হিজড়া হলেই ত্যাজ্য? || মনজুর কাদের
বি বাড়িয়া জেলার সৈয়দাবাদ কলেজের ছাত্র রেদোয়ান ইসলাম ৫১ সদস্য বিশিষ্ট একটি বড় দলের আহ্বায়ক কমিটি থেকে ত্যাজ্য হয়েছেন। অপরাধ তিনি হিজড়া। যদিও তিনি ও তার পরিবার জানিয়েছেন যে তিনি হিজড়া নন।
ধরে নিলাম তিনি হিজড়া। তো কী হলো? এটা তার কি অপরাধ যে তিনি হিজড়া হয়ে জন্মেছেন? তার জন্মের জন্য কি তিনি দায়ী? তাছাড়া হিজড়া তো বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত। যদিও তৃতীয় লিঙ্গ— কথাটিতে আমাদের আপত্তি আছে, এটি আরো শ্লীল শব্দে প্রকাশ করাই যাচিত।
মানুষ তার অভিজ্ঞতার বিপরীত কোন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে দুরকম আচরণ করেঃ
একপক্ষ এই বৈচিত্রকে বরণ করে, উপভোগ করে ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আনন্দ লাভ করে।
আরেকপক্ষ বিপরীত যে কোন অভিজ্ঞতাকে বরণ তো করেই না বরং মারমুখী ও হিংস্র হয়ে ওঠে।
আফ্রিকার অনেক জাতি গোষ্ঠী আছে যারা নিজেদের গোত্রের বাইরে কোনো মানুষকেই সহ্য করে না। সেটি শিক্ষা, সামাজিকতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভাবে ঘটে। আমাদের বাড়ির পাশে আন্দামানের দ্বীপগুলোতেও এমন কিছু নৃশংস আদিবাসী বাস করে।
জারোয়া সম্প্রদায় ছাড়াও সেন্টিনেল দ্বীপে কিছু আদিবাসী বাস করে যাদের কাছে মানুষ গেলেই নির্ঘাত মৃত্যু। এদের মধ্যে সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসীরা এতোই নৃশংস যে, কোনো মানুষ বা পর্যটক এদের ধারে কাছেও ঘেষতে পারে না। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে মধুমালা নামের এক নৃতত্ত্ববিদ প্রচুর খাবার ও রসদ বিতরণের পর জীবিত ফিরে আসেন। এতে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তীতে একজন বিদেশী যাজক ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে সাহস করে দ্বীপটিতে গিয়ে আর ফেরেননি। জানা যায়, তাকে হত্যা করে দ্বীপের বালুচরে পুঁতে রাখা হয়েছিলো। একদল নাবিক একটি লৌহ নির্মিত জাহাজে করে একবার দ্বীপটিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলো। পরবর্তীতে ডুবন্ত জাহাজটির অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেলেও নাবিকদের হদিশ পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো ডুবন্ত জাহাজটি ছিলো বাংলাদেশী মালিকানাধীন। ধারণা করা হয়, সেন্টিনেলিরা শিকারের জন্য যে লোহার হাতিয়ার ব্যবহার করে সেসব এই জাহাজের লোহা দিয়েই তৈরি। এসব রোমহর্ষক ঘটনার পর ওই পথ আর কেউ মাড়ানোর হিম্মত দেখায়নি।
অন্য আদিবাসী দল জারোয়ারা পরিস্থিতির কারণে উপর্যুপরি সীমিত জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে এসে কিছুটা নমনীয় হয়েছে বটে তবে এখনো তারা নারী পুরুষ নির্বিশেষে পুরোপুরি উলঙ্গ থাকে ও কাঁচা মাছ মাংস খেয়েই দিন কাটায়। এদের জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসার কাহিনীটাও চমকপ্রদ।
সাতচল্লিশে দেশ ভাগের রোডম্যাপ হলে বাংলাদেশের বরিশাল, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য অঞ্চলের সনাতনী সম্প্রদায় ভারতে আশ্রয় নেয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ভারতের মুল ভূখন্ডে পূনর্বাসনের সাথে সাথে কিছু শরণার্থীকে আন্দামান নিকোবরে পুনর্বাসন করা হয়। এদের পরিবারপ্রতি তিরিশ বিঘা করে ভূমি দিয়ে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়। জনমানবের সংস্পর্শবিহীন জারোয়া আদিবাসীরা তখন পরোক্ষভাবে এই সব পুনর্বাসিত শরণার্থীদের উঁকিঝঁুকি ও ভীরু ভীরু সংস্পর্শে আসার পরিস্থিতি তৈরি হয়। একই বনের ফল ফসল সংগ্রহের প্রয়োজনেই এই পরোক্ষ সাহচর্য শুরু। যদিও এদের তথাকথিত সভ্যতার ছোঁয়া পাওয়ার গতি অনেকটা এক গ্লাস বিশুদ্ধ জলের সাহায্যে একটি এঁদোপুকুর বিশুদ্ধ করার মতোই ধীর। বন্য থেকে সভ্যাতার বিবর্তন কার্যতই ধীর।
কিন্ত সভ্য থেকে বন্য হওয়ার গতি রকেটের গতির মতো। অনেক শিক্ষাদীক্ষা, অনেক অনুশীলন ও অনেক বিধিনিষেধের পরাকাষ্ঠায় যা কিছু সভ্যতা ও সংস্কৃতি বাংলাদেশ অর্জন করেছিলো তা ত্যাগের বিকৃত আনন্দে মানুষ এখন বিভোর।
সারা পৃথিবীতে মানুষ শুধু হিজড়া নয় এলজিবিটিকিউআইআর— এর আওতায় প্রায় দশ রকমের বিচিত্র স্বভাবের মানুষের সন্ধান পেয়েছে। এই সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম বিচিত্র স্বভাবের মানুষের আরও সন্ধান হয়তো পাওয়া যাবে। সভ্য বিশ্ব এসব বিচিত্র স্বভাবের মানুষদের তাদের পছন্দমতো জীবন যাপনের সম্ভাব্য সব সহযোগিতা প্রদান করছে। কারণ এসব স্বভাব এরা শখ করে আয়ত্ত করেনি বরং মানুষের বিচিত্র শারীরিক গঠনশৈলীর জন্যই তারা এসব স্বভাবে থিতু হয়েছে। বিষয়টি পুরোপুরিই প্রাকৃতিক।
এই যে আন্দামানের দুর্ধর্ষ জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হলো, যাদের কাছাকাছি সমতলের মানুষ গেলে আর ফিরে আসে না, তাদেরও সংরক্ষণের জন্য ভারত সরকার সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে যেন এতোটুকু বিঘ্ন না ঘটে এজন্য সমতলের মানুষদের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
প্রকৃতির বৈচিত্রকে সম্মান করতে শিখতে হয়। ভিন্নমত, ভিন্নরূপ ও ভিন্ন আচারের প্রকৃতিকে ধারণ করে নিজের পূর্ণতা অর্জনই সভ্যতা। সভ্যতা অর্জনের দীর্ঘ পরাকাষ্ঠা প্রয়োজন হয়। সভ্যতা বিসর্জন দেয়া এক মুহূর্তের ব্যাপার।
