ডয়চে ভেলের সংবাদ বিশ্লেষণ || আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের ফল কী হতে পারে

ডয়চে ভেলে প্রতিবেদনঃ জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিল পাস করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। উদ্যোগকেজনগণের মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাতমনে করে আওয়ামী লীগ। গত বুধবার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তা এবং তাদের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করে জাতীয় সংসদ। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আগে কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান ছিল না। ২০২৫ সালের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে আইনে কোনো কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে। তারপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার।

গত বুধবার জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারব।

বিলে আরো বলা হয়, উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভাসমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসমক্ষে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করবে।

আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পরই নিজেদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এর প্রতিবাদ জানায় আওয়ামী লীগ। এক বিবৃতিতে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আজ বাংলাদেশের মহান সংসদ কলঙ্কিত হলো। ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি হলো। তথাকথিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি মূল্যবোধের প্রতি কোনো ভ্রম্নক্ষেপ না করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিল পাস করেছে। আমরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানাচ্ছি।গত বুধবার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা বিবৃতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ মনে করে, ‘এই ধরনের সিদ্ধান্ত কেবল একটি রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা, সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। ইতিহাস, ঐতিহ্য সংগ্রামের পথ বেয়ে গড়ে ওঠা গণমানুষের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ গণতন্ত্রের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রকে একদলীয় বা স্বৈরতান্ত্রিক ধারার দিকে ঠেলে দেয়।এই বিলদেশের জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে নাবলেও দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

আওয়ামী লীগের মতো দলকেনিষিদ্ধকরে বহুদলীয় গণতন্ত্র  কীভাবে সম্ভব?’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক . ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সংশোধনী বিলে দুটি দিক আছে— ‘যারা অভ্যুত্থানের সময় আসলেই অপরাধে জড়িত হয়েছে, তাদের বিচার করা। কিন্তু আরো অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যারা আসলে অপরাধে জড়িত না। এটা আপনিও জানেন, আমি জানিÑ  সবাই জানে। সরকারের ওপর হয়তো নানা চাপ আছে। সংসদে বিরোধী দল জামায়াত আছে। সেই কারণে হয়তবা সরকার সংসদে আগের আদেশটি আইনে রূপান্তর করেছে।

ডয়চে ভেলেকে তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে হয় দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়া ঠিক হবে না। এটা সম্ভবও হবে না। ব্যক্তির বিচার হতে পারে। কিন্তু আদর্শকে নিষিদ্ধ করা যায় না। জামায়াতকেও তো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু টেকেনি।

অধ্যাপক . ফরিদ উদ্দিন আহমেদের প্রশ্ন, ‘যে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলকে নিষিদ্ধ করে সেটা কীভাবে সম্ভব?’ তিনি মনে করেন, ‘এর দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারেÑ এই সময়ে আওয়ামী লীগ ভিতরে ভিতরে তার দল গোছাতে পারে, আবার আন্ডার গ্রাউন্ড তৎপরতাও বেড়ে যেতে পারে।

রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘কোনো একটি পলিটিক্যাল পার্টি তার কার্যক্রম করবে, কি করবে না সেটা কোনো এক্সিকিউটিভ অর্ডার বা আইন দিয়ে নির্ধারণ করা ঠিক না। জনগণ যদি ভোটের মাধ্যমে কোনো দলকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে প্রত্যাখ্যান হয়ে যাবে। আর রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বাদ দেয়া বা বিরত রাখা কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এটা কোনো গণতান্ত্রিক ভাবাপন্ন মানুষের কাজ নয়। আমাদের সংবিধানে যে ধারা আছেরাইট টু অ্যাসোসিয়েশন’, ‘ফর্ম পলিটিক্যাল পাটি’, ‘এক্সপ্রেস পলিটিক্যাল ভিউজ’Ñএসবের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক।

আমাদের আইসিটি আইনে কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের বিচারের বিধান ছিল না’Ñ কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যদি সংশোধনী এনে সেটা করা হয় তা ঠিক হবে না। কারণ, যখন ঘটনাটি ঘটেছে, তখন তো ওই আইনটি ছিল না। একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে চিন্তা করে অতীতের ঘটনায় ভবিষ্যতে আইন করে রেট্রোস্পেটিভ এফেক্ট দেয়া ঠিক নয়। কোনো ব্যক্তির অপরাধের বিচারের তো বিধান আছে, কিন্তু ব্যক্তির অপরাধের জন্য তো দলকে নিষিদ্ধ করা যায় না। নাৎসি বাহিনীর ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছিল সেই অবস্থা তো এখানে হয় নাই। ভবিষ্যতেও হবে না।

তার মতে আইন করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলেও কোনো দল বা আদর্শ আসলে নিষ্ক্রিয় হয় না, ‘কোনো আর্দশিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করলে, অতীতে দেখা গেছে, তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসে।

আওয়ামী লীগ তো আছে, শুধু কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে

বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান . আসাদুজ্জামান রিপনের সঙ্গেও কথা হয়েছে। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশ বা অধ্যাদেশের ধারাবাহিকতার প্রয়োজন পড়ে কখনো কখনো। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আদেশ সংসদে পাশ হয়েছে। সন্ত্রাস দমন আইন পাস হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগকে তো নিষিদ্ধ করা হয়নি। দল হিসাবে তো তারা আছে। কিন্তু তারা কার্যক্রম চালাতে পারবে না। জামায়াতকে যেভাবে দল হিসাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে তো সেটা করা হয়নি। এর টার্গেট আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নয়। আমার মনে হয় না যে, এর মাধ্যমে দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে।

এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের মতো একটি দল আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে’Ñ এমনটিও তিনি মনে করেন না। বিএনপির এই অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মতে, ‘আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক ধারা, তারা সেরকম দল নয়। আর তাদের দল তো আছে, শুধু কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

Related Posts