নিউইয়র্কে দুর্গা পূজা || আমরা কি ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্য থেকে সরে যাচ্ছি

ড. দিলীপ নাথঃ ১৯৯০ সাল থেকে নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশী হিন্দু সম্প্রদায় অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে, বাংলাদেশ পূজা সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত প্রথম দুর্গাপূজার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল।

সেদিনের সেই ছোট্ট আয়োজন আজ এক বিশাল পরিসরে বিস্তৃত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নতুন সংগঠন গড়ে উঠেছে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের কম্যুনিটির বিকাশ ও সমৃদ্ধির পরিচায়ক। আমার জানা মতে, বর্তমানে নিউইয়র্কের পাঁচটি বরোতে বাঙালি আমেরিকান হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্যোগে প্রায় ৩২টি পূজামন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়।

কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও কিছু বিষয় আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। আমার পর্যবেক্ষণে, কিছু কিছু দুর্গাপূজার আয়োজনে ধর্মীয় চেতনার চেয়ে বাণিজ্যিক প্রবণতা ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভক্তি, শ্রদ্ধা, প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক চেতনার পরিবর্তে কোথাও কোথাও প্রাধান্য পাচ্ছে জাঁকজমক, বিনোদন, প্রচার—প্রচারণা, ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং আর্থিক স্বার্থ।

আমি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত কিংবা বিনোদনের বিরোধী নই। এগুলো আমাদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, দুর্গাপূজা কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, কিংবা লোক দেখানো জাঁকজমকের প্রতিযোগিতাও নয়। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব, যার মূল ভিত্তি ভক্তি, বিশ্বাস, আত্মশুদ্ধি এবং মা দুর্গার আরাধনা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু আয়োজনে পূজার ধর্মীয় তাৎপর্যের প্রতি আন্তরিকতার চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচিতি ও প্রভাব বিস্তারের আগ্রহ বেশি চোখে পড়ে। মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া কিংবা পূজার ধর্মীয় আচার—অনুষ্ঠানে তাঁদের অংশগ্রহণও সব সময় দেখা যায় না। তবে কারও বিশ্বাসের বিচার করা আমার উদ্দেশ্য নয়; আমার উদ্বেগ হলো, আয়োজনের কেন্দ্রে মায়ের আরাধনা ও ভক্তদের স্থান কতটা অটুট থাকছে।

তাই প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই মায়ের আরাধনার জন্য দুর্গাপূজার আয়োজন করছি, নাকি কেউ কেউ আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন?

আমাদের পূর্বসূরীরা নিউইয়র্কে দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন কোনো বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার জন্য নয়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল প্রবাসের মাটিতে সনাতন ধর্মের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা, নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ পৌঁছে দেয়া এবং একটি ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায় গড়ে তোলা।

সেই প্রথম দিনের আয়োজন থেকে আজকের এই দীর্ঘ পথচলার একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে দুর্গাপূজার পবিত্রতা, মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে রক্ষা করার।

আসুন, আমরা আনন্দের সঙ্গে দুর্গাপূজা উদযাপন করি, কিন্তু ভক্তিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করি, কিন্তু ধর্মীয় চেতনাকে উপেক্ষা করে নয়।

মনে রাখতে হবে, দুর্গাপূজা মা দুর্গার, দুর্গাপূজা ভক্তের, দুর্গাপূজা আমাদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের। 

অর্থের চেয়ে ভক্তি বড় হোক, খ্যাতির চেয়ে বিশ্বাস বড় হোক, আর ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পাক ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সমাজসেবা।

জয় মা দুর্গা।

লেখক পরিচিতিঃ ড. দিলীপ নাথ নিউইয়র্কভিত্তিক একজন বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক ও মানবাধিকারকর্মী। তিনি বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক কর্মকান্ডের মূল লক্ষ্য সাম্য, শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সমাজের সার্বিক উন্নয়ন।

Related Posts