গভর্নর্স আইল্যান্ডে বাংলাদেশী শিল্পীদের চিত্রপ্রদর্শনীতে || ইমিগ্রেশন ও স্মৃতি নির্মাণ করছে নতুন শিল্প

. জীবন বিশ্বাসঃ নিউইয়র্ক হারবারের জলরেখায় আগমন প্রস্থান, সামরিক ইতিহাস, ইমিগ্রেশন এবং নতুন করে আত্মপরিচয় নির্মাণের বহুস্তর স্মৃতি জমা হয়ে আছে। সেই ইতিহাসঘন গভর্নর্স আইল্যান্ডের নোলান পার্কে একটি পুরনো বাড়ি এবার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশীআমেরিকান দৃশ্যশিল্পের তাৎপর্যময় ঠিকানা। বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরাম ২০২৬ সালের গভর্নর্স আইল্যান্ড আর্টসের মর্যাদাপূর্ণ অর্গানাইজেশনালস ইন রেসিডেন্স কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে। ইমিেগ্রেশন, স্মৃতি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে কেন্দ্র করে এখানে চলছে যৌথ শিল্পপ্রদর্শনী, শিল্পীরেসিডেন্সি, কর্মশালা এবং জনসম্পৃক্ত নানা শিল্পকর্মসূচি। গত ১৬ মে এই সাংস্কৃতিক মৌসুমের সূচনা হয়। কর্মসূচি অনুযায়ী নোলান পার্কে এই কার্যক্রম ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। অন্যদিকে ট্রাস্ট ফর গভর্নর্স আইল্যান্ডের বর্তমান প্রকাশিত সূচিতে সামগ্রিক রেসিডেন্সি মৌসুম আরও পরে পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দীর্ঘতর কর্মসূচির যৌথ প্রদর্শনী বিটুইন রিভার এন্ড হরবর: স্টোরিস দ্যাট ক্যারি আসÑ শিরোনামে ২৩ মে থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রদর্শিত হয়েছে গ্রুপ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন ৪৩ জন শিল্পী। এই প্রদর্শনীর কিউরেটর শিল্পী কায়সার কামাল।

প্রদর্শনীর নামের মধ্যেই রয়েছে ইমিগ্রান্ট জীবনের এক রূপক। নদী মনে করিয়ে দেয় উৎস, প্রবাহ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্মৃতিকে; আর বন্দর বোঝায় আগমন, আশ্রয় এবং বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে সাক্ষাৎকে। দুইয়ের মাঝখানেই বিস্তৃত প্রবাসজীবনের অনিশ্চিত অথচ সৃজনশীল ভূগোল। বাংলাদেশীআমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের শিল্পীরা সেই ভূগোলকে অনুসন্ধান করছেন ব্যক্তিগত, পূর্বপুরুষের এবং কল্পিত নানা গল্পের মধ্য দিয়েÑযেসব গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জলের মতো প্রবাহিত হয়ে আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করে এবং সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে।

প্রদর্শনীর স্থানটিও এই ভাবনাকে আরও গভীর অর্থ দিয়েছে। গভর্নর্স আইল্যান্ডের উত্তরপূর্ব অংশে অবস্থিত নোলান পার্ক একটি বৃক্ষছায়াময় চার একর বিস্তৃত সবুজ প্রাঙ্গন, যার চারদিকে রয়েছে উনিশ শতকের সামরিক আবাসিক ভবন। বিল্ডিং ১৬ আনুমানিক ,৭২০ বর্গফুটের, দুইতলা কাঠের ফ্রেমে নির্মিত যার ভিত্তি ইটের। ভবনটি দ্বীপটির একটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেই বাড়িই এখন ইমিগ্রান্ট শিল্পীদের কাছে জন্মভূমি, স্মৃতি আত্মপরিচয়কে নতুন করে ভাবার স্থান। 

এই গ্রুপ প্রদর্শনীর অগ্রযাত্রার পরিধি বোঝা যায় আগের প্রদর্শনীগুলো থেকে। ২০২২ সালে কুইন্সের জেক্যালে বিএএএফ আয়োজন করে মেমোয়ার শিরোনামে প্রদর্শনী। সেখানে ৩৪ জন শিল্পীর ৭৩টি শিল্পকর্ম স্থান পায়, দ্বিমাত্রিক চিত্রকর্মের পাশাপাশি ছিল ভাস্কর্যও।

গভর্নর্স আইল্যান্ডেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাঙালী জানায়, ২৫ ২৬ জুলাই নোলান পার্কে বিএএএফএর দ্বাদশ আর্ট ক্যাম্পে ছিল লাইভ পেইন্টিং, শিশুদের কর্মশালা, শিল্পীদের নেটওয়ার্কিং, শিল্পবিষয়ক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পত্রিকাটি আরও জানায়, পুরো মৌসুমজুড়ে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিল্পী সেখানে রেসিডেন্সি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। গভর্নর্স আইল্যান্ডের পৃথক নথিতে ২৪ জুলাই শিল্পীইনরেসিডেন্স দিনা জামানের পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ দিয়ে সরাসরি চিত্রাঙ্কন এবং আগস্টের যুব প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত তরুণদের কর্মশালার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

এই কর্মকান্ডগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন গভর্নর্স আইল্যান্ডের প্রকল্পটির গুরুত্ব কয়েকটি ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে বাংলাদেশ এখনও প্রত্যক্ষ স্মৃতির ভূগোলনদী, ঋতু, পাড়ামহল্লা, রাজনৈতিক ইতিহাস, মাটি রঙের স্মৃতি। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের বাংলাদেশী আমেরিকানদের কাছে সেই জন্মভূমি পৌঁছায় বাবামায়ের গল্প, পুরোনো আলোকচিত্র, ভাষা, গান এবং মাঝেমধ্যে বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে। বিএএএফ এই ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতিসম্পর্ককে একই সাংস্কৃতিক ঘরে পাশাপাশি বসার সুযোগ দেয়। এখানে ঐতিহ্য নস্টালজিয়ায় জমাটবাঁধা কোনো জাদুঘরের বস্তু নয়; বরং নতুন শিল্পভাবনা নির্মাণের উপাদান।

এই কারণে উদ্যোগটির অর্জন একই সঙ্গে শিল্পগত নাগরিক। বিল্ডিং ১৬এর ভেতরে অর্থাৎ এই আর্ট গ্যালারিতে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, বিমূর্ত শিল্প, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ এবং অংশগ্রহণমূলক সৃষ্টিকর্ম হয়ে ওঠে এক ধরনের সাংস্কৃতিক অনুবাদ। বাংলাদেশ সম্পর্কে অল্প পরিচিত কোনো দর্শক এখানেবাংলাদেশী শিল্প’—এর একটি মাত্র সংজ্ঞা পান না; বরং ইমিগ্রেশন, স্মৃতি এবং নিউইয়র্কের অভিজ্ঞতায় নির্মিত বহুসংখ্যক স্বতন্ত্র শিল্পদৃষ্টি আবিষ্কার করেন।

গভর্নর্স আইল্যান্ড নিজেও যুগে যুগে তার অর্থ বদলেছেসামরিক ভূখন্ড থেকে নাগরিক, পরিবেশগত এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে রূপান্তরিত হয়েছে। বিএএএফএর শিল্পীরাও যেন সমান্তরালে আরেকটি রূপান্তরের কাজ করছেন। তাঁরা সমুদ্র পেরিয়ে স্মৃতি বহন করে আনছেন, সেই স্মৃতিকে একটি ঐতিহাসিক আমেরিকান গ্যালারির ভেতরে স্থাপন করছেন, তারপর অচেনা মানুষের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে তাকে নতুন অর্থ দিচ্ছেন।

নদী বন্দরের মাঝখানে, জন্মভূমি আশ্রয়নগরের মাঝখানে, উত্তরাধিকার কল্পনার মধ্যবর্তী স্থানে এই প্রদর্শনী প্রবাসজীবনের একটি বৃহত্তর সত্যকেই যেন দৃশ্যমান করে তোলে: অভিবাসন শুধু সংস্কৃতিকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বহন করে না; যে ভূখন্ডে সেই সংস্কৃতি এসে পৌঁছায়, সময়ের সঙ্গে তাকেও বদলে দেয়এবং শেষ পর্যন্ত সেই ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

Related Posts