহধঃঁৎধষ ঢ়ড়বিৎ ঃড় রহভষরপঃ যধৎস। ক্ষতি বা আঘাত প্রদান/বর্ষণের জন্য ইচ্ছার সশব্দ প্রকাশ, অর্থাৎ অমঙ্গল অশুভ কামনা। অভিশাপের উদ্দেশ্য বহুবিধ, যেমন: পরশ্রীকাতরতা, ব্যক্তিগত রেষারেষি, সামাজিক আইন বলবৎ, ধর্মীয় অনুশাসন চালুকরণ, গোষ্ঠীর স্থায়িত্ব, শত্রু বিতারণ, নৈতিক শিক্ষা, পবিত্র স্থান বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ। তবে আসল মতলব বশীকরণ, ক্ষতিসাধন, সুখহরণ বিনাশসাধন।

অভিশাপ এবং জাদুমন্ত্র এক জিনিস নয়। প্রথমটি ব্যক্তির জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে, দ্বিতীয়টি নিছক ক্ষণিকের ফান, হাতচোখের ভোজবাজি। অভিশাপ কুসংস্কার এক নয়। ব্যক্তি নিজেই কুসংস্কার ধারণ করে, অভিশাপ অন্যের দ্বারা পতিত হয়।অভিশাপবলতে কখনো আবার নিছক রাগ ঘৃণা হিংসা ক্ষোভ বিরক্তি অধৈর্য ব্যর্থতা নিন্দা তিরস্কার ভয় গালি অপমান বিদ্রোহ ইত্যাদিকেও বুঝায়। যেমন বিরক্তি অর্থে, ‘তুই মর, মরিস না ক্যান?’ ক্ষোভ বুঝাতে, ‘গাড়িচালকগণ অভিসম্পাত দিচ্ছে ধিক্কার দিতে কবি লিখেছেন, ‘আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি...অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু/ সেই সব পশুদের...নরম করে কেউ বলে: অভাগা, অলক্ষুণে, অপয়া।

Related Posts