ফাটলের এই পাড়ে || দীপেন ভট্টাচার্য, ক্যালিফোর্নিয়া

যে শহরে আইদা থাকে সেটির নাম লুমেনা, এককালে সমতলের মানুষ আর দূর পাহাড়ের মানুষ লুমেনাকে আলোর শহর বলে জানত। পাহাড়ের ওপর থেকে, রাতের অন্ধকারে, গরম হাল্কা বাতাসে আলোর প্রতিসরণে, লুমেনাকে দেখা যেত জ্বলজ্বল করে কাঁপতে। কিন্তু একদিন লুমেনা শহরের বহু নিচে মাটি নড়ে উঠেছিল, এক টেকটনিক সঞ্চালনে শহরটা দু ভাগ হয়ে গিয়েছিলেউত্তর আর দক্ষিণে। মধ্যে দেখা দিল এক ফাটল যার প্রস্থ অসহায়ভাবে বাড়ছিল প্রতিদিন, ছিল এক নিঃশব্দ বিয়োগগাথা। 

ফাটলের দু পাশের বাড়ি সরছিল দু দিকে। শার্ত্রোজ, ফিউশা, ফিরোজা, পান্না, নীললোহিত, গৈরিক মাটির রঙ দিয়ে মাখা ছিল উত্তরের বাড়িগুলির দেয়াল। তাদের বারান্দায় ছিল ফুলঅলোকানন্দা কি মৌসন্ধ্যা, ক্লেমেন্টাইন কি পেটুনিয়া। উত্তরের আকাশের মেঘও ছিল অন্যরকমনীলাভ নীল পুঞ্জমেঘ। অন্যদিকে ফাটলের দক্ষিণে, আইদার শহরে বাড়িগুলোর কোনো রঙ ছিল না, কারিগররা সিমেন্ট আর পলেস্তরা দেবার পরে রঙ করাটাকে আবশ্যক মনে করেনি। 

এরপরে দক্ষিণের শহরে যখন এক নতুন কর্তৃপক্ষ জন্ম নিল। তাদের প্রচারণা দপ্তর বলল, ‘রঙ হলো ক্ষণিকের ব্যাপার, একবার দিলে মলিন হবে, তখন আবার রঙ দিতে হবে। তার থেকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে রঙহীন থাকাই ভাল, রঙহীন বাড়ি ত্যাগ তিতিক্ষার প্রতীক। এটা আমাদের গর্বের ব্যাপার।যারা এসব বলত তাদের বাড়িতে তেমন ত্যাগতিতিক্ষা ছিল না, আর আইদা আবিষ্কার করেছিল যে, তাদের ফ্ল্যাট বাড়িটির দেয়ালও এক রুক্ষ ধূসর রঙ নিয়ে বেঁচে আছে।

ফাটলটা উত্তর দক্ষিণ লুমেনাকে এক বিস্মৃতির ভাঙা আয়নায় আটকে রাখলদুপাশে একই আকাশ, একই আলো, সীমারেখা অতিক্রম করা শীতের শীতল হাওয়া, কিন্তু রঙ আলাদা, আর সেটা যেন মুখগুলোও আলাদা করে দিল। উত্তর দিকের মানুষজন দূর থেকে হাত নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করত। দক্ষিণেযাদের চোখ ভালো ছিল, অথবা যারা বাইনোকুলার ব্যবহার করততারা সাড়া দিত, কিন্তু প্রথম দিনের পরে কারুর শব্দই অপরদিকে পৌঁছাত না। 

একদিন এরকম, ফাটল আবির্ভাবের এক বছর পরে, সন্ধ্যার সময় আইদার জানালার বাইরে আকাশটা অন্ধকার হয়ে আসছিল, আইদার কালো লম্বা চুল সেদিন চেয়ারের পেছনে ছড়িয়ে ছিল। আইদা কলম ধরে লিখছিল, ‘এই শহর আমাকে শান্তি দিচ্ছে না, ধীরে ধীরে চারদিকের দেয়াল আমাকে ঘিরে ফেলছে। পুরনো গানগুলোও ওরা আমাকে আর শুনতে দিচ্ছে না, রেডিও এখন শুধু সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের প্রশংসা করে, মহাপূর্ণিমার বিশ্লেষণ করে। এসব শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। আমি কি সূর্যকে ভালোবাসি না? আর চাঁদের বিজ্ঞান কি আমি বুঝি না? আমি ওদের থেকে এসব ভাল বুঝি। কিন্তু ওরা তো বিজ্ঞানের কথা বলে না। 

আমি দৌড়াতে চেয়েছিলাম, খোলা মাঠে, যে মাঠ শেষ হয়েছে দিগন্তের পারে। পেছনে উড়বে আমার চুল। আমার সমস্ত শরীর ঘেমে নেয়ে উঠবে, ঝরবে ঘাম। শুধুমাত্র তখনইযখন আমার সমস্ত মাংসপেশী ক্লান্ত হয়ে পড়বেতখন আমি থামব, দিগন্তের পারে। এটাই ছিল আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু ওরা কিছুদিন আগে ঘোষণা দিল, আমাদের জন্য দৌড়ানো নিষেধ। আমি একটা চিঠি লিখেছিলাম, বলেছিলাম, অতীতে মানুষ টিকে ছিল কারণ সে দৌড়াতে পেরেছে বলেবন্য জন্তুর হাত থেকে, অন্য প্রজাতির হাত থেকে। ওরা আমার চিঠির উত্তর দেয়নি, পরে দেখলাম একটি সরকারি ঘোষণাদৌড়ানো স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, তা আইনত দন্ডনীয়।

রাতের খাবার বানায় আইদা, গ্যাসের চুলায়। গ্যাস আসে দক্ষিণ থেকে কোথাও, তার মাবাবার খামার পেরিয়ে, দূরের ধবল পাহাড়ের পেছন থেকে। খামারে বড় হবার সময় গ্যাসের মোটা পাইপ সে দেখেছে যা কিনা পাহাড় ফুঁড়ে তাদের খামারের পাশ দিয়েই লুমেনা এসে পৌঁছেছে। খাবার খেয়ে, লম্বা ওভারকোট পরে, তার তিন তলার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সামনের ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দেয় আইদা।

দরজা খুলে দেয় এক বর্ষিয়ান নারী।কেমন আছ মেলিকা সান?’ ‘ভেতরে আয়,’ বলে মেলিকা, তার কপালের বলিরেখায় চিন্তার ছাপ। 

জানালার পাশে টেবিলের দুদিকে বসে তারা। মেলিকা বলে, ‘জল গরম করছিলাম, চা করছি, তুই খাবি তো?’ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে আইদা, বলে, ‘তুমি কি আমার জন্য চিন্তা করছিলে? ফাটল পেরিয়ে উত্তরে আমি এখনও যেতে চাই, কিন্তু উপায় কী? এই শহর ধীরে ধীরে এক যক্ষপুরী হয়ে উঠছে, এই শহর কি আমাকে বাঁচতে দেবে?’

মেলিকা আইদার একটা হাত নিজের দুটো হাতের মধ্যে ধরে, বলেতোকে ধৈর্য ধরতে হবে। একটা নিরাপদ রাস্তার খোঁজ করছি, কয়েক দিনের মধ্যেই খবরটা পাব আশা করছি। 

ঘরে থাকতে পারছি না, অস্থির লাগছে। এই শহর আমার দম বন্ধ করে দিচ্ছে।আইদার ডান হাতটি মেলিকার হাত দুটির মধ্যে কিছুটা স্বস্তি পায়।

স্টোভে বসানো কেটলিটা শব্দ করে, মেলিকা উঠে গিয়ে গরম জলে চাপাতা ভেজায়। তারপর জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে নিচে তাকায়। এই বিল্ডিংএর সামনে কয়েকটি গাছ, তারপর একটা খুবই ছোট ঘাসের জমি, তারপর বড় রাস্তা। প্রতি সন্ধ্যায় কিছু তরুণ টহল দেয়, সূর্যাস্তের পরে আইদার মতো মানুষদের একা বের হওয়া নিষেধ। 

তোর মা বাবার আর কোনো খবর পেলি?’ জানালার পাশে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করে মেলিকা।না, সেই যে গত মাসে বেহনাম নামে একটি তরুণের হাত দিয়ে চিঠি আর টাকা পাঠিয়েছিল, তারপর আর কিছু জানি না।

আশা করি ওরা নিরাপদে পাহাড় পেরিয়ে যেতে পেরেছে। আর বেহনাম কি পরে আর এসেছিল?’

নাহ!’ পাহাড়ের পাদদেশে তাদের লাল শাকের খামারটার কথা ভাবে মেলিকা, এখন সেটা দক্ষিণ লুমেনা কর্তৃপক্ষের দখলে। তরুণ বেহনামহ্যান্ডসামঘরে ঢুকে তাকে অভিবাদন জানিয়ে তার টুপি খুলে হাতে রেখেছিল, রুপোলিকালোর মিশেল তার চুলচুলের আধপাকা রঙটা মুখটাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। 

‘..ছাই রঙা চুল ছিল বেহনামের, এই অল্প বয়সে ওর চুল পেকেছে, লুমেনায় ওরকম দেখা যায় না..’ কথাগুলো নিজের অজান্তেই বলে ফেলে আইদা, অপ্রস্তুত হয়, তার গালদুটোতে অল্প লাল দেখা যায়।

মেলিকা হাসে, এই নিয়ে কিছু বলে না। চা বানিয়ে কাপদুটো টেবিলে রাখে। আইদা ওকে ফোন খুলে একটা পোস্ট দেখায়, আজ রাত ১২টায় শহরের তিনিশ চত্বরে সমাবেশ হবে, পোস্টটা উত্তর লুমেনা থেকে এসেছে। 

তুই যেতে চাইছিস, কিন্তু তিনিশ পর্যন্ত তো পৌঁছাতে পারবি না।

আমি বড় রাস্তা ধরব না, ওদের চাইতে দিকটা আমি ভালো চিনি।

তোকে আমি আটকাব না,’ একটা দীর্ঘশ্বাস আটাকায় মেলিকা, বলে, ‘তুই তোর মাবাবার মতনই হয়েছিস। কিন্তু এত রাতের সমাবেশ ওরা কীভাবে নেবে সেটা বুঝতে পারছি না। তোকে যদি বলি, ওখানে গিয়ে সাবধান থাকিসসেটারও কোনো মানে হবে না। ওরকম জায়গায় সাবধানে কীভাবে থাকবে মানুষ?’

আমি যে ভয় পাচ্ছি না, এমন নয়, মেলিকা সান। কিন্তু এই সময়ে তো আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না।

তুই হয়তো জানিস না যে, শহরে মারেথ থেকে নতুন কমিসার এসেছে।

কমিসার কী জিনিস?’ 

আমিও নিশ্চিত নই, কিন্তু শুনেছি সে দক্ষিণ লুমেনার কর্মকান্ড চালাবে যতদিন না নতুন কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নেয়। সে অবশ্য লুমেনারই নাগরিক ছিল, কিন্তু পুরনো সময়ে তার নামে এখানে কিছু নিষেধাজ্ঞা ছিল।

কিন্তু মারেথ তো সমুদ্রের ধারে, সেখানকার মানুষেরা সমুদ্রের বিশাল জোয়ারভাটা থেকে বাঁচতে খুব উন্নত প্রকৌশল উদ্ভাবন করেছে। শুনেছি তারা আর্টকেও খুব মূল্য দেয়। এই কমিসার কি তাদের কাছে কোনো শিক্ষা পায়নি?’

এবার মেলিকার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এক সময়ে সে বিশ্বাস করত মানুষ বদলাতে পারে, এখনও সেই বিশ্বাসের কিছু টুকরো অংশ ধরে রাখতে চায়। 

আইদা বিল্ডিং থেকে বের হয়, পেঁজা তুলোর মত তুষার উড়ছিল, লম্বা কালো কোটের ওপর নরম তুষার পড়ে কোটটা সাদা করে দিচ্ছিল। বড় রাস্তার সমান্তরাল একটি রাস্তা ধরে হাঁটে। যদিও কোনো সরকারি ডিক্রি হয়নি, কিন্তু কোনো এক অলিখিত নিয়মে তার মতন তরুণীদের রাতে রাস্তায় বের হলে ওরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ জানে না কবে থেকে ওরা উদয় হলোযেন শহরের মাঝখানের ফাটলের অন্ধকার থেকে উঠে এসেছে। এদের নাকি নিরীক্ষক নাম দেওয়া হয়েছে। কী অদ্ভূত একটা নাম, এরা কী নিরীক্ষণ করবে? তাদের নিরীক্ষণ করার অধিকার কে দিয়েছে? আইদা ওদের এড়াতে পাশের একটা ছোট গলিতে ঢোকে।

এরকম কয়েকটা গলি পার করে তিনিশ চত্বরে পৌঁছায়। সেখানে ইতিমধ্যে কয়েক তরুণ, তরুণী, কিছু প্রৌঢ় মানুষ জমা হয়েছে। কিছু প্ল্যাকার্ড, তাতে লেখাআমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দাও’, ‘গৃহবন্দি আর নয় দূরে নিরীক্ষকেরা সারি দিয়ে দাঁড়ানো, তাদের মাথায় হেলমেট, মুখে গ্যাসমাস্ক, হাতে ধাতব লাঠি। সমবেত সবাই কোনো চিৎকার করছে না, স্লোগান দিচ্ছে না, তাদের থেকে উৎসারিত গুঞ্জন তরঙ্গ নিরীক্ষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, স্পষ্টতই তারা এতে অস্বস্তি বোধ করছে। ফাটলের আগে এরকম দৃশ্য ছিল কল্পনাতীত। কীভাবে এই কর্তৃপক্ষ ক্ষমতায় এলো, সেটাও রহস্য। 

আইদার পাশে দাঁড়ানো ছিল একটি যুবক, আইদার থেকে বয়সে বেশ ছোটই হবে, কিন্তু পোশাকে, চুলের ছাঁটে বোঝা যায় সে স্টাইল সচেতন। আইদার দিকে তাকিয়ে সে হাসে, তারা একই পথের পথিক, জীবনে হয়তো প্রথম এরকম একটি সমাবেশে সে এসেছে। একজন নারীর সাহচর্য হয়তো ছেলেটিকে জোর গলায় স্লোগান দিতে অনুপ্রাণিত করে, ‘স্বাধীনতা ফিরিয়ে দাও!’ ছেলেটির অমায়িক নির্দোষ হাসি আইদাকে স্বস্তি দেয়, সেও তার সাথে গলা মিলায় — ‘ফিরিয়ে দাও!’

নিরীক্ষকরা হঠাৎ করেই সামনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে, আইদার মনে হয় তাদের আকার ক্রমশ দানবের মতো বাড়ছে। এরা এতো দ্রুত এরকম ভীতিকর পদ্ধতি শিখল কেমন করে? কিছু কাঁদানে গ্যাস শেলের শব্দ হয়, ধোঁয়ায় ভরে যায় চত্বর, আইদা পকেট থেকে রুমাল বের করে। 

এরপরে, সমবেত সবাই কিছু বোঝার আগেই একটা তীক্ষœ কিন্তু চাপা শব্দ শোনা যায়। আইদা দেখে তার পাশের তরুণটি উবু হয়ে বসে পড়েছে। আইদা, হাঁটু গেড়ে বসে তাকে জিজ্ঞেস করতে যায়, ‘কী হয়েছে?’ কিন্তু দেখতে পায় তরুণটির বাদামি কোটটি কালো ছোপে ভরে গেছে। আইদা তার মাথাটি ধরতে যায়, কিন্তু তার আগেই তরুণটি মাটিতে শুয়ে পড়ে। আরো কিছু সেরকম চাপা তীক্ষè শব্দ শোনা যায়, আইদা দেখে আরো কয়েকজন লুটিয়ে পড়ছে। গ্যাস এখন কাজ করছে, চোখ দিয়ে জল ঝরতে থাকে আইদার, চোখ জ্বালা করে। তবু চোখের কোনায় দেখে কয়েকজন নিরীক্ষক হেলমেট আর গ্যাসমাস্ক খুলছে, সেগুলো হয়তো কাজ করছে না, ধোঁয়ার মধ্যে ঠিকমত সব দেখতে পারছে না। 

আইদা আরো ঝুঁকে তরুণটির অবস্থা দেখতে চাইছিল, কিন্তু পেছন থেকে কেউ যেন তাকে জাপটে ধরে। প্রথমে সে চমকে উঠলেও বুঝতে পারে এটি পরিচিত কেউমেলিকা! মেলিকা আইদাকে এক হাতে টেনে ওঠায়, তার হাতে যে এত শক্তি আছে সেটা কে জানত

মেলিকা সান, কি মরে গেছে?’ আইদার চোখদুটি ভয় আর বেদনার আর্তিতে পূর্ণ থাকে।এখান থেকে আমাদের চলে যেতে হবে, আমার সঙ্গে আয়,’ মেলিকার কথাগুলো বলতে কষ্ট হয়। গুলির তীক্ষœ শব্দগুলো এখন ওদের চারদিকে বাজির মতো ফোটে, আইদার চোখের কোনা বহু দেহ মাটিতে পড়ে যাবার দৃশ্য ধরে রাখে। 

পাশেরই একটা রাস্তায় দৌড়িয়ে ঢোকে দুজন, এখান থেকে তিনিশ চত্বর দেখা যায় না। এই রাস্তার দু পাশে দোকান, ওপরে যারা থাকে তাদের জানালা বন্ধ। আইদা সামনে ছিল, পেছন ফিরে দেখে মেলিকা মাটিতে শোয়া।নাহ, নাহ, নাহ!’ চিৎকার করে আইদা মেলিকার পাশে বসে ওকে তুলে ধরে। পাশ দিয়ে বহুজন গুলির হাত থেকে বাঁচতে ছুটে যায়, তাদের সময় নেই এখানে থামবার। আইদা মেলিকার গালে আলতো স্পর্শ করে, ওর মনে হয় মেলিকার মুখে স্মিত হাসি, চোখ আধোবোজা। মেলিকার একটা হাত ধরে আইদা, এখনো উষ্ণ। গুলিটা কোথায় লেগেছে বুঝতে পারে না আইদা। মেলিকার ঠোঁট নড়ে, মনে হয় মেলিকা বলতে চাইছে, ‘চলে যা..মেলিকাকে ছেড়ে কোথায় যাবে আইদা? এই শহরে তার আর কেউ নেই।মেলিকা সান..’ চোখ দিয়ে জল গড়ায় আইদার। মেলিকার দেহটা ভারি হতে থাকে, চুল পড়ন্ত তুষারের শুভ্রতায় আরো সাদা হয়, ধীরে ধীরে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়, মুখের হাসিটা মিলিয়ে গিয়েও যেন মেলায় না। হালকা তুষারে এবার মুখটাও ঢাকতে থাকে। 

আইদা চিৎকার করতে থাকে। মেলিকার উষ্ণ হাত মনে হয় ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে যারা দৌড়াচ্ছিল তাদের থামার উপায় ছিল না, সেই অসহায় মুহূর্তে আইদাও বোঝেযে কোনো মুহূর্তে এই রাস্তায় নিরীক্ষকরা ঢুকবে, কিন্তু মেলিকাকে রেখে পালিয়ে যাবার কথা তার মাথায় আসে না। দূরে রাস্তার মোড়ে কালো হেলমেটরা দেখা দেয়। আর তখনই কেউ আইদার কোটের পেছনটা টেনে ধরে, তাতে আইদার চিৎকার থেমে যায়।আইদা সান!’ এক পুরুষের কন্ঠ শোনে আইদা, ‘এখানে থাকা যাবে না।ঠিক যেমন করে মেলিকা তাকে টেনে তুলেছিল সেভাবে তাকে তুলেতার বাঁ হাতটা ধরে সেই পুরুষ দৌড়াতে থাকে। আইদা থামতে চায়, কিন্তু অন্য মানুষটির শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠে না। 

পেছনে গুলির শব্দ, মানুষের আর্তনাদ ফেলে তারা একটি গলিতে ঢোকে। সেখানে তারা দাঁড়ায়, দুজনেই হাঁপায়। পুরুষটি বলে, ‘আপনি মনে হয় আমাকে চিনতে পারেননি, আইদা সান। আমি বেহনাম।’ 

আইদার কানে বেহনামের কথাগুলো ঢোকে না, তার চোখ দিয়ে জল ঝরে। মেলিকা তাকে একা ছেড়ে দেয়নি, তাকে অনুসরণ করে সমাবেশে এসেছে। এই শহরে মেলিকা ছিল আইদার অভিভাবক। তাকে ওইভাবে রাস্তার মধ্যে সে ফেলে এলো! আইদা আবার পেছন ফিরে হাঁটতে চায়, কিন্তু বেহনাম তাকে শক্ত হাতে ধরে রাখে। বেহনামের মাথায় ক্যাপ, তার চুল দেখা যায় না।

আপনি এখন ফিরে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত, সেটি নিশ্চয় মেলিকা সান চাইবেন না।’ 

কিন্তু মেলিকা সান হয়তো এখনো বেঁচে আছেন, আমাকে ফিরে যেতে দিন।

আপনি তাকে কীভাবে বাঁচাবেন? ওরা মেলিকা সানকে তুলে নেবে, বেঁচে থাকলে হাসপাতালে নিয়ে যাবে, কিন্তু এখন আপনাকে বাঁচতে হবে।’ 

তাহলে আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

আপনি উত্তরে যাচ্ছেন, আইদা সান!’

তার জীবনটা যে এক সন্ধ্যায় এভাবে বদলে যাবে সেটা ভাবেনি আইদা। মেলিকা সানের শান্ত মুখাবয়বটি তার মনে ভেসে উঠতে থাকে।

কিন্তু উত্তরে আমি তো কাউকে চিনি না ..,’ এই কথাগুলো বলতে বলতেই আইদার মনে পড়ে যায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ফাতেমের কথা। শুধু ফাতেমে কেন, আরও তো আছে কয়েকজন। ফাটল দেখে দেবার পরদিনও ওর ফাতেমের সঙ্গে দেখা হয়েছে, সেদিনও ফাটলটা এমন গভীর প্রশস্ত হয়নি যে পারাপার করা যেত না। এরপরে একটা বছর কেটে গেল, ওরা কেমন আছে তা আইদা এখন আর জানে না।

ওরা পার্কের পরে বড় রাস্তাটা পার হয়ে আর একটা ছোট রাস্তায় ঢোকে, সেখানে একটা গাড়ির সামনে দাঁড়ায়। বেহনাম আইদাকে গাড়িতে উঠতে বলে। 

এটা আপনার গাড়ি?’ 

কেন, আমাকে দেখে কি মনে হয় না যে আমার গাড়ি থাকতে পারে?’ 

না, না!’ অপ্রস্তুত হয় আইদা, তারপর যোগ করে, ‘কিন্তু আমাকে তো ফ্ল্যাটে ফিরতেই হবে, আপনি যে মাবাবা কাছে থেকে টাকা এনে দিয়েছিলেন সেটাও তো ওখানে।

আমার কাছে কিছু আছে, আপনাকে দেব, এরপরে আপনাকে উত্তরের বন্ধুদের সাহায্য নিতে হবে। আমার কথা বিশ্বাস করুন এখন ফ্ল্যাটে ফেরা যাবে না। শহরে নতুন কমিসার এসেছে, আমি শুনেছি সে নাকি সামান্যতম প্রতিবাদ সহ্য করবে না।

আইদা দিশেহারা হয়ে পড়ে। সে কী করতে পারে

বেহনাম আর কোনো কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট দেয়, বড় রাস্তা এড়িয়ে গাড়ি মিনিট দশেকের মধ্যেই দক্ষিণ লুমেনা ছাড়িয়ে যায়। এখানে শহরের আলো নেই, মাঝে মধ্যে দূরে বাতি দেখা যায়। পাকা রাস্তাটা শেষ হয়ে কাচা রাস্তা শুরু হয়। আরো আধ ঘন্টা চলার পরে বেহনাম গাড়ির আলো নিভিয়ে দেয়, অন্ধকারে সামনে কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু বেহনাম গাড়িটাকে ঠিকই চালিয়ে নেয়। পাঁচ মিনিট পরে রাস্তার পাশে একটা ঢাল ধরে গাড়িটা নামায়, তারপর থামে। দুজনেই গাড়ির বাইরে বের হয়।

এখান থেকে ফাটলটা খুব বেশি দূরে নয়, আধ ঘন্টা মতন হাঁটতে হবে। আপনার জন্য আমি কিছু জিনিস নিয়ে এসেছি। একটা ব্যাকপ্যাক, তাতে জল আর খাবার আছে, টর্চ আর উত্তর লুমেনার মানচিত্র।

আপনি এগুলো নিয়ে এসেছেন? তাহলে আমাকে উত্তরে পাঠানোর প্ল্যান আপনার আগে থেকেই ছিল।

আমাকে ভুল বুঝবেন না, আইদা সান, আজ আপনি যাচ্ছেন, কাল হয়তো আমি আপনার সাথে যোগ দেব।

ট্রাঙ্ক খুলে ব্যাকপ্যাকটা বের করে বেহনাম। সেটা কাঁধে নিয়ে বলে, ‘আপাতত এটা আমার সঙ্গে থাক, আপনাকে তো সামনে এটাকে বইতে হবে।

বেহনাম সামনে হাঁটে, অন্ধকারে ওর শরীরের প্রতিলিপি অনুসরণ করে আইদা। মিনিট পনেরো পরে ওদের সামনে খাদটা দেখা দেয়। বেহনাম বলে, ‘এখান থেকে আপনার যাত্রা শুরু হবে, আইদা সান।

সামনে এক বিশাল অদৃশ্য গিরিখাত, বেহনাম টর্চের আলোয় একটা পায়ে চলা পথ দেখায়, সেটা নিচে নেমে গেছে। আইদাকে বলে, ‘ফাটল এখনো বড় হচ্ছে, তবে মনে হয় এখন ঘন্টা তিনেক হাঁটলেই অন্যদিকে পৌঁছাবেন। কিন্তু এই রাতের মধ্যেই আপনাকে এটা পার হতে হবে কারণ দিনের বেলা ওরা ওপর থেকে পুরো ফাটলটাই দেখতে পায়গুলি চালাতে পারে।

বেহনামকে কী বলবে ভেবে পায় না আইদা, কয়েক ঘন্টা আগের দ্বিধা ফিরে আসে। উত্তরে যাবার এই সিদ্ধান্তটা কি হঠকারি নয়? আইদা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর মাথা নুইয়ে বিদায় জানায়, গিরিখাতে নামার পথটায় আলো ফেলে এগোয়। এই ফাটলে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে

টর্চের আলোয় ওপর থেকে কিছু নিচে নামার পরে ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে জলের দুটো বোতল বের করে নিয়ে দু পকেটে ঢোকায় আইদা। ব্যাকপ্যাকটা মাটি থেকে আর তোলে না, সেটা সেখানে রেখেই আবার নামতে শুরু করে। কয়েক ঘন্টা আগে তিনিশ চত্বরে তার পাশে একটি তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল; তাকে উবু হয়ে ধরতে গিয়ে দূরে, চোখের কোনায়, এক নিরীক্ষককে হেলমেট খুলতে দেখেছিল সে। ওই নিরীক্ষকের আধপাকা চুল ধোঁয়ার মধ্যেও দেখা গিয়েছিল। সেই মানুষটির দেওয়া ব্যাকপ্যাকে যে তাকে অনুসরণ করার জন্য একটি যন্ত্র আছে তাতে আইদার কোনো সন্দেহ ছিল না।

লুমেনার আকাশে সেদিন দুটো চাঁদ একসাথেই দেখা যাচ্ছিল। একদিন দুটি চাঁদ আর সূর্যের সম্মিলিত টানে লুমেনা দুভাগ হওয়া শুরু হয়েছিল, এক বিরল মহাপূর্ণিমায়। আইদা ভাবে দুটি চাঁদ আর সূর্য মিলে বহুদূরের মারেথ শহরের পাশে সমুদ্রের জলে আজ বিশাল ঢেউ তুলছে। সেখানকার মানুষ রাতে রেস্তোরাঁয় খাচ্ছে, তাদের পাশে কেউ কারুকাজ করা পোশাকে ভায়োলিন বাজাচ্ছে, তাদের সন্ধ্যাটা আনন্দে ভরে উঠছে। সেই শহর থেকেই ফিরে এসেছে লুমেনার নতুন কমিসার, কিন্তু সে হয়তো ভায়োলিনের ভক্ত নয়। আকাশের দিকে তাকায় আইদা, অর্ধেক আকাশ জুড়ে এক বিশাল গ্যালাক্সি ছড়িয়ে আছে, সেখানে কি তাদের মতন গ্রহ নেই? আর একজন আইদা, আর একজন মেলিকা, আর এক জন বেহনাম? হয়তো সমস্ত মহাবিশ্বই এই বিশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতার চক্রে আটকে আছেএকদিকে মারেথের আনন্দ উৎসব, অন্যদিকে দক্ষিণ লুমেনের ধূসরতা, এর মাঝে তার নিজস্ব যাত্রা। দুটি চাঁদই মাথার ওপরে উঠে আসতে শুরু করে, তাদের আলোয় গিরিখাত উদ্ভাসিত হতে থাকে।

Related Posts