খদ্দের || ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক

সেদিন সন্ধ্যায় চাটা একটু বেশি গরম হয়ে গিয়েছিল। প্রত্যয় কাপ হাতে নিয়ে ফুঁ দিতে দিতে বসেছিল জানালার ধারে, অনেকটা উদাসভাবে। জানালার ফাঁক দিয়ে রাস্তায় মানুষের যাতায়াত দেখা যায়, কিন্তু সেদিন মানুষগুলোকে কেমন অচেনা লাগছিল। সবাই যেন তাড়াহুড়ো করে হাঁটছে, অথচ কোথাও পৌঁছোতে পারছে না। রান্নাঘর থেকে মা বললেন,

চা খাসনি কেন? ঠান্ডা হয়ে যাবে।

খাচ্ছি তো, মা।

ছোট বোন মিঠি বই হাতে এসে পাশে বসল। ইতিহাস বই। সে গম্ভীর মুখে বলল,

দাদা, তোমরা কি কাল সত্যি সত্যি স্লোগান দেবে?

প্রত্যয় হেসে ফেলল।

স্লোগান দিলে কী হবে?

মিঠি ফিসফিস করে বলল,

পুলিশ ধরবে।

মা রান্নাঘর থেকে আরেকবার তাকালেন। সেই তাকানোয় বকা ছিল না, নিষেধও ছিল না, শুধু একটা থমথমে আশঙ্কা। প্রত্যয় সেই চোখ চেনে। সেই চোখে তার জন্য ভাত বাড়া আছে, জ্বরের সময় কপালে জলপট্টি দেয়া আছে, আবার সেই চোখেই আছে এমন এক ভয় যাকে বাংলা ভাষার কোনো শব্দে বর্ণনা করা যায় না। বোধ করি সে কারণেই তিনি মা, আর আমরা সন্তান। প্রত্যয় ভাবছিল।

সারা বিকেল কলেজে হৈচৈ হয়েছে। বন্ধু আসাদ এসে বলেছিল, কাল আমতলায় জড়ো হবে সবাই। ১৪৪ ধারা জারি করলেই বা কী হবে? ভাষার প্রশ্নে পিছিয়ে গেলে আর মুখ দেখাবি কি করে? প্রত্যয় তখন চুপ করেছিল। বাইরে চুপ থাকা সহজ। ঘরে এসে চুপ থাকাটা কঠিন।

চায়ের কাপের ধোঁয়া উঠছিল। মা এসে বসে বললেন,

আজ বাসায় ফিরতে এত দেরি হলো কেন রে?

কলেজে মিটিং ছিল।

মিটিং করে তোর পেট ভরবে?

প্রত্যয় জানে, প্রশ্ন মায়ের নয়, সংসারের। তার বাবা মারা গেছেন তিন বছর হলো। সেই থেকে এই বাড়িতে হিসেব করে চাল, ডাল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনা হয়, হিসেব করে কথাও বলা হয়। প্রত্যয় টিউশনি করে। কলেজে পড়ে। মা পাড়ার দুএকটা মেয়েকে পড়ান। সংসার চলে, আবার চলেও না।

মা হঠাৎ বললেন,

শোন, বড় বড় কথা যারা বলে, বিপদ হলে তারা সবার আগে পালায়। তুই কারও নায়ক হতে যাস না।

মিঠি প্রতিবাদ করল,

আমার দাদা নায়ক না হলে কে হবে, মা?

প্রত্যয় মিঠির মাথায় টোকা দিল।

নায়করা সাধারণত খায় না, ঘুমায় না, আর পরীক্ষায় ফেল করে। আমি ওই দলে না।

মিঠি হেসে উঠল। মা হাসলেন না। তিনি শুধু বললেন,

কাল সকালবেলা বের হবি?

প্রত্যয় উত্তর দিল না। জানালার বাইরে তখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল। সেই সুরে কেমন অদ্ভুত এক টান। তার মনে হলো, ভাষা বলতে আসলে কী বোঝায়? কেবল দাবিপত্রে লেখা শব্দ? না কি মায়ের মুখে শোনাখেয়ে যা’, বোনের মুখেদাদা’, পাড়ার চায়ের দোকানে লোকজনের হেসে উঠতে উঠতে বলাকী খবর’? যে ভাষায় কেউ শাসন করে, সে ভাষা হয়তো টিকে থাকে বা থাকে না, কিন্তু যে ভাষায় মানুষ মাকে ডাকে, হাসে, কাঁদে, সে ভাষা মানুষকে টিকিয়ে রাখে।

রাতে আসাদ এল। দরজায় টোকা দিয়ে ঢুকে বলল,

খালা, কেমন আছেন?

মা বললেন,

ভালো আছি। তোরা কী আবার মিটিংসিটিং করবি?

আসাদ মাথা নাড়ল।

খালা, সময়টা বড় খারাপ।

মা শুকনো গলায় বললেন,

সময় খারাপ হলে তোদের মত ছাত্রদেরই কেন সবসময় ভালো হতে হবে, প্রতিবাদী হতে হবে, বল তো?

আসাদ চুপ করে গেল। প্রত্যয় বুঝল, মায়ের এইসব কথার জবাব নেই। যারা রাষ্ট্র চালায়, তাদের ভাষা শক্ত। যারা ঘর চালায়, তাদের ভাষা নরম। কিন্তু নরম জিনিসও যে কতটা কঠিন হতে পারে তা মায়ের প্রশ্নই বলে দেয়।

সেই রাতে প্রত্যয় ঘুমোতে পারল না। মিঠি পাশের ঘরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বিড়বিড় করছিল। মা মাঝে মাঝে কাশছিলেন। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। রাত যেন একটু একটু করে বড় হচ্ছিল।

ভোরে বেরোনোর সময় মা বললেন,

দুপুরের মধ্যে ফিরিস।

প্রত্যয় জুতো পরতে পরতে বলল,

চেষ্টা করব মা।

চেষ্টা না, ফিরিস, মা কিছুটা ধমকের সুরে বললেন।

প্রত্যয় তাকিয়ে দেখল, মায়ের চুল যেন বাবার মৃত্যুর পর গত তিন বছরে অনেকটাই সাদা হয়ে গেছে। কবে হয়েছে? সে তেমনটা খেয়ালই করেনি। আজ তাই ভেতরটা কেমন যেন একটু মোচড় খেল।

ঢাকা শহর সেদিন সকাল থেকেই অস্বাভাবিক। বাতাসে অস্বস্তি। পুলিশি কড়াকড়ি। মানুষ নিচু গলায় কথা বলছে, কিন্তু চোখে আগুন। আমতলার দিকে যেতে যেতে প্রত্যয়ের মনে হচ্ছিল সে যেন কোনো মিছিলের দিকে নয়, নিজের ভেতরের কোনো কঠিন দরজার দিকে হাঁটছে।

বন্ধুরা জড়ো হয়েছে। কেউ স্লোগান লিখছে, কেউ খবর আনছে, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে আছে। আসাদ বলল,

ভয় পাচ্ছিস?

প্রত্যয় বলল,

কিছুটা তো পাচ্ছি!

আসাদ অবাক।

এত সোজাসুজি কেউ কি এভাবে বলে?

মিথ্যে বলার সময় নাই, প্রত্যয়ের সহজ এবং সরাসরি উত্তর।

একটু পরেই উত্তেজনা বাড়ল। সিদ্ধান্ত হলো, ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। প্রত্যয়ের বুক ধকধক করছিল। সে জানত না মানুষ ভয়ের মধ্যেও এত পরিষ্কারভাবে হাঁটতে পারে। মনে হচ্ছিল, তার পা দুটো যেন সে নিজে না, আর কেউ চালাচ্ছে।

তারপর সবকিছু খুব দ্রুত ঘটল। স্লোগান, দৌড়, চিৎকার, পুলিশের বাঁশি, ভাঙা ভাঙা নির্দেশ, আর তারই মধ্যে এক মুহূর্তে গুলির শব্দ। শব্দটা কানে নয়, যেন বুকের ভেতরে বাজলো। কেউ পড়ে গেল। কেউ চিৎকার করল। কেউ বলল, পালাও! কেউ বলল, মোটেই পিছাস না!

প্রত্যয় দৌড়াতে লাগল। তার পাশে আসাদ ছিল, হঠাৎ সে নেই। সে বুঝতে পারছিল না কোন গলি, কোন রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছে। যেন জীবন বাজি রেখে দৌড়ানো। মানুষের ভিড় ছত্রভঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ বকশীবাজারের দিকে, কেউ আরো ভেতরের গলিতে। পেছনে পুলিশের চিৎকার। সামনে রাস্তার ধুলো যেন বাতাসে মিশে পথটাকে অনেকটা আবছা করে দিচ্ছে, ফাগুন মাসের ধুলো বলে কথা। একবার তার মনে হল যেন সেন্ট্রাল জেলের পাশ দিয়ে দৌড়াচ্ছে। প্রত্যয়ের মাথার ভেতরে শুধু একটাই ভাবনাবাড়ি ফিরতে হবে। মা কাছে ফিরতে হবে, বোনের কাছে ফিরতে হবে, কিন্তু কোন পথে?

একসময় তিনচারজন ছাত্র মিলে একটা সরু গলিতে ঢুকে পড়ল। সামনে একটা ভাঙাচোরা দরজা। কেউ বলল, ভিতরে যা! আর ভাববার সময় ছিল না। প্রত্যয়ও ঢুকে পড়ল।

ভিতরে ঢুকেই সে থমকে দাঁড়াল।

দুপুরবেলা। বাড়ির ভেতর অদ্ভুত অন্ধকার। রঙচটা দেওয়াল, সস্তা আতরের গন্ধ, কোথাও পুরনো হারমোনিয়ামের দমবন্ধ সুর, কারও কাশির শব্দ। একটা মেয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক মধ্যবয়সী নারীমোটা কাপড়ের শাড়ি, কপালে টিপ নেই, মুখে ক্লান্তির ওপর চেপে বসা কর্তৃত্ব।

তিনি বললেন,

তোরা কারা?

একজন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

ছাত্র... বাইরে পুলিশ...

নারীটি এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর এত দ্রুত বদলে গেলেন, যেন তিনি এই কাজ বহুবার করেছেন।

ওই ঘরে যা। চুপ, একদম চুপ!

আরেক ঘর থেকে আরেকজন বেরিয়ে এলেন। চেহারা কঠিন, চোখ তীক্ষè তিনি বললেন,

কতজন?

পাঁচ... না, ছয়জন।

প্রথম নারীটি বললেন,

সারা, তোর ওদিকটা দেখ।

সারার চোখ গরম। কিন্তু গলায় কাজের সুর।

এইদিকে আয়। মাথা নিচু কর। কারও মুখ যেন বাইরে থেকে দেখা না যায়। 

প্রত্যয় তখনও বুঝে উঠতে পারেনি কোথায় এসেছে। শুধু মনে হচ্ছিল, লজ্জা, ভয় আর কৃতজ্ঞতা একসঙ্গে মানুষকে খুব ছোট করে দেয়। তারা একটা অন্ধকার ঘরে ঢুকে বসল। ঘরে পুরনো খাট, একটা আয়না, লাল কাচের বোতল, কয়েকটি বালতি ভরা পানি আর কোনায় ধূপের ধোঁয়া। ঘরের দারিদ্র্য একেবারে নগ্নভাবে মলিন দাঁতে মৃদু হাঁপাচ্ছে, কিন্তু ধূপের গন্ধ যেন কোন এক অদৃশ্য সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

বাইরে চাপা গলায় হাঁকডাক। একটু পরেই দরজায় ধাক্কা। পুলিশ! দরজা খোল!

সারা ফিসফিস করে বললো,

নড়বি না। মরলেও না।

নুরিহ্যাঁ, প্রত্যয় পরে জানল, প্রথম নারীটির নাম নুরিদরজার কাছে গিয়ে এমন স্বরে বললেন, যেন তিনি এই শহরের বহু গোপন ভাষা জানেন।

কী অইছে? দরজা ধাক্কাইতাছেন ক্যা? — নুরি এখন আর সেই শিক্ষিত মহিলাটি নন, সে সর্দারনি।

বাইরে রূঢ় গলা,

ছাত্র ঢুকছে এদিকে। দরজা খোলেন।

নুরি বললো,

এহানে ছাত্তর আইবো ক্যান? এহানে খইদ্দার আহে। আপনেরা চাইলে লিস্টি লিখ্যা দিবার পারি, দিমু?

আরেকজন পুলিশ বলল,

তল্লাশি হবে।

এবার সারা সামনে এসে দাঁড়ালো।

তালাশি করবান কইরান, কিন্তু হেইডার আগে জুতাহান খোলেন দয়া কইর্যা। আমাগো এই জায়গা যে জায়গাই অউক, এগুলা মাইয়া মানুষের ঘর। আমাগোও মানছম্মান এট্টু অইলেও আছে!

গলিটার অন্য ঘরগুলো থেকেও ফিসফিস, কাশির শব্দ, কেউ হেসে উঠল কৃত্রিমভাবে। যেন পুরো বাড়িটাই একসঙ্গে একটা চরিত্র হয়ে গেছে।

পুলিশ সম্ভবত দ্বিধায় পড়ে গেল। এই ধরনের জায়গায় ঢোকা মানেই কেলেঙ্কারি, গন্ধ, সাক্ষী, লজ্জাসব একসঙ্গে। নুরি আবার বললো,

আপনেরা ছাত্তর খুঁজতাছেন, না খইদ্দার? নাকি আপনেরাও খইদ্দার অইবার চান? দ্যাশের লাইগ্যা কাম করতাছেন, ডিসকাউন্ট দিমু, বালা ডিসকাউন্ট। আইবেন? আয়েন, আয়েন!

একজন পুলিশ যাচ্ছেতাই ভাষায় ক্ষেপে বলল,

ওই মাগী, বেশি কথা কইস না, তরে এই রাইফেলের বাট দিয়া মাথা ভাইঙ্গা দিমু। ইতর মাইয়া মানুষ! এগো সাতে কতাও কওন যায় না। এই চল তো, সবাই চল, ফিরা যাই।

সারা ঠান্ডা গলায় বললো,

বেশি কতা কইতাছি না। হাচা কতা কইতাছি। এই বাড়িত ব্যালা দুফারের সময় ছাত্তর আহে না, হেগো পয়সা নাই। আহে খালি আপনাগোর মতো খইদ্দার।

বাইরে দুএকজন হেসে ফেলল। সেই হাসি পুলিশকে আরো বিরক্ত করল বোধহয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ঘরে ঢুকল না। একটু গালাগাল করে, হুমকি দিয়ে সরে গেল।

ঘরের ভেতর তখনও ভীতসন্ত্রস্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার শব্দ। অনেকক্ষণ পরে নুরি দরজা খুলে বললো,

ওরা গেছে। কিন্তু এখনই বের হবি না তোরা।

প্রত্যয় প্রথমবার মুখ তুলে ভালো করে দেখল নুরিকে। মুখে বয়সের চিহ্ন, চোখে অদ্ভুত কোমলতা। তিনি বললেন,

পানি খাস?

প্রত্যয় মাথা নাড়ল। তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ।

সারা একটা কলস থেকে পানি ঢেলে দিলো।

এই যে বীরপুরুষরা, হাত কাঁপে কেন?

একজন ছাত্র লজ্জায় বলল,

ভয় পাইছি।

সারা বললো,

ভয় পেলে বাঁচা যায়। একদম ভয় না পেলে মানুষ আবার মরেও যায়। মাঝে মাঝে ভয় পাওয়া ভালো।

নুরি মৃদু হেসে বললো,

ওদের আর খোঁচাস না। ওরা পোলাপান।

প্রত্যয়ের মনে হলো, ‘পোলাপানশব্দটা শুনেই তার বুকের ভেতর কেমন নরম হয়ে গেল। যেন হঠাৎ সে মায়ের কাছাকাছি চলে এসেছে।

কিছুক্ষণ পর নুরি একটা থালায় মুড়ি আর গুড় এনে রাখলো।

খা। খালি পেটে বিপ্লব হয় না।

প্রত্যয় বলল,

আমরা... আমরা আপনারে কী বলব?

সারা বললো,

কিছু বলার দরকার নাই। সন্ধ্যা হলে যেদিক দিয়ে পারিস পালাবি।

নুরি মৃদুস্বরে বললো,

আমারে নুরিআম্মা বলে ডাকে সবাই। ওরে বলে সারাআম্মা। তুইও তাই বল।

প্রত্যয় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আম্মা শব্দটার ভেতর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মহৎ গরিমা আছে তা সে জানে, কিন্তু নুরিআম্মার যে টান, তা সে আগে ভাবেনি বা দেখেওনি।

ধীরে ধীরে কথাবার্তা এগিয়ে চলল। জানা গেল, নুরি একসময় স্কুলে পড়াতো। কথাবার্তায় শিক্ষিত মানুষের ছাপ রয়ে গেছে। সারা কলেজ পর্যন্ত পড়েছিলো। তাদের জীবনের বিষয়ে তাঁরা খুব বেশি কিছু বললো না, তবু কথার ফাঁকেই বোঝা যায়, স্বজনরা তাদেরকে বঞ্চিত করেছে, দুনিয়া তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি। পুরুষেরা তাদের শরীর কিনতে আসে কিন্তু মানুষ হিসেবে কেউ মূল্য দেয়নি, দেবেও না। অথচ সেই তারাই আজ ছাত্রদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

সারা জিজ্ঞেস করলো,

এই যে আন্দোলন, তোদের এত দরকার ভাষার?

প্রত্যয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

আমার মা যে ভাষায় কথা বলে, এই যে আপনি যে ভাষায় কথা বলেন, সেই ভাষার যদি অপমান হয়, তা হলে আমি ঘরে কিভাবে বসে থাকি?

সারা অনেকক্ষণ কিছু বললো না। তারপর আস্তে করে বললো,

ঠিক কথা। যে ভাষায় মানুষ কান্দে, ওই ভাষারে ছোট করলে মানুষও ছোট হয়।

নুরি জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো,

আমরা তো কত নামেই ডাকা খাই। খারাপ মাইয়া, বেশ্যা, অপয়া। কিন্তু কেউ যদি আমারে আমার মায়ের ভাষায় একবার ভালো করে ডাকে, মনে হয় আমি এখনও মানুষ আছি, একেবারে খারাপ হয়ে যাইনি।

প্রত্যয়ের চোখ জ্বালা করতে লাগল। সে মাথা নিচু করল।

বিকেলের দিকে বাইরে একটু শান্ত হলে সারা পরিকল্পনা করলো কে কোন গলি দিয়ে বেরোবে।

একসঙ্গে যাবি না। দুইজন করে বের হবি। ঢাকাইয়া ভাষায় বলবিখইদ্দার আছিলাম লজ্জায় কেউ বেশি জেরা করবে না।

একজন ছাত্র ইতস্তত করে বলল,

এই কথা বলব?

সারা কটমটিয়ে তাকালো।

মরতে না চাইলে বলবি। সম্মান বাঁচাতে গিয়া জীবন নষ্ট করার দরকার নাই। সম্মান পরে ধোয়া যায়, জীবন না।

নুরি একটু নরম স্বরে বললো,

সব সম্মান একরকম না রে। কারও সম্মান কাগজে লেখা, কারওটা বুকের ভেতর। বুকেরটার দাম বেশি।

প্রত্যয় বেরোনোর আগে বলল,

আমি আবার আসব।

সারা সঙ্গে সঙ্গে বললো,

না আসবিনা, মোটেই আসবি না।

নুরি হেসে ফেললো।

সারার কথার অর্থ হচ্ছে, ভালো সময়ে আসিস। এরকম খারাপ সময়ে বাধ্য হয়ে যেন আসতে না হয়।

প্রত্যয় ঠিক বুঝতে পারল না, এই দুই নারীর মধ্যে এত ঝগড়াঝাঁটির স্বর, অথচ ভেতরে গভীর এক সখ্য।

অনেক রাতে প্রত্যয় বাড়ি ফিরল। দরজা খুলে মা দাঁড়িয়ে ছিলেন। মনে হলো তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। প্রত্যয়কে দেখে শুধু বললেন,

খেয়েছিস?

প্রত্যয় অবাক। এত বড় একটি আন্দোলনের দিনের শেষে এই প্রশ্ন? তারপরই বুঝলহ্যাঁ, এই প্রশ্নই আসল। যে মানুষ তোমার জন্য অপেক্ষা করে, সে আগে জানতে চায় তুমি খেয়েছ কি না, বেঁচে আছ কি না। তিনি যে মা!

মিঠি দৌড়ে এসে বলল,

দাদা! তুমি স্লোগান দিয়েছ? পুলিশ দেখেছ? গুলি দেখেছ?

প্রত্যয় বসে পড়ল। তার শরীর কাঁপছে। মা সেটা দেখলেন। চুপচাপ গরম পানি আনলেন।

হাত ধুয়ে আয়।

প্রত্যয় বলল,

মা...

তার গলাটা বসে গেল। সে বলতে চাইল অনেক কিছু। বলতে চাইল, আজ কিছু নারী তাকে বাঁচিয়েছে যাদের নাম সমাজ মুখে নিতে চায় না। বলতে চাইল, ভাষা শুধু বইয়ের বিষয় না। বলতে চাইল, লজ্জা আর মর্যাদা আসলে আলাদা জিনিস। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। সে শুধু বলল,

মা, আমি আজ খুব অদ্ভুত কিছু মানুষ দেখলাম।

মা মাথায় হাত রেখে বললেন,

ভালো মানুষ?

প্রত্যয় ফিসফিস করে বলল,

খুব।

রাতে প্রত্যয় ঘুমোতে পারল না। বারবার নুরিআম্মার মুখ ভেসে উঠল, সারাআম্মার কঠিন গলা, আর সেই বাক্য—‘এহানে খইদ্দার আহে, ছাত্তর আহে না কেমন অদ্ভুত! সমাজের চোখে যে শব্দ লজ্জার, সেই শব্দই সেদিন আশ্রয় হয়ে দাঁড়াল।খদ্দের’—একটা মিথ্যে পরিচয়, কিন্তু সেই মিথ্যের আড়ালেই বাঁচল সত্য।

পরদিন শহর আরও ভারী। জব্বার, রফিক, শফিক, বরকত সহ নিহতদের খবর ছড়িয়ে গেছে। মানুষের চোখ লাল। প্রত্যয় আবার বেরোতে চাইল। মা তাকে থামালেন না। শুধু বললেন,

যা। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিসভাষার জন্য লড়াই আর মায়ের জন্য লড়াই একই রে বাবা, একই। আমি তোর মা বলে বলছি না, আমারও মা ছিল। আর মানুষকে কখনো ছোট করবি না। মানুষকে ছোট করে কখনো কোনো লড়াই হয় না, আর হলেও সে লড়াইয়ে জেতা যায় না। যা, কিন্তু বেশি রাত করিস না, আমরা তোর জন্য বসে থাকবো!

প্রত্যয় তাকিয়ে রইল। মা কি আন্দোলনের সবই জানেন, সবই বুঝেছেন? হয়তো মায়েরা কিছু না শুনেও অনেক কিছু জানেন।

আন্দোলন থেমে নেই। শহীদদের নাম মুখে মুখে ফিরল। প্রত্যয় বন্ধুদের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাঝে মাঝে পুরান ঢাকার দিকে গিয়ে দাঁড়াত। কিন্তু ইংলিশ রোডের সেই বাড়ির সামনে বেশিক্ষণ থাকত না। ভেতরে ঢোকেনি আর। সারাআম্মার কথা সে পালন করে চলছে।

কয়েক মাস পরে এক বিকেলে, হঠাৎ কাজের সূত্রে সে ওইদিকে গিয়েছিল। দেখে রাস্তার মোড়ে নুরি দাঁড়িয়ে। শীতের শেষ। নুরির গায়ে ধূসর শাল। প্রত্যয় দূর থেকে সালাম দিল। নুরি চিনতে পারলো।

ওই যে তুই, ছাত্র!

প্রত্যয় কাছে গিয়ে বলল,

আপনি ভালো আছেন, নুরিআম্মা?

নুরি হেসে বললো,

আমাগো ভালোখারাপ আলাদা করে কে দেখে রে? তুই কেমন আছিস?

ভালো।

মা কেমন?

প্রত্যয় অবাক।

আপনি মনে রেখেছেন?

মাওয়ালা ছেলেদের আমি ভুলিনা।

সারা তখন ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। আগের মতোই কড়া।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা কেন? যাও, যাও।

কিন্তু তার চোখে রাগ ছিল না।

প্রত্যয় বলল,

একদিন আপনাদের কথা লিখব।

সারা তৎক্ষণাৎ বললো,

লিখবি না।

নুরি শান্ত গলায় যোগ করলো,

লিখতে হলে নাম বদলিয়ে লিখিস। মানুষ নাম দেখে বিচার করে, কাজ দেখে না।

প্রত্যয় হাসল।

ঠিক আছে, নুরিআম্মা।

সারা বললো,

আর শোন, সেদিন তুই খদ্দের ছিলি। এই ইতিহাস ভুলিস না।

প্রত্যয় প্রথমবার জোরে হেসে ফেলল। অনেকদিন পর।

ফেব্রুয়ারি এলেই শহর ফুলে ঢেকে যায়, শহীদ মিনারের পথে মানুষের ভিড় নামে। আবদুল গাফফার চৌধুরীর অমর একুশের গানআমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারিশোনা যায়, আর শিশুদের মুখে শোনা যায় কবিতা। কিন্তু প্রত্যয়ের মনে পড়ে সেই দুপুরের অন্ধকার ঘর। তার মা আর নেই। মিঠি বড় হয়েছে, স্কুলে পড়ায়। প্রত্যয় নিজেও শিক্ষক হয়েছে। ভাষা নিয়ে বক্তৃতা দিতে বলা হয় তাকে। সে যায়, কথা বলে। কিন্তু সব কথা বলে না।

প্রত্যয় মনে মনে ভাবে, কিছু ইতিহাস মঞ্চে উচ্চারণের জন্য নয়। কিছু ইতিহাস মানুষের ভিতরে নরম জায়গায় থাকে। সেখানে মিছিলের শব্দ যেমন থাকে, তেমনি থাকে এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা, মায়ের চোখ, বোনের প্রশ্ন, আতরের গন্ধ, আর পুরান ঢাকার এক গলির দরজার আড়ালে দাঁড়ানো দুই নারীর মহিমান্বিত অবয়ব।

প্রত্যয় মাঝে মাঝে ভাবে, ভাষার জন্য যে মানুষ প্রাণ দিল, তাদের স্মরণ করার সময় আমরা কি কেবল নিহতদের নামই মনে রাখি? যারা জীবিতদের বাঁচিয়েছিল, তাদের কথা কি মনে থাকে? যারা সমাজের চোখে নিচু, অথচ সংকটে সবচেয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ায়তাদের নাম কোন মিনারে লেখা থাকে?

তার কাছে ভাষা আন্দোলন মানে শুধু গুলি নয়। শুধু শহীদও নয়। ভাষা আন্দোলন মানে, যে ভাষায় মা বলেফিরিস’, যে ভাষায় বোন বলেদাদা’, যে ভাষায় একজন অবহেলিত নারী বলেপানি খাস?’, যে ভাষায় আরেকজন কঠিন গলায় বলেভয় পেলে বাঁচা যায়’—সে ভাষার মর্যাদা।

খদ্দেরশব্দটা শুনলে আজও প্রত্যয়ের বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে জানে, সেদিন সে খদ্দের ছিল না। ছাত্রও ছিল না। সে ছিল শুধু এক তরুণ প্রাণ, যাকে দুই অপমানিত নারী নিজেদের মিথ্যে দিয়ে সত্যিকারের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিল।

সন্ধ্যার পর প্রত্যয় কখনও কখনও একা বসে থাকে। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠে। দূরে কোথাও মাইক বেজে ওঠেএকুশের গান। সে চোখ বন্ধ করলে দেখতে পায়, নুরিআম্মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘এহানে ছাত্তর আহে নাই সারাআম্মা কঠিন মুখে যোগ করছেন, ‘খইদ্দার আছিল তারপর তারা দুজনেই অন্ধকারের ভেতর একটু সরে দাঁড়ান, যেন ইতিহাসকে ঢুকতে দেন, কিন্তু বাড়ির ভেতরের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখেন।

Related Posts