সংসদে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধনী) বিল পাশ || একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হয়নি
ডয়চে ভেলে প্রতিবেদনঃ জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধনী) বিল—২০২৬। জামায়াতের সদস্যদের উপস্থিতিতে বিলটি পাস হয়ে আইনে পরিণত হয়। তবে এই বিলের বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ভালো জানেন ৭১ সালের এই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহতালা তার নিখুঁত পূর্ণাঙ্গ একমাত্র সাক্ষী। আমরা যারা আছি, তারা আংশিক সাক্ষী।’ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। সংশোধিত এ আইনে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনটিতে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষায় হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের সহযোগী রাজাকার, আল—বদর, আল—শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।
আমির তার বক্তব্যে আইনে নানা দলের নাম অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে আপত্তি জানালেও, কণ্ঠভোটে জামায়াতের কোনো সংসদ সদস্যই ‘না’ বলেননি। উল্লেখযোগ্য বিষয়, জামায়াতের নির্বাচনী জোটসঙ্গী এনসিপি স্পিকারের মাধ্যমে লিখিতভাবে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছে, এই আইন বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
২০২২ সালে জামুকা আইনে মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা হিসাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসাবে রাজাকার, আল—বদর, আল—শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে আইনটি সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করলেও, এই অংশটুকু বলবৎ থাকে।
তবে ২০২৬ সালে নির্বাচিত সংসদে, বিশেষ করে সেই সংসদেই জামায়াতের ৬৮ সদস্যের উপস্থিতিতে, এটি আইন হিসাবে পাস হওয়ার ফলে এর গুরুত্ব অন্যরকম বলে মনে করছেন অনেকেই।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ‘সহযোগী’, আইনি ব্যাখ্যা
জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, এটা দলটির শীর্ষ নেতারাও বরাবরই স্বীকার করেন। তবে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি ছিল অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। কোনো অপরাধে দলটি জড়িত ছিল না বলেও দাবি তাদের।
কিন্তু সদ্য পাস হওয়া জামুকা আইনে বলা হচ্ছে— অন্য নানা বাহিনীর পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধেও মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।
সেক্ষেত্রে, মুক্তিযুদ্ধ যে দলের বিরুদ্ধে হলো, সে দলটি কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারে? এই আইনের মাধ্যমেই কি ভবিষ্যতে দল হিসাবে জামায়াতের রাজনীতির অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হলো?
সাবেক জেলা জজ ও বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহজাহান সাজু ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধী দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা যায় কি না সেই প্রশ্ন তো উঠতেই পারে। কিন্তু এখানে এদের একটা দায়মুক্তির বিষয় আছে। এখন যারা নেতা তাদের তো ওই সময় জন্মই হয়নি। এখন যারা সিনিয়র লিডার তাদের তো বয়সের কারণে রাজাকার হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে এ বিষয়ে আদালতে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে।’
জামায়াতে এমন একজন সংসদ সদস্য আছেন যার ফাঁসির দন্ড হয়েছিল, কিন্তু ৫ আগস্টের পরে ক্ষমতার পালাবদলে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। তাহলে কি ওই যুক্তি চলে? জবাবে ড. সাজু বলেন, ‘তিনি তো আদালতের মাধ্যমে মুক্ত হয়েছেন। ফলে এটা নিয়ে তো আপনি প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। একজনের বিচার তো দুইবার হতে পারে না। আর তিনি তো মূল নেতৃত্বেও নেই। আদালত তো তাকে একটা সিল মেরে দিয়েছে। ফলে আপনি তো তাকে দায়ী বলতে পারবেন না। আর মনে রাখতে হবে, এখন যারা জামায়াতে ইসলামী করেন তারা তো আদর্শের কারণে করেন। এখন আদর্শের কারণে তো আপনি কাউকে মৃত্যুদন্ড দিতে পারেন না। দলের নাম ব্যবহারের কারণেই কি তাদের শাস্তি দেওয়া যাবে? সে সুযোগ তো নেই। তবে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে এটা বলতে পারি।’
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবীর ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘জামায়াতের সংসদ সদস্যরা সংসদে উপস্থিত থাকার পরও এই বিলটি কীভাবে পাস হলো সেটা জামায়াত নেতারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে অবশ্যই সংসদে জামায়াতের উপস্থিতিতে এই বিল পাস হওয়ায় একটা প্রশ্ন তোলার সুযোগ তো থাকলই। এই কারণে আমি আদালতে একটা রিট করেছি, ৭২ সালের মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞার সঙ্গে এখনকার সংজ্ঞার কোন মিল নেই। এটার এখনও শুনানি হয়নি।’
