রয়টার্সের সংবাদ বিশ্লেষণ: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বদলে দিয়েছে বিশ^বাজার
রয়টার্স প্রতিবেদনঃ এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্য ও সার সরবরাহেও। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারেও তৈরি হয়েছে নানা ধরনের চাপ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারে যুদ্ধের ছয় মাসের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয় ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে। এর পর থেকেই বিশ্ববাজারে তৈরি হয় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি তেল উৎপাদন ব্যাহত হয়। একই সময় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যায়। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে, যা এখনো কমেনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দামে।
যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে জ্বালানি বাজারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তোলন ব্যাহত হওয়া ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন কমে যাওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। চলতি বছরের এপ্রিলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদন্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত পণ্যটির গড় দাম প্রায় ৯০ ডলার। গত বছর এ দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার।
তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চেয়েও বেশি চাপ তৈরি হয় পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ে দ্রুত। বাজারে মিডল ডিস্টিলেটস বা ডিজেল—জাতীয় জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়। এর সঙ্গে রাশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে ব্যাহত হয় উৎপাদন। এ সময় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রফতানিও কমেছে।
জ্বালানির কারণে উড়োজাহাজের বাজারেও শুরুতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। উপসাগরীয় অঞ্চল বৈশ্বিক জেট ফুয়েল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ায় যুদ্ধের শুরুতে এ খাতে উদ্বেগ বেড়ে যায়। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোয় উৎপাদন বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে দেশটি জেট ফুয়েল রফতানিও বাড়াতে থাকে। এতে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা কিছুটা কমে আসে।
তবে জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সামনে শীত আসছে উত্তর গোলার্ধে। এ সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহনে নতুন করে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকিও রয়েছে। এ দুই বিষয় একসঙ্গে ঘটলে হিটিং অয়েলের দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতেও।
এদিকে সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা যেসব সম্পদকে সাধারণত নিরাপদ মনে করেন, সেগুলো এবার আগের মতো নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করেনি। স্বর্ণ, ডলার ও উচ্চমানের সরকারি বন্ড—কোনোটিই পুরো সময়ে প্রচলিত নিরাপদ আশ্রয়ের ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রধান কয়েকটি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে জাপানি ইয়েনের দুর্বলতার কারণে। অর্থাৎ ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের পেছনে যুদ্ধের প্রভাবের পাশাপাশি অন্য মুদ্রার দুর্বলতাও কাজ করেছে।
মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। সাধারণত বৈশ্বিক সংকটের সময়ে বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ডে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ঝোঁকেন। কিন্তু এবার মার্কিন মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় সুদহার কমানোর প্রত্যাশা কমেছে। এতে ট্রেজারি বন্ডের রিটার্ন কমেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নতুন প্রধান কেভিন ওয়ারশকে ঘিরে উদ্বেগ। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের আকস্মিক ঋণ পুনঃক্রয় পরিকল্পনাও বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ফলে ট্রেজারি বন্ড এবার বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেনি।
যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে খাদ্য ও সারের বাজারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার পরিবহনে ব্যাঘাত তৈরি হয়। বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ সার। ফলে পণ্যটি সরবরাহে জটিলতা তৈরি হলে এর প্রভাব সরাসরি কৃষি উৎপাদনে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো। একই সময় ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শস্য পরিবহনেও নতুন করে ব্যাঘাত তৈরি হয়। এসব ঘটনা একসঙ্গে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
এরই মধ্যে জুলাইয়ে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে বলে জানায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুদ্ধের পুরো প্রভাব এখনো বাজারে আসেনি। সামনে খাদ্য মূল্যস্ফীতির নতুন ধাক্কা আসতে পারে।
এফএও সতর্ক করে জানায়, বিশ্ব ফের খাদ্য মূল্যস্ফীতির একটি নতুন পর্যায়ের দিকে এগোতে পারে। জেপিমরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, শুধু শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবেই বিশ্বে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ার আশঙ্কা এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে। যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের রফতানি দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল—জুন) প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি—মার্চ) তুলনায় ১০ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দুবাইয়ের আবাসন খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। জেপি মরগ্যানের হিসাবে, সেখানে সম্পত্তি বিক্রি ৭০—৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি ও শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ নেই। অঞ্চলটির আবাসন ব্যবসায়ও এর বড় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে নেপালে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে
কাঠমান্ডু পোস্ট প্রতিবেদনঃ নেপাল—তিব্বত সীমান্তে গত বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার ২৮ আগস্ট নেপাল পুলিশের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
এদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তিব্বত সীমান্তে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। ফলে নেপাল ও চীন—দুই দেশ মিলিয়ে এই দুর্যোগে মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫২ জনে।
প্রবল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ার পাশাপাশি শত শত বিদেশিসহ ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এটিই নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মূলত একটি হিমবাহ ধসে পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও কাদা নিচের দিকে আছড়ে পড়ার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।
এদিকে সীমান্ত পেরিয়ে নেপাল থেকে ভারতে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে অন্তত সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। মৃতদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ভারতে উদ্ধার হওয়া এই সাতটি মরদেহ এখন পর্যন্ত মূল নিহতের সংখ্যার (৫৫২ জন) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এদিকে এই বিপর্যয়ের মধ্যেই নেপাল—চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট একটি হ্রদে শুক্রবার নতুন করে পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
আরও বড় বন্যার ঝুঁকিতে নেপাল, সতর্কতা জারি
চীন ও নেপাল সীমান্তবর্তী নদীর উচ্চপ্রবাহে বরফ এবং বড় বড় পাথর ধসে পড়ে নদীর স্বাভাবিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সেখানে পানি জমে একটি বিশাল কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।
কাঠমান্ডুর চীনা দূতাবাস সতর্ক করে জানিয়েছে, এই হ্রদে বর্তমানে পানির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে এবং তা ওপর দিয়ে উপচে পড়া শুরু করেছে। যেকোনো মুহূর্তে এর বাঁধ ভেঙে নিচে তীব্র বন্যা ছড়িয়ে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
নেপাল অংশের ‘চ্ছোদেন খোলা’ ও ‘পুরেপু সাংপো’ নদীর সংযোগস্থলের কাছে পাহাড় ধসে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই এলাকাটি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছে। কারণ বর্তমানে উদ্ধার ও জরুরি অবস্থা মোকাবেলার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত সংকটময় একটি মুহূর্ত।
নদীর কাছে কেন বারবার হার মানছে নেপালের রাস্তা—সেতু?
বাঁধ ভেঙে গেলে যেন বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সে জন্য নদীর ভাটি অঞ্চলে থাকা সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে এবং পানির স্তরের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে।
যদিও হ্রদে ঠিক কতখানি পানি আছে বা এটি ঠিক কখন ভেঙে পড়তে পারে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। ইতোমধ্যে নেপালের রসোয়াসহ বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টি ও বন্যা চলছে, ফলে এই ঝুঁকি আরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
চীনা দূতাবাস সাধারণ মানুষকে কোনো যাচাই না করা খবরে কান দিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার এবং কেবল নির্ভরযোগ্য ও সরকারি তথ্যের ওপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।
