নিউইয়র্কে বিপা ও ডায়াসপোরার আয়োজনে || অনুভবে অনুরণন ছড়িয়ে দিল আবৃত্তি উৎসব

বাঙালী প্রতিবেদনঃ নামকরণ ‘অনুভবে অনুরণন’, বাস্তবেও হৃদয়ে অনুরণন তুলল। মধুর হলো একটি আবৃত্তিমুখর দিন। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস এবং ডায়াসপোরা ইনক এই আবৃত্তি উৎসবের আয়োজন করেছিল গত শনিবার উডসাইডের পিএস ১২এ। এই উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন নিউইয়র্ক, কানেকটিকাট, নিউজার্সি, ম্যাসাচুসেটস থেকে আসা শিশু থেকে পূর্ণবয়স্ক আবৃত্তিকারবৃন্দ। গোছানো, সুশৃঙ্খল অনুষ্ঠানের পুরোটাই ছিল আবৃত্তিময়। মাঝে কেবল ছিল সংক্ষিপ্ত আলোচনা আর বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তির সাথে নাচ (আংশিক)।

মঞ্চটি সাজানোই ছিল। দর্শকরা মিলনায়তনে ঢুকে একটি সাজানো ড্রইং রুম দেখতে পান মঞ্চে। ঠিক মাঝখানে একটি খোলা জানালা। জানালার ওপারে কাশবন। বিস্তীর্ণ কাশবন ছাড়িয়ে দূরে দিগন্ত। দিগন্তের ওপারে আকাশ। আকাশজুড়ে সাদা মেঘ। ডানে একটি বুকশেলফে কিছু কবিতার বই। বুকশেলফের ওপর ড্রিফউডে তৈরি রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ ভাস্কর্য। ডানে একটি টেবিল ল্যাম্পে আলো জ্বলছে। মঞ্চের বামে অর্কিড। তার পিছনে কবি নজরুলের যৌবনকালের ছবি। আর জানালার পাশে ইজেলে বঙ্গবন্ধুর ছবি।

শুরুতেই শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির পাঁচজন ব্যক্তি প্রদীপ জ্বেলে উদ্বোধন করলেন আবৃত্তি উৎসবের। এই পাঁচজন হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নূরুন নবী, বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম, নৃত্যসারথী লায়লা হাসান, সংগীতগুরু ও শিল্পী সেলিম আশরাফ এবং কৌশিক আহমেদ। তাদের উত্তরীয় পরিয়ে দেন এ্যানি ফেরদৌস ও ডা. প্রতাপ দাস। তারা দুজন সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে তার প্রতিবাদ জানাই। এরই মধ্যে দুই মিষ্টভাষী সঞ্চালক সাবিনা শারমিন ও নাদিয়া ইসলাম দৃষ্টি কথার মালা দিয়ে অনুষ্ঠানের কবিতাগুলো গাঁথছিলেন।

শুরুতেই সবচেয়ে ভালোলাগার সঞ্চার হয়ঃ পাঁচ প্রদীপ প্রজ্জ্বলনকারী যখন রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ও হুমায়ুন আজাদের একটি করে স্তবক পাঠ বা আবৃত্তি করলেন।

উদ্বোধনের পর মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয় শিশুদের আয়োজন দিয়ে। ‘ইচ্ছাডানায় ওড়াউড়ি’ নামের এই পর্বে ৮ শিশু—কিশোর—কিশোরী চমৎকার সমন্বয় করে তাদের পরিবেশনা তুলে ধরে। এই শিশুশিল্পীরা হলো শাফিন রফিক, ফয়েজ আহমেদ ওয়ালিফ, দিব্য মোদক, ওয়ালিজা আহমেদ, জাহ্নবী মজুমদার, আরিশা সজীব, শাহরিন আমরিন, সাফওয়ান ও ফারহানা।

পরের পর্বটি ছিল ‘আমরা ছিলাম, আমরা আছি, আমরা থাকব’ শিরোনামের। বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী হিরা চৌধুরী, আনোয়ারুল হক লাভলু, এজাজ আলম, সাবিনা শারমিন, রুমা মোদক, সোহানি ইসলাম ও কাজী মাহমুদুল হক কবিতা ও গানের সমন্বয়ে চমৎকার আবৃত্তি আলেখ্য উপস্থাপন করেন।

এরপরের পর্বে ৪ কিশোরী চার চরিত্রের চারটি কবিতা আবৃত্তি করে মুগ্ধ করে। নাহরিন ইসলাম আবৃত্তি করে স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো, প্রিয়তা ইমাম মেঘবালিকা, মৃত্তিকা নিমন্ত্রণ ও অদ্বিতীয়া ধর আঞ্চলিক ভাষার কবিতা তেজ।

সুন্দর এই পর্বের রেশ ধরে তিনজন আবৃত্তি করেন রবীন্দ্রনাথের তিনটি কবিতা (মাকসুদ বাপ্পি হঠাৎ দেখা, লায়লা হাসান সাধারণ মেয়ে এবং গোলাম সারওয়ার হারুন আমি)। শেষে ৬ কিশোরী উপযোগী কস্টু্যম পরে কবি কাজী নজরুল ইসলামে বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তির কোরিওগ্রাফির সাথে প্রতিবাদী নাচ পরিবেশন করে। এই কিশোরীরা হলেন আলভিনা রহমান, ফারিবা করিম, শ্রদ্ধা সাহা, অদিতি দে, সামিয়া ইসলাম ও এলমা রুদমিলা।

প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার আগে শিল্পমাধ্যম হিসাবে আবৃত্তির স্বাতন্ত্র বিষয়ে একটি নিবন্ধ পাঠ করেন ড. বিলকিস রহমান দোলা ও আবৃত্তি শিল্প কিনা বিষয়ে বলেন কৌশিক আহমেদ। দর্শক—শ্রোতারা আবৃত্তির মতই নিবিষ্ট আগ্রহে দুজনের কথা শোনেন।

দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথমে বস্টন থেকে আগত টিপু চৌধুরীর নির্মিত একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এই প্রামাণ্য চিত্রের নাম ‘মহাকালের কাব্যে বিপ্লবী কবি’। এরপর টিপু চৌধুরী কবিকে উপস্থাপন করেন।

পরের আয়োজনটি ছিল প্রেম বিরহের কথকতা। এই আয়োজনে আর্য তীর্থ, বুদ্ধদেব বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়. আরণ্যক বসু, মহাদেব সাহা ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আবৃত্তি করেন যথাক্রমে পিংকি চৌধুরী, প্রিয়াংকা ভৌমিক, শারমিন রেজা ইভা, ইসরাত সায়রা মুন, হিয়া সানজিদা ও সোহানি ইসলাম।

পরের আয়োজনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দেশ নিয়ে এই পর্বটির নাম স্বদেশের ঘ্রাণে শব্দের মিছিল। এতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘১৯৭১’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন তাজুল ইমাম, সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ ডা. হাফসা ইমাম, জসিমউদ্দিনের ‘দগ্ধ গ্রাম’ কবিতাটি ফাতেমা খান, শহীদ কাদরীর ‘সব নদী ঘরে ফেরে’ এজাজ আলম, নির্মলেন্দু গুণের ‘রাজদন্ড’ আবৃত্তি করেন মেহেদি ইমাম, সৃজন সেনের ‘মাতৃভূমির জন্য’ আবৃত্তি করেন ডা. পুষ্পিতা রায়, ও বেগম সুফিয়া কামালের ‘পল্লী স্মৃতি’ আবৃত্তি করেন শোয়েব মজুমদার।

‘কণ্ঠে কণ্ঠে দ্রোহের আগুন’ শিরোনামের পর্বে ছিল পাঁচটি কবিতা। হিরা চৌধুরী নূরলদীনের সারাজীবন নাটকে প্রোলগ আবৃত্তি করে মঞ্চে অন্য এক দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেন। নিলুফার জেরিনের কণ্ঠে সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’, গোলাম মোস্তফার কণ্ঠে শামসুর রাহমানের ‘বাইবেলের কালো অক্ষরগুলো’ আর সাবিনা শারমিন ও শ্রদ্ধা সাহার যুগলকণ্ঠে আকতারুজ্জামান আজাদের ‘বাঙালি একটি ফিনিক্স পাখি’ ছিল প্রতিবাদের অনুরণন। এই পর্বের শেষে মায়া এঞ্জেলোর ‘স্টিল আই রাইজ’ কবিতাটি শ্রদ্ধা সাহা আবৃত্তি করে সেই প্রতিবাদকে সর্বজনীন করে তোলেন।

শেষ পর্বের নাম ছিল ‘ছন্দে রঙে অনুভবে’। পাঁচমিশালী কবিতার এই পর্বে আবৃত্তি করেন গাগীর্ মুখাজীর্, সেলিমা আশরাফ, নজরুল কবীর, আনোয়ারুল হক লাভলু, নিলোফার জাহান ও বাহাউদ্দিন পিয়াল। তারা আবৃত্তি করেন যথাক্রমে মল্লিকা সেনগুপ্তের বীরপুরুষের মা, শামসুর রাহমানের আজ কার কাছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয়, বেনজির শিকদারের পিতা, জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের দূরের পাল্লা।

সবশেষে সম্মেলক কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুভবে অনুরণন।

অনুষ্ঠানে কীবোর্ডে কবিতার আবহ বুঝে মিউজিক সংযোগ করেন মাসুদুর রহমান। পুরো অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন এ্যানি ফেরদৌস ও ডা. প্রতাপ দাস। অসুস্থতার কারণে আবৃত্তিকার ও অনুষ্ঠানের অন্যতম তত্ত্বাবধায়ক জিএইচ আরজু যোগ দিতে না পারায় খানিকটা শূন্যতা রয়ে যায়।

Related Posts