যা দেখেছি যা বুঝেছি—৩২ || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত
স্ত্রীচরিত
এত কষ্ট করে ঘরবাড়ি সম্পত্তি করলাম ‘আমি’, বিয়ের পর সবকথায় বলতে হবে ‘আমাদের’ এটা—ওটা। ভুলেও ‘আমার আমার’ করা যাবে না কোনোকিছুতে। আয়—রোজগারের ব্যাপারে একদিন মতামত জানতে চাইলাম, বলে, ‘যা ইচ্ছা তাই করোÑদায়—দায়িত্ব তোমার, আমি বাবা এসবে নাই। পাপ—পুণ্যের ভাগীদার কেন আমি হব।’ কিন্তু আমার কষ্টার্জিত অর্থ—সম্মান—গৌরবের বেলায় তার অংশীদারিত্ব আমার চেয়েও বেশি। পদ—পদবির কারণে যেটুকু সম্মান আমার, দাবির বেলা বরং বেশিই চাই তার: আমি সচিবের স্ত্রী না, আমার সাথে পাল্লা দেয়! ...আমি কেন রান্না করব? ঠিকমতো চাকরি করো, আমার ছেলেরা পড়াশুনাটা যেন শেষ করতে পারে।
আমার বাড়ির যে যা—ই বলে, বাঁকা চোখে দোষ ধরে, ওদের বাড়ির সবাই ‘ঠিক’ বলে। বাপ—চাচা—ফুফুদের উদ্দেশ্য করে বলে, অ, এতক্ষণে/এতদিনে বুঝলাম ছেলে/মেয়েটা ‘এই’ (মন্দ) স্বভাব কোথায় পেল। তাইতো বলি, ছেলে কেন এরকম হল! আমার কোনো দোষ নাই, তুমিই তাকে লাই দিয়ে...। ছেলে/মেয়েটা তোমার ‘এই’ দোষ পেয়েছে। আমার মামা—খালা ও দুলাভাইয়েরা কত ভাল, তাও তুমি ‘দেখতে’ পারো না। আমার কাজিন ও ভাগনে—ভাগনি কত লক্ষ্মী, তোমাদের ওদের মতো নয়।
সংসারে মনের মতো বউ হয় অনেকের, স্বামী হয় না কখনো কারো (মেয়েটা ‘বোকা’ হলে ব্যতিক্রম হতে পারে)। একজন পুরুষ নিজেকে কখনো কখনো পূর্ণ—তৃপ্ত—সুখী মনে করে। নারী কোনোদিন কোনোভাবে শতভাগ তুষ্ট/সুখী হয় না। ‘দেখেছো, কত সুন্দর ম্যারেজ—ডে করল। ওরা আমার চেয়ে সুখী...দেখো ওরা কতো সুখে/ভাল আছে।’ কী পেয়েছে সেটার কথা নেই, কী পায়নি তা নিয়ে খেঁাটার শেষ নেই।
শুধুই প্রশংসা চায় স্ত্রী। সম—আলোচনা নয়, অসম—আলোচনায় গুণকীর্তন করতে হবে তার। নারীর মন নিক্তি/তুলাদন্ডের মতো, একরত্তি কিছু পড়লেই ঐদিকে কাৎ হয়ে যায়। মন্দ বলা দূরে থাক, প্রশংসায় ভাল বললেও রক্ষা নেই, ‘যাক, বিয়ের Ñবছর পর স্বীকার করলা যে,...। এতদিনে তোমার মুখে একটা ভালকথা শুনলাম।’ একটু প্রশংসায়ই গলে মজে পটে যায় কিন্তু ভুলেও যদি কেউ বলে, এটা ভাল/সুন্দর হয়নি, তার অবস্থা কেরোসিন। যাব কোথায়Ñ‘সুন্দরী’ বললে দেমাগ চড়ে যায়, না বললেও অভিমানে ফেটে যায়।
আর চায় পরচর্চার জন্য একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী। যখন বলি, থাক ওসব, তখন বলে, ‘তোমার তো সময় নাই আমার কথা শুনার’Ñএই হল সাধারণ অভিযোগ। ছেলে—মেয়েকে, ভাই—বোনকে, দেবর—ননদকে, বান্ধবীকে বেছে নেয় অন্যের ‘গল্প’ শুনাতে। নইলে তার হজম হয় না ‘কথা’।
চাপে রাখার কৌশল হিসাবে প্রি—অ্যাম্টিভ অ্যাটাক করে, বলে, ‘আমাকে তো তুমি বিশ্বাস করো না, ভালবাসো না। তুমি আমাকে এতদিনেও/কোনোদিন বুঝলা না।’ সুযোগ পেলেই বলে, ‘তুমি তো আমার কথা শুনবে না, সারাজীবনই শুনো নাই। আল্লাহ এই রাখছিল আমার কপালে। তুমি তো চাও আমি মরে যাই, আমি মরলেই তোমার নিস্তার, তোমার শান্তি। আমি মরলে বুঝবা।’ স্ত্রীজাতির আছে তিনটি মারণাস্ত্র যার একটিও স্বামী বেচারার নাই: চোখের পানি, কণ্ঠস্বরের বিচিত্ররূপ, বিকৃতমুখের ‘ছি ছি ছি’ ধ্বনি।
নারী চায় নিরাপদ নিরুপদ্রপ একান্ত তার নিজস্ব একটি নীড়, সেই নীড়ে থাকবে তার সন্তান, বড়জোর এক কেবলা কামলা স্বামী। স্বামী এখানে উপকরণ, প্রয়োজন নয়। বিয়ের মাধ্যমে নারী পায় একটা আনলিমিটেড লাইসেন্স: জোর খাটানোর, ঝগড়া—বিবাদ করার নিরাপদ বর্ম। সজোরে তাই স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘বিয়ে করেছো না?’ আমার জগৎ আমার, কোনো হস্তক্ষেপ করবা না। তোমারটা দেখার অধিকার আমার আছে, আমারটা নয়।
কোনো পুরুষকে হ্যান্ডসাম বলা যাবে কিন্তু কোনো মেয়েকে সুন্দরী বলা যাবে না। পুরনো স্বামীকে আর আবেগ দিয়ে ভালোবাসে না কিন্তু দুচোখ দিয়ে কঠিন পাহারায় রাখে, ‘গরু’ যেন ছুটে না যায় বাঁধ ছিঁড়ে। সে যদিও সারাদিন আবুলকে ডাকে কিন্তু আমাকে বলে, ‘বাসার বুয়ার সাথে ঘরের পুরুষ কথা বলতে হয় না, ছি! ওকে তোমার কিছু বলতে হবে না, যা বলার আমি বলব। ...অহ্, আমার সাথে কথা বলার সময় নাই তোমার, অই মেয়ের সাথে তো দেখি ঠিকই হেসে গলে কথা বলে যাও। এতকথা কীসের ঐ মহিলার সাথে? ...অ্যাকাউন্টেন্ট সাব তার বউকে এত্ত ভালবাসে, এত্ত তোয়াজ করে। আর আমার জামাই আমাকে কোথ্থাও নেয় না, কিচ্ছু কিনে দেয় না। উনি কত্তো আদর/সুন্দর করে বউকে ডাকে: পা—র—ভী—ই—ন! আর তুমি শুধু ঝামটা দিয়ে চিল্লাও: রইমা!
নারী কেন ভাল বস্ হয় না? নারী বসের অধীনে আরেক নারী সানন্দে কাজ করতে চায় না। কর্তৃত্ব কেন ধরে রাখতে পারে না দীর্ঘদিন? কারণ তীক্ষèভাবে একচোখা কর্তৃত্বপরায়ণ বলে তার কর্তৃত্ব ধ্বসে পড়ে। নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারে নাÑকাউকে হয় ভালোবাসে, নয়তো অবজ্ঞা—অবহেলা করেÑদুটোই অন্ধভাবে। আমার উনির অভিযোগ: তোমার জ্বালায় ‘ম্যাডামগিরি’ করতে পারলাম না!
রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রটোকলে পত্নীগণ পদবীতে একধাপ উপরে। আমি যখন উপসচিব, উনি তখন যুগ্মসচিব। আমি যখন লাখপতি, তার চালচলন কোটিপতির। সামাজিকভাবে সে মিশবে উপরতলার সাথে সানন্দে, নীচের কারো সাথে নয় সহজে।
দেশ—বিদেশ ঘুরে এতসব দেখে ভাবছি: নর বা নারী, ভোগের আসক্তি কার বেশি? সুযোগ পেলে নারীই বেশি ভোগ করতে চায়: যৌনতা ক্ষমতা বিলাসিতা মত্ততা। পৃথিবীর অধিকাংশ নারী প্রকৃতিগতভাবে ভোগবিলাসী, সুতরাং বেহিসাবী অদূরদর্শী। একটা আধুনিক পরিবারে সাধারণভাবে স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর খরচ বেশি কিন্তু সেকথা ঘুণাক্ষরেও বলা যাবে না। নারীর উপহার হল ‘টোকা’ (প্রভোকেশন), যার অর্থ হল: আমাকে আরো দাও।
স্বচ্ছল স্বামীর বেকার স্ত্রী সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে, সময় কাটানোর জন্য উদ্ভট চিন্তা পরিকল্পনা করে। কর্মজীবী অর্থোপার্জনকারী নারীর গৃহস্থ স্বামী থাকে ভয়ে তটস্থ।
