নাকফুল || নাজনীন সীমন নিউইয়র্ক

 ‘চেয়ারম্যান বলে কথা! কতো ক্ষমতা উনার! উনার সাথে এরাম করলি চলে?’—হ্যানত্যান আরও কতো শত কথা বলেই চলে অবিরাম জয়নবের মা। বয়স কতো হবে তারÑচল্লিশ হয়তো বা পেরিয়েছে অথবা ছুঁই, ছুঁই, কিংবা পঞ্চাশের কাছাকাছি। কি যায় আসে! শরীর বেশ শক্তপোক্ত, ভারী নিতম্ব ভরাট বুক হলেও পিঠ আর কোমরের মাঝামাঝি জায়গায় যেমন এই বয়সের বেশীর ভাগ নারীর ঝুলে পড়া মাংশ থাকে, তার একেবারেই নেই। গোলগাল ফর্সা মুখ উনুনের কিংবা রোদের তাপে, পরিশ্রমের ঘামে লাল ভেজাভেজা হয়ে থাকে বেশীর ভাগ সময়ই। ধান ভানা, সরিষা মাড়ানো, গরুর দুধ দোয়ানো থেকে শুরু করে ঝাঁট দেয়া, উঠোন লেপা, কাটা বাটা সবই করে সে। শরিফুন নেসা কেবল রান্না চড়ান আর বাড়ির সবাইকে তিন বেলা খেতে দেন।কেবলশুনে যে সকলেই ভাবতে পারে আর এমন কি! সারাদিনে কেবল তিনবার রান্নাঘরে গিয়ে নাড়াচাড়া আর তারপর সবাইকে চামচে করে ভাত তরকারি উঠিয়ে দেয়া যদি কাজ হয়, কাজ সকলেই করতে রাজী হবে এক বাক্যে। এর চেয়ে সহজ জীবন আর হবে না মনে করে যতোক্ষণ না স্বচক্ষে কেউ দেখছে এবং অন্তত একদিনের জন্য হলেও হাতেকলমে চেখে দেখছে এই তিনবেলার পরিধি। কেননা কেবল স্থায়ী চৌদ্দ সদস্যের সংসারে অনাস্থায়ী, কাক্সিক্ষত এবং অনাকাক্সিক্ষত, সময় অসময়ে সব মিলে গোটা কুড়ি থেকে কখনও কখনও ত্রিশ জনের পর্যন্ত আয়োজন করতে হয় তাকে এবং চৌদ্দজন সংখ্যা গণনা যুক্তি বিচারে কতোটা সঠিক সেটা অবশ্য বিবেচ্য যেহেতু সপ্তম সন্তান এখন তার পেটে নড়াচড়া করছে। সাড়ে তেরো বছরের বিবাহিত জীবনে ঢিবির মতো উদর ছাড়া তাকে কে কতোদিন দেখেছে, ভাবার বিষয়। একটা খালাস হতে না হতেই আর একটার বীজ বপন হয়ে গেছে। ফলতঃ কোলে কাঁখে হাতে বাচ্চা তার আছেই সব সময়। আর সারা বাড়িও ওঁয়া ওঁয়া, ম্যা ম্যা, ইঁ ইঁ ধ্বনিতে ভরে থাকে। এমনকি চুলোয় রান্না চড়িয়েছে যখন কোলেরটা হয়তো তখন বামপাশ চুষছে আর বগলের নীচে মাথা ঢুকিয়ে তার একটু বড়োটা ডানপাশ। সামনে বিশাল হাঁড়িতে হয়তো ফুটছে বাগাড় দেয়া ডাল অথবা লাউ আর চারাপোনার ঝোল কিংবা বেগুন দিয়ে পুঁটি অথবা শৈল আর আলু; কখনও আবার মিষ্টি কুমড়ো শাপলা দিয়ে ইলিশ অথবা চিংড়ি। আপাতদৃষ্টিতে অর্থাৎ জন্মসংখ্যা বিচারে যে কারোরই মনে হবে সংসার চলছে স্বাভাবিক গতিতে, সুখে শান্তিতে, মানে মানুষের সুখী হতে আর কি বা লাগে মৌলিক চাহিদার পঞ্চপদের সাথে আরো একপদ প্রেম ভালোবাসা যোগ করে ষষ্ঠপদ ছাড়া! যে বাড়িতে নিয়মিত চুলো জ্বলে ওঠে, দড়িতে কাপড় ঝোলে, দূর থেকে নারকেল আর সুপারি গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বাড়ির ছাদ দৃষ্টিগোচর হয়, সন্ধ্যায় তারস্বরে নামতা বা ছড়া পড়ার শব্দ শোনা যায় সে বাড়ি যে যাবতীয় সুখের আধার এতে কারো সন্দেহ থাকার কথা না, বরং সবাই তাকে স্বামী সোহাগী বলেই জানে। সোহাগ যখন পেট উপচে পড়ার দশা, যখন দুই পায়ের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে আসে কান্নার শব্দে চারপাশ জানান দিয়ে, তখন সে যেসোহাগী’, তা অস্বীকারই বা করে কেমন করে! কেউ কখনও জিজ্ঞেস করেনি তাকে রাতদুপুরে মদ আর সিগারেটের গন্ধভরা মুখ তার কেমন লাগে কিংবা অন্য নারীর শরীর হাতড়ানো হাত তার বুক পিঠ স্পর্শ করলে কতোটা অশূচি বোধ হয় তার। আর উত্থিত শিশ্ন, যার কোনো বাছবিচার নেই, ঘর্মাক্ত অলিগলিতে যেমন হনহনিয়ে ঢুকে যাচ্ছে, কিশোরী থেকে মধ্যবয়স্ক কোনোটাতেই না নেই, বরং বলা ভালো কারোরই নিস্তার নেই, তেমন একটা অঙ্গ নিজের ভিতরে প্রবেশ করলে যে তার ঘেন্না হয়, মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত দুর্গন্ধযুক্ত এঁদো কাদা তার মধ্যে কেউ ঢুকিয়ে দিচ্ছে জোর করে, রাত হলেই তার শরীর গুলিয়ে ওঠে কেমন, ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেকাকে বলবে সে? তার ছায়া দেখলেই রাগ, ঘৃণা, কষ্ট, অপমান তাকে বিঁধতে থাকে সেই রাজকুমারের হাজার সুঁইয়ের মতো। কিন্তু সে সুঁচ থেকে তাকে বাঁচিয়ে তুলবে এমন কে আছে! আছে কি কেউ? অথচ চারপাশের কারোর যে ব্যাপারটা অজানা, তেমনটা কিন্তু একেবারেই নয়, বরঞ্চ কারো মেয়ে একটু বড়ো হলেই এই বাড়ি থেকে পাঁচশহাত দূরে রাখে তাকে এতোটাই আতঙ্কিত সবাই। কোনো বাড়ির মা, বউ, বোন কেউই রক্ষা পায়নি তার হাত থেকে। এলাকার চেয়ারম্যান বলে কথা! ইশারায় না বুঝলে মুখের কথায়, সেটা না হলে এটা ওটার লোভ, তাতে না বুঝলে শাসানি, আর তাতেও না বুঝলে জবরদস্তিঅস্ত্রের তো অভাব নেই তার। আর এলাকার লোকই বলবে বা কি! পরিবারের কেউই তো কিছু বলতে পারে না। মদখোর, গাঁজাখোর, শরীরখোর তো মানুষ একবেলায় হয়ে ওঠে না। টাকা ওড়ানো অভ্যাস দেখেও বাবা কোনো দিন কিছু বলেননি; কেন বলেননি অমন রাশভারী শাসনপ্রেমী মানুষ, কেউ জানে না। আর টাকা যখন ওড়ায় মানুষ, তখন তো ভালো কিছুতে ওড়ায় না দুই একজন ছাড়া যারা কি না হিতৈষী কাজকর্ম করেন। তবে ওটাকে ওড়ানো বোধ হয় কেউ বলে না, বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। আজ জমি বিক্রি করে দিচ্ছে, কাল আড়ত থেকে মাল গায়েব হয়ে যাচ্ছে, পরশু বাড়ি থেকে টাকা বা মায়ের গয়না উধাও এসব দেখেও কোনো উচ্চবাচ্য হয়নি বাড়িতে হালকাপলকা দুই একবার ছাড়া। সবাই ধরেই নিয়েছিলো হয়তো বা বাউন্ডুলেপনা কেটে যাবে বিয়ের দড়ি পরিয়ে দিলে যেমনটা হয় সচরাচর। মদখোর ছেলে, নেশাগ্রস্ত ছেলে, মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে, শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে, উড়নচন্ডী ছেলে, বদমেজাজী ছেলেÑসে ছেলের ধরন যাই হোক না কেন, একটা বিয়ে করিয়ে দেয়া তার একমাত্র সমাধান, আয়ুর্বেদিক, এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক সমস্ত চিকিৎসা মাধ্যমের একটাই যেন বিধান, ওকে ভাল দেখে একটা বউ এনে দাও, দুদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে। যেন সমস্ত শিকড়বাকড় গাছগাছড়া নিয়ে বসে আছে হাওয়া প্রজন্ম যখন যেটা লাগবে সেই ঔষধ তৎক্ষণাৎ বানিয়ে দেবে বলে। এভাবেই অত্যন্ত সুন্দরী মানে ধবধবে ফর্সা গায়ের রং আর গোলগাল মুখ চেহারার মেয়েটিকে বউ করে আনা হলো এই গুণধর ছেলেকে ঠিক করার জন্য। কিন্তু মান্যবর যে ততোদিনে সহবাসশিক্ষিত হয়ে উঠেছেন আপাদমস্তক, সে খবরটি কারো কাছে তখনও সেভাবে পৌঁছায়নি। নতুন নতুন খনি সন্ধান করে বেড়ায় সে, হোক সে ব্যবহৃত, পুরনো, কিচ্ছু আসে যায় না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আজ এটা তো কাল সেটা চলবে, কিন্তু একই শরীর পরপর দুদিন ঘাঁটা পুরুষ সে নয়। তাতে তার না কি মেজাজ খিঁচড়ে যায়, নিজেকে দেউলিয়া বা পথের ভিখিরি মনে হয়। শরিফুন নেসা প্রথমে তো ধরতেই পারেনি। শুরুর দিকে এমনকি মদের গন্ধও পায়নি। তবে সিগারেটে তার গা গুলিয়ে উঠতো। ভেবেছিলো বলবে। কিন্তু দুদিন যেতেই সে বুঝে গিয়েছিলো মন খুলে কথা বলার মানুষ নয়। ভয়ে বরং সিঁটিয়ে থাকতো সে। কথা হতো দেবর, ননদদের সাথে। আর কথা হতো আলমের মায়ের সাথে। ভাবী ডাকতো বটে কিন্তু তার কথা শুনে কেমন যেন আক্ষেপ আর খোঁচার মিশেল মনে হতো। বাড়ির লোকেরা বারণ করতো তার সাথে এতো কথা বলতে। এমনকি তার ছেলে আলমের এখানে আসা বারণ ছিলো। বাচ্চা ছেলে কি দোষ করেছে বা অন্য কোনো হেতু জানার চেষ্টা করেও জানতে পারেনি তখন যেটা বিয়ের বছর পাঁচেক পর চমকে উঠে নিজেই বুঝে গিয়েছিলো সে একবার পুকুরের পাড়ে তাকে দাঁড়ানো দেখে। এতো মিলও হয়! নদীর পাড় ভাঙার শব্দের মতো তার হৃৎস্পন্দিত হতে থাকে; যে না শুনেছে সে কখনোই বুঝবে না কতটা গুমোট, ভয়ঙ্কর, ধ্বংসাত্মক সে আওয়াজ। তার মাঝ দিয়ে কুন্ডুলি পাকিয়ে উঠে আসছে আলমের মায়ের সুদীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস। পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যায় তার। এতোদিন ধরে যে গুঞ্জনের আবছায়া অন্ধকার ঘিরে রেখেছিলো তার চারপাশ, সব যেন ঝরনার জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে দেখা দিলো তার সামনে। চোখের জল, মুখের মানচিত্র, ঠোঁটের কার্নিশে ঝুলে থাকা শব্দ, বক্র হাসিÑসব তার কাছে অবোধ্যতার জাল পেরিয়ে মিলে যাওয়া রেওয়ামিলের খাতা হয়ে উঠলে তার নারীত্বে প্রবল আঘাত অনুভূত হয়। ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যায় তার আত্মসম্মানবোধ। আর স্বপ্ন? সেটা ছিলো কি না আদৌ, বলতে পারে না। বিবাহিত জীবন তাকে খাওয়া পরার নিশ্চয়তা দিয়েছে শতভাগ, তার মা বাবা ভাই বোনদের বাঁচিয়েছে দারিদে্র্যর ন্যাংটো বাস্তবতা থেকে। অতএব ফিরে যাওয়া চলবে না তার কোনোমতেই। তার জীবনে ভিন্ন সুযোগের, অন্য কিছুর সমস্ত দরজা, জানালা এমনকি ঘুলঘুলি পর্যন্ত বন্ধ। সাড়ে তিন জন ছানাপোনা, যে ভ্রম্নণ বেড়ে উঠছে তার অভ্যন্তরে সেটা সহ সে কোনো রাস্তা খোলা পায় না এবং নিশ্চিত জানে বাবা মাকে বললেপুরুষ মানুষ এট্টু এরাম করতিই পারে। তার জন্যি সংসার ছাড়তি হবি? আর তারে ধইরে বাইন্ধে রাহার দায়িত্ব তো তুমারইজাতীয় কিছু কথা বলে দেবে। কিন্তু খুব কেঁদেছিলো সেদিন সে। কেউ বোঝেনি কারণ, আর যার বোঝার কথা সে জানতেও চায়নি এবং এটাকেই সে নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে। পলিমাটির মতো উর্বর জরায়ুতে বীজ পড়লেই সে ফল দিয়েছে। বাচ্চা জন্ম দেয়া যেন প্রাত্যহিক কাজকর্মের মতোই, চাপ আসলেই বসে পড়ো, আর বসে পড়লেই বের হয়ে আসা। তার অমন লম্বা কালো ঘন চুল কেমন করে মাত্র কয়েক বছরেই ধান কেটে নিয়ে আসার পর জমির মতো অনুজ্জ্বল, রিক্ত, শূন্য হয়ে পড়লো, কেউ খেয়াল করেনি। সে নিজেই কি তা লক্ষ্য করেছে? দিনের বেলা হাজার কাজে ব্যস্ততাছেলে দাঁড়িয়ে অজায়গায় হিসু করছে তো মেয়ে ডাকছে পায়খানা পরিষ্কার করে দিতে, কাঁথা ভেজাচ্ছে একটা, খাবারের জন্য কাঁদছে একটা, মারামারি করছে দুটো, সবার খাওয়া তৈরির তোড়জোর চলছে, মুরগী হঠাৎই গামলার উপর দিয়ে ঠ্যাং দিয়ে ডানা ঝাপটিয়ে চলে যাচ্ছে, শ্বশুরকে সরিষার তেল, গামছা, লুঙ্গি এসব এগিয়ে দিতে হচ্ছে, বসার ঘরে লোকজন ভিড় করছে দুইতিনচারনয়দশ করে, চা পাঠাতে হচ্ছে বড় কেটলিতে ভরে, বাচ্চা কোনোটা পুকুরে ঝাঁপ দিচ্ছে তো কোনোটা পাড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, কোমরের কালো সুতো একটার পড়ে যাচ্ছে তো অন্যটা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, তড়িঘড়ি দুপুরের রান্না শেষ করা, বিকেল হতেই উঠোনে মেলা শাড়িকাপড় কাঁথা ওঠানো, হাঁস মুরগী সব খোপে ঢোকানো, তারপর আবার রাতের খাওয়ার আয়োজনÑদম ফেলার যেন সময় নেই তার। আর রাতের বেলা তার তোষক বালিশ কাঁথায় প্রস্রাবের কড়া গন্ধে খানিক ঘুমানোর চেষ্টা, মাঝরাতে হোন্ডার শব্দ শোনা গেলে নীচে গিয়ে দরজা খুলে দেয়া, মদের গন্ধে আঁচলে নাক চেপে ধরা, আর কখনও দম বন্ধ করে মোটা শরীরের নীচে দুই পা ফাঁক করে শুয়ে থাকা, উঠে গেলে কোমরের কাছে উঠে থাকা শাড়ি পেটিকোট নামিয়ে দুই চোখ বেয়ে নেমে আসা জলের ধারাকে বাধা না দেয়া এবং কখনও কখনও ফুঁপিয়ে ওঠাএই তো তার জীবন। আর মাঝে মাঝে যদি সব সারার পর কিঞ্চিৎ থেকেও ঢের কম অবসর মেলে তো দ্বীপের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সেটা যে কেন, নিজেই হয়তো জানে না, জানলেও ভেবে দেখার সময় তার নেই। তবে কখনও কখনও যে ভাবে না, সেটাও নয়। যখন দেখে মোরগ মুরগীর পেছনে দৌড়াচ্ছে, কবুতর বকম বকম করতে করতে ঘাড় ফুলিয়ে পেছন পেছন যাচ্ছে মেয়ে কবুতরের এবং তারপর একটু নরম হলেই পেছন থেকে চেপে ধরছে কার্যসিদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত, তখন তার চেয়ারম্যানের কথা মনে পড়ে যে চোখ বুলিয়ে শরীর দেখে, গতরে কতোখানি মাংশ আছে, বুক কতখানি উঁচু আর পাছা কতটা ছড়ানো; তারপর তার পেছনে লোক লাগিয়ে বাগে আনা এবং কার্যসিদ্ধি করা। আসলে যে চেয়ারম্যান কি দেখে, কি খোঁজে, কিসে মুগ্ধ হয়, বুঝে উঠতে পারে না সে। কেননা শোনা যায় কিশোরী থেকে মধ্যবয়স্ক, কাউকেই না চেখে ছেড়ে দিতে সে নারাজ। মামলা খাওয়ার ভয়ে হোক, কাজ বাগানোর লোভে হোক, বেঘোরে মরার আশঙ্কায় হোক, সে সব বাড়ির পুরুষেরাও রা করে না। তারা হয়তো ভাবে কেউ জানবে না। জানেও না কেউ কেবল কখনও সখনও বাড়ি সে বাড়ি থেকে তাকে গভীর রাতে বের হতে দেখা ছাড়া কিংবা তার বাজারে তার অফিস ঘরে কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দেখা ছাড়া। তা এলাকার চেয়ারম্যান; সে তো আর কেবল পুরুষ মানুষের চেয়ারম্যান না, বিটি ছাওয়ালেরও চেয়ারম্যান। সেবাই তো তার ধর্ম। তো সেটাই তো সে করছে! শরিফুন নেসা মাঝে মাঝে অবাক হয়। তাহলে সে কি একমাত্র উর্বর জমি, আর সব কি কাদরীর সেই পঙক্তির মতোঅনুর্বর উদর’? পরিবার পরিকল্পনার মাঠকর্মীরা বহুবার এসে বলে গেছে লাগাম টেনে ধরতে এবং জানিয়ে গিয়েছে তার পদ্ধতিসমূহ। সঙ্কোচে সে কিছু বলতে পারেনি তাদের। কোনো কোনো রাতে চেয়ারম্যানকে হাজার জড়তা ভেঙে বলতে পারার পর গম্ভীর কণ্ঠের উত্তর শুনেছে, ‘এইসব আজুইরে কথা ছাড়ো বহু পরে বাধ্য হয়ে সে নিজে বড়ি খাওয়া শুরু করেছে। সে ভেবেছে বহুবার কিভাবে তাহলে সে ওরা তারা পেট বাধিয়ে বসে না! তাহলে কি আসলে সবই রটনা? এবং বহু পরে সে বুঝতে পেরেছে পেট হয়েছে আরো অনেকেরও এবং হয়নি অনেকেরই। বহু পরে সে বুঝেছে আলমের মায়ের দীর্ঘশ্বাসের হেতু। বহু পরে সে জানতে পেরেছে কন্যাসম আছিয়াকে কেন হুট করে বিয়ে দিতে হয়েছিলো আর উকিল বাপ সেজেছিলো চেয়ারম্যান নিজে। বহু পরে তার বোধ হয়েছিলো কেন কোনো কোনো কাজের মেয়ে বাড়িতে থাকতে চাইতো না। বহু বহু পরে সে বুঝেছে কেন সুলতানার চোখের চারপাশ কালো দেখেছিলো এক সকালে, পেট চেপে হাঁটছিলো সে, কেন কিছু খেতে পারতো না, কিছুদিন পর কেন সে বাড়ি যাবার নাম করে সব কাপড় গুছিয়ে চলে গিয়েছিলো, আর ফিরে আসেনি। যতো পরেই সে এসব বুঝুক না কেন, একটি ব্যাপার শুরু থেকে জেনে গিয়েছিলো সে যে এর কোনো প্রতিকার নেই আমৃত্যু। বহুবার তার মনে হয়েছে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে শরীরের উপর থেকে, বহু বহুবার তার মনে হয়েছে বটি দিয়ে ঝুলন্ত মাংশপিন্ড কেটে নামিয়ে দিতে; পারেনি। দাঁতে দাঁত চেপে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে সে। কোন ভরসায় সে নিজেও জানে না। কেননা বরাবরই তার মনে হয়েছে সাপের বাচ্চা সাপই হয়। তাই ছেলেমেয়েদের কেউ কখনও তাকে বুঝবে, তার জন্য কিছু করবে, মনে হয়নি তার। 

দুই চোখের সামনে বহু কিছু বদলে গিয়েছে। মেয়েদের কেউ স্কুলের গন্ডি পেরোতে পারেনি। বিয়ে হয়ে আছে এখানে ওখানে। ছেলেদের সবাই বাড়ির বাইরে। অতো জমজমাট বাড়ি এখন প্রায় নিস্তব্ধ, কবরখানায় যোগ হয়েছে গোটাকয় মৃতদেহ, দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়েছে এখানে সেখানে, দড়িতে এখন আর অতো শত কাপড় ঝোলে না। নিজের চুলে পাক ধরেছে তো সেই কবেই। বাতের ব্যথাও প্রকট এখন। চেয়ারম্যানও গোটা কয়েক ওষুধ খায়। কিঞ্চিৎ কুঁজো হয়েছে সে, আগের মতো দ্রুত হাঁটে না। কিন্তু আর কোনো পরিবর্তন হয়নি চেয়ারম্যানের। চেয়ারম্যান যদিও এখন সে আর নেই, কিন্তু লোকে তাকে নামেই ডাকে। চাল, গম, টিন থেকে শুরু করে টাকা কোনো কিছুই যেহেতু নিজের মনে না করে থাকতে পারেনি, ব্যাংকে জমেছে ঢের। আর জমি দখল তো আরো সাধারণ ব্যাপার যেন, হোক সে গ্রামের লোকের বা পরিবারের। সব মিলিয়ে ধনবানই বলা চলে যার চারপাশে মৌমাছির মতো ভনভন করে বেড়ায় সুযোগসন্ধানী নপুংসকেরা। শরিফুন নেসার আগেও কখনও কিছু হয়নি কষ্ট ছাড়া, এখনও না; এখন তো বরং আরো বোধশূন্য, অনেকটা পাথরের মতো, আছে জায়গা দখল করে, কিন্তু লাথি গুঁতো ঝড় বৃষ্টি কিছুতেই তার কোনো অনুভূতি প্রকাশ পায় না। ভেবেছিলো সে, এমন করেই বাকী দিনগুলো যদি পার করে দেয়া যায়। কিন্তু বাড়িতে ভিন গাঁ থেকে আসা নতুন কাজের মেয়ে ফুতরা যখন একদিন সকালে পেটে হাত চেপে হাঁটে, পাজামার ফাঁকা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পায়ের পাতা বেয়ে মেঝেতে পড়ে, গলায় ঘাড়ে আর ডান কানের পাশে যখন জমাট লাল দেখতে পায়, কেন যেন সে আর ধরে রাখতে পারে না নিজেকে। হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে মারতে শুরু করে এলোপাথাড়ি। ইতোমধ্যে হতভম্ব মেয়েটির হয়তো আর বিস্মিত হবার ক্ষমতা ছিলো না, বাধা দেয়ার তো নয়ই। তাই পড়ে পড়েই মার খাচ্ছিলো আর্তনাদ করতে করতে। সারারাত নিশ্চয়ই সে নিজেকে বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করেছে। অমন শক্তপোক্ত বাহুর বন্ধন, হাতের মুঠো, সাঁড়াশির মতো পেঁচিয়ে ধরা পা, পাথরের মতো ভারী শরীর ছুটিয়ে বেরিয়ে আসে তেমন সাধ্য তার কচি আমপাতা শরীরে কই? চিৎকারে জয়নবের মা ছুটে শরিফুন নেসাকে দুই হাতে জড়িয়ে সরিয়ে বিছানার উপর বসিয়ে দিলে কাঁদতে কাঁদতে সে নাকফুল খুলে ফেলে হেঁচকা টানে, ছুঁড়ে ফেলে যত দূর সম্ভব যেন এটা দূরে সরালেই সমস্ত অপমানবোধ তার ধুয়ে মুছে যাবে। সাতাশ বছর ধরে বয়সী বটগাছের মতো যা নাকের উপর দিয়ে গিয়ে ভিতর দিয়ে অন্যপাশে আটকে আছে, উপর থেকে যে ফুলটা ঠিক ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে, এক নিমেষে আজ সে তা উপড়ে ফেলে শিকড়সহ যেন এক বিষবৃক্ষ। হ্যাঁ, ব্যাঙের ছাতাই তো! সেটা বই অন্য কি সে? আর এই যে সম্পর্কের জাল, বিষবৃক্ষ ছাড়াই বা আর কি? ঘৃণায় সে কুঁচকে ওঠে বারবার। আবারও নারীত্বে তার প্রবল আঘাত লাগে। হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা চতুর্থবার। কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না সে। শরীর কাঁপে, চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় নামে নোনাজল। অন্ন বস্ত্র আর মাথার উপর ছাদ আর সব মিলিয়ে একটা পরিচয়, চেয়ারম্যানের বউ, তার জন্য এতোটা ছোটো হওয়া সে যেন আর মেনে নিতে পারছিলো না। লুঙ্গির নীচের বাম প্রান্ত বাঁ হাতে ধরে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা চেয়ারম্যান পা ঘষটে যেতে যেতে বলেএতো ন্যাকামি করলি বাপের বাড়ি গিয়ে করুকগে। এহেনে এসব চলবি না। উনি নতুন যেনো সব দেখতিছে।মেঝে থেকে নাকফুল আর তার পেছনের অংশ কুড়িয়ে হাতের তালুতে রেখে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে জয়নবের মা বলেতুমি তো বউ তাও এইডে পাইছো। চাইয়ে দেহো দেহিনি আমার দিকি! দেহো তো মাইয়েডার দিকি! কি পাইছি আমি! কি পাবেনে ? নেও, এইডে পইরে নেও দেহি। মাইয়ে মানষির অতো রাগ করলি চলে না।সম্বিৎ ফেরে হয়তো শরিফুন নেসার। তিনটি বুকের ভিতর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস যেন বোধ ফিরিয়ে দেয় সবার। চোখের জলে ঝাপসা দৃষ্টিতে ঘরের কোণে পড়ে থাকা ফুতরার মায়াবী মুখখানা দেখতে দেখতে জয়নবের মায়ের হাত থেকে আবার তুলে নেয় নাকফুল সে। 


Related Posts