লালন নূরের কবিতা

কদম ফুলের মেটাফোর

বর্ষাকালের কুণ্ঠা খুলে ছড়িয়ে পড়ছি গাঢ় কদমের ফুল। রক্তভেজা কলাগাছ কেটে বানিয়ে নিচ্ছি গূঢ় সম্পর্কের আন্তরিক ভেলা। উড়ন্ত বিমানের বিষণ্ণতা দেখে হাসিমুখে চাষ করছি রাজনৈতিক খেত। আলাপের ভাঁজে ফুটে আছে উচ্ছ্বাসের ময়ূর। প্রতিটি শব্দের মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গা, তার ডালে বসে হাসে বসন্তের কোকিল। দ্বন্দ্ব মেটানোর প্রস্তাব নিয়ে রঙিন আঁচলে তুমিও বাজাও অঢেল পররাষ্ট্র। 


এদিকে আমিও তোমার খোঁপায় পরিয়ে দেয়ার ছলে কদমফুলের মেটাফোর হয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছি রক্তাক্ত সার্কাস! 


হাঁটতে হাঁটতে বর্ষাকাল

মনে হয় একটা শব্দের ভিতর আরেকটা শব্দ ঢুকায়ে দেই; একটা বাক্যের মধ্যে আরেকটা বাক্য। জংধরা লোহার রড দিয়ে শব্দ ও বাক্যদের পেটাই, সাথে তাদেরও। তুমি নিজের ইচ্ছামত এর অর্থ তৈরি করে নাও; কিংবা অনর্থ! এই অর্থ ও অনর্থের ভিতর যে সম্পর্ক, সেটা যেন একটা বকরির লেজমার্কা বিচার বিভাগÑ সত্যকথার মুখে ছড়ায়ে দিচ্ছে বাঁকানো ঘটনার লাঠি লজেন্স। 


চোখের বর্ষায় ভিজে যাচ্ছে দৃষ্টি ও দৃশ্যের আড়াল। তোমাকে সহ্য করতে গিয়ে হজম করছি বিষাক্ত সুশীলের কামড়! 


হাঁটতে হাঁটতে রক্তমাখা বর্ষাকালে ডুবে যাচ্ছি আমি, আর তুমি আম কুড়ানোর ভান করে ডোরাকাটা হাততালি হয়ে বেজে উঠছো রঙিন মঞ্চে।  


তোমার ঘরের চালের বৃষ্টির পানি

দিন পার হলে রাত। শূন্য ও চিহ্নের ভিতর জেগে আছে উচ্চতর দৃশ্যের বাস্তবতা। লোহা ও পাথরের শহরে পাহারা দেয়া অন্ধকার! বিবর্ণ কোন গ্রামের মলিন বিকালের কোলে বসে আছে ক্ষণিকের হাট। হাট ভেঙে গেলে সন্ধ্যার লালের সাথে সখ্য গড়ে তোলে বাড়ির দিকে ফিরে যাওয়া কুপির আলো। 


হাট ভাঙার পর হঠাৎ নেমে আসে অতি সাধারণ বৃষ্টিপাত। 


এখন তোমার দালান ঘরের টিনের চালের পানি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমার ঘরের মাটির দেয়াল। 


তোমাকে জড়িয়ে ধরে

এক ফুটের অধিক নরীহ বরফ বুকে নিয়ে আমাকে ডাকছে শীতল ড্রাইভওয়ে— 


বরফ ক্লিন করতে গিয়ে দেখি, চারিদিকে শুধু সাদাÑসবকিছুই সাদা। কোনটা যে ফুল আর কোনটা যে পাতা, বুঝে উঠতে পারছি না। অনেক বাড়িওয়ালা অচল স্নো ব্লোয়ার দেখে চোখে জমা করে রাখে হলুদ বাতাস; কিছুতেই সেটা স্টার্ট নিচ্ছে না! ফলে বিবর্ণ মুখ নিয়ে তারাও সাদা রঙের বরফের সাথে মিশে গেছে। শীতের গ্লাভস উপেক্ষা করে অতিঋণাত্মক ফারেনহাইট তাপমাত্রা ফুটা করে দিচ্ছে দুই হাতের নিথর আঙুলের মাথা। 


এখন তোমাকে জড়িয়ে ধরেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না আমার ঠাণ্ডা লাগছে, না লাগছে না! 


পাতলা ঘুমের ভাঁজে

ফিরতি পথের ঢালে পড়ে আছে বাড়ি ফেরার ফাঁপর। তোমার আসার কথা মনে করে বাজে স্বপ্নসাইকেলের বেল। তবু পরস্পরের মাঝে শীতের দূরত্ব মোড়ানো ক্ষণিক দুপুর! তবু ভালো এই ফুল হাতা শীতÑ বিরহ ভাঙার চিহ্ন। ওমের নদীর ছলে তোমাকে গোলাপ ভেবে ছুঁয়ে ফেলি ধান। অশ্রু ও আগুনের আস্থা নিয়ে পড়ে আছে কম্পিত পাতার ছায়া। পেঁয়াজ রঙের শাড়ির বাতাসে ফুটে আছে গ্রাম, জংধরা সেফটিপিনের সহজ দুঃখ। চরের বালুতে চকচক করে স্থির জোছনার সান্ধ্যনাকফুল। বিব্রত স্বপ্নের পর স্যাঁতস্যাঁতে ছবির সজল ঘোড়া তীব্র ছুটে যাচ্ছে ইতিহাস প্রসিদ্ধ পুরাতন দেয়ালের গায়ে। 


পাতলা ঘুমের ভাঁজে নির্বোধ ভাঁড়ের খেলনাযুদ্ধের ঘটনাগুলো তোমার মুক্তির গান গাইতে গিয়ে সুর ভুলে বসে আছে।


তোমার অট্টহাসির শব্দে

তীব্র ফুটে আছে কাঠগোলাপের শীতকাল! বোমা ও বন্ধুকের উসকানি নিয়ে গোলাপের গাছে ফুটে আছে গোলা ও বারুদের হাতছানি! তোমার উঠানে পাশাখেলার পৌষ মাস। ছাতার ছায়ায় অনুরোধের আসরে গলা ফাটিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জাতিসঙ্ঘের ভাঙা রেডিও। শীতের বেড়ার ফাঁক গলে রক্তাক্ত ঢেউ ছুটে আসে বুকের নদীতে। কাঠগোলাপের বিন্যাসে জেগে থাকে নতুন গানের আগুন!  


এই আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে বাঁশি বাজাও তুমি; তোমার অট্টহাসির শব্দে পুড়ে যায় মৌন রোম।  

Related Posts