বিশেষ রচনা || বার্ধক্যের যন্ত্রণা ও ‘নোবেলের মন পাগলে’
আশরাফ আহমেদঃ এক যুগেরও বেশি আগে ‘পাগলের মন পেয়ালায়’ নামে মস্তিষ্ক নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা জানিয়েছিলাম। এবারের ‘নোবেলের মন পাগলে’ সংবাদটি আপনারা চিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কার নিয়ে খোদ নোবেল কমিটির মুখ থেকেই শুনেছেন। অর্থাৎ নোবেল কমিটি এবার তিন বিজ্ঞানীকে পুরস্কার দিচ্ছেন যাদের আবিষ্কার মস্তিষ্কের অনেক কাজসহ মানুষের মানসিক ও স্নায়বিক চিকিৎসায় অসামান্য অবদান রাখতে পারে। পুরস্কৃত তিনজন হচ্ছেন পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্ন নাগেল নামে জার্মানির দুই বিজ্ঞানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডাইসেরোথ।
আমার আগ্রহের কারণ হলো উপরোক্ত পুরস্কার সংবাদ শোনার এক সপ্তাহ আগে মস্তিষ্কের অসহযোগিতা নিয়ে ‘বার্ধক্যের যন্ত্রণা’ নামে আমি একটি গল্প লিখেছিলাম। এক বন্ধুকে দেখালে তিনি প্রশংসামূলক সার্টিফিকেটও দিয়েছিলেন! তাছাড়া এই সংবাদের ঠিক আগের দিন আমার বাসায় জড়ো হওয়া অতিথিরা মস্তিষ্ক নিয়েই এক বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় মেতে ছিলেন। অনেক সাম্প্রতিক ঘটনা বেমালুম ভুলে গেলেও আমাদের মস্তিষ্ক সুদূরের ঘটনা কীভাবে ছবির মতো সব ধরে রাখে সেই রহস্য নিয়ে কথা বলছিলেন।
আবিষ্কারের গল্পটির শিকড় দেড়শত বছরেরও আগে, অবহেলিত পচা পুকুরে যখন ভাসতে থাকা ক্ষুদ্র শৈবালকে আলোর দিকে অথবা দূরে সরে যাওয়াটি লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পুকুর বা জলাশয়ের উপরিভাগে খুব পাতলা সবুজ পদার্থের স্তর নিশ্চয়ই দেখেছেন, অনেক সময় যা গায়ে লেগে যায়। এখন মাছের খাবার হিসাবে ব্যবহৃত হলেও পদার্থটিকে পুকুরের আবর্জনা বলে এখনও বিবেচিত হয়। এই সবুজ পদার্থের একটি হচ্ছে ক্ল্যামিডোমোনাস নামে অতি ক্ষুদ্র এক ধরনের শ্যাওলা। এই শ্যাওলার ধর্ম হচ্ছে আলোর দিকে অথবা বিপরীতে ছুটে যাওয়া, ইংরেজিতে যাকে ‘ফটোট্যাকটিক একটিভিটি’ বলা হয়, যা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় শিখেছিলাম।
গত শতাব্দীর নব্বই দশকে জার্মানীর বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান এই শ্যাওলার একটি প্রোটিন শনাক্ত করেন যেটি যা আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত করে। সংকেত পেয়ে শ্যাওলাটি আলোর দিকে ধাবিত হয় বা দূরে সরে যায়। পরে তিনি এই প্রোটিন তৈরির তথ্যসম্বলিত জিন—কেও শনাক্ত করেনÑ জিন না থাকলে প্রোটিনও উৎপন্ন হয় না।
পরবর্তী ধাপের জন্য বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান জার্মানীর আরেক বিজ্ঞানী গেয়র্ন নাগেলের সাথে জোটবদ্ধ হলেন। দ্বিতীয়জন ছিলেন দেহকোষের ভেতরে থাকা এক ধরনের অতিক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ বা ‘আয়ন চ্যানেল’ বিশেষজ্ঞ। হেগেম্যানের দেয়া শৈবাল—জিনটিকে বিজ্ঞানী নাগেল ব্যাঙের ডিমে রোপন (ঢুকিয়ে) করলেনÑ অনেকটা মাটিতে বীজ রোপন করার মতো। একক কোষ হিসাবে ব্যাঙের ডিম বেছে নেয়ার কারণ আকৃতিতে সেটি অন্যান্য প্রাণীর ডিমের চেয়ে অনেক বড়, ফলে তাতে কিছু ঢোকানো সহজ। কিছু সময় পর তিনি দেখলেন যে সেখানে ক্ল্যামিডোমোনাস শৈবালের প্রোটিন তৈরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, নতুন উৎপাদিত প্রোটিনটি একটি অতিক্ষুদ্র ‘আয়ন চ্যানেল’ সুড়ঙ্গও সৃষ্টি করেছে। তাতে আলো ফেললে সুড়ঙ্গের এক দিক থেকে অপরদিকে ধনাত্বক কণা (চড়ংরঃরাবষু ঈযধৎমবফ চধৎঃরপষব) প্রবাহের ফলেই বৈদ্যুতিক সংকেতের সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীরা প্রোটিনটির নাম দিলেন ‘চ্যানেল—রডোপসিন’ (ঈযধহবষ—জযড়ফড়ঢ়ংরহ), বাংলায় যাকে ‘সুড়ং—রডোপসিন’ বলা যেতে পারে।
এই সংবাদটি বৈদ্যুতিক গতিতে ইউরোপের জার্মানি থেকে শুধু আটলান্টিক মহাসাগরই পাড়ি দিল না, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব তীর থেকে প্রায় তিন হাজার মাইল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পশ্চিম তীরে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে পৌঁছালো। সেখানে কর্মরত ছিলেন কার্ল ডাইসেরোথ নামে যুব বয়সের এক নোরোগ বিশেষজ্ঞ। মানুষের মস্তিষ্কে রয়েছে ৮,৬০০ কোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরন। মানুষের আচরণ, আবেগ ও মানসিক রোগের সঙ্গে মস্তিষ্কের কোনো কোনো স্নায়ুকোষ এবং তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের সম্পর্ক রয়েছে, সেই রহস্য তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। তিনি উপলব্ধি করলেন, আলো দিয়ে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে সক্রিয় করতে পারলে তাদের কাজ সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য পাওয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরোথ জ্যান্ত মানুষের বদলে গবেষণাগারে জন্মানো ইঁদুরের স্নায়ুকোষে শৈবালের জিন রোপন ও চাষ করে দেখালেন যে সেখানেও ‘চ্যানেল—রডোপসিন’ সৃষ্টি হয়। তাতে আলো ফেললে বৈদ্যুতিক সংকেত সৃষ্টি হয়। এভাবে জিন রোপন ও চাষ করে আলো দ্বারা উত্তেজিত করাকে নতুন একটি নাম দেয়া হলো অপ্টোজেনেটিক্স (ঙঢ়ঃড়লবহবঃরপং)। ইংরেজি ঙঢ়ঃড় শব্দের অর্থ আলো, আর এবহবঃরপং শব্দের অর্থ জিন—সম্পর্কিত। তা থেকেই অপ্টোজেনেটিক্স।
এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা মস্তিষ্কের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অভাবনীয় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিল। এই পদ্ধতিতে গবেষকেরা ভয়, ক্ষুধা, স্মৃতি, ঘুম, চলাচলসহ মস্তিষ্কের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুকোষ ও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ শনাক্ত করতে পারছেন। এমনকি আলঝেইমার, পারকিনসন ও বিভিন্ন মানসিক রোগে এসব স্নায়বিক পরিবর্তনের ভূমিকা বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। লক্ষ্য করুন, পাগলরাও কিন্তু মানসিক রোগী।
কিন্তু পাগল হলেও কোন রোগী তুচ্ছাতিতুচ্ছ শৈবালের জিন ঢোকাতে স্বেচ্ছায় নিজের মাথাটি বাড়িয়ে দেবে? ইতোপূর্বেই অন্যান্য বিজ্ঞানীরা মানুষের আচরণগত অনেক রোগই ইঁদুরের দেহে সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। মানুষ ও ইঁদুরের অধিকাংশ জিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য রয়েছে। মস্তিষ্কের মৌলিক গঠন ও স্নায়বিক কার্যপ্রণালিতেও অনেক মিল থাকায় ইঁদুর স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় বহুল ব্যবহৃত প্রাণি। অন্যান্য বিজ্ঞানীরা তাই মানুষ—রোগীর চিন্তা বাদ দিয়ে ইঁদুর—রোগীকে নিয়ে পড়লেন। অপ্টোজেনেটিক্স পদ্ধতি প্রয়োগ করে ইতোমধ্যেই তাঁরা বেশ কিছু বিশেষায়িত স্নায়ুর সাথে ভয়, খিদে, স্মৃতি, পারকিন্সন রোগ, ইত্যাদির সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সংবাদটি হচ্ছে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে জন্মান্ধ ব্যক্তি জীবনে প্রথমবারের মতো চোখে দেখতে পেয়েছেন।
এ বছরের নোবেল পুরস্কার কমিটির প্রধান তাঁদের ঘোষণায় তাই বলেন, ‘অপ্টোজেনেটিক্স মস্তিষ্কের মানচিত্র আঁকার এমন এক সুযোগ করে দিয়েছে যা এর আগে আমরা শুধু কল্পনাই করতে পারতাম’।
তা পুরস্কারটি নিয়ে আমার এতোসব বলার কারণ কি? সম্প্রতি নিজের মতো বয়স্কদের মস্তিষ্ক নিয়েই আমি বেশ ঝামেলায় পড়েছি এবং তা নিয়ে একটি গল্পও লিখে ফেলেছি। ধৈর্য থাকলে আজকের সাপ্তাহিক বাঙালীর ৭ পৃষ্ঠায় আপনারা সেটি পড়ে দেখতে পারেন।
১৭ অক্টোবর, ২০২৬
