গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— চব্বিশ সেতারে বিশ্বমানবতার দীর্ঘ আলাপ পন্ডিত রবিশংকর

. জীবন বিশ্বাসঃ একখন্ড শুকনো লাউয়ের খোলস, কিছু কাঠের খন্ডাংশ আর কয়েকগাছি পিতলইস্পাতের তারÑপ্রথম দর্শনে একটি সেতারকে এর চেয়ে বেশি কিছু মনে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই কাঠের খাঁচায় বন্দি বাতাস যখন কোনো দক্ষ আঙুলের স্পর্শে কেঁপে ওঠে, তখন সাতটি সুরের বাইরের অগণিত সূক্ষ¥ শ্রুতি ডানা মেলে দেয়। যে সময়ে পশ্চিমের সংগীত রসিকরা পিয়ানোর নির্দিষ্ট বারোটি স্বরের বাইরে সুরের অন্য কোনো বৈচিত্র্য কল্পনা করতে পারত না, সেই সময়ে বারাণসী থেকে উঠে আসা এক তরুণ কাঠের যন্ত্রটিকে সঙ্গে নিয়ে গোটা দুনিয়াকে নতুন করে কান পাততে শেখালেন। তিনি দেখালেন, সুর কেবল মেদুর বিনোদন নয়, তা প্রাচ্যের প্রাচীন দর্শন, জ্যামিতিক গণিত এবং মানবাত্মার এক জটিল আধ্যাত্মিক বিন্যাস। তিনি আর কেউ নন, তিনি মিউজিকমায়েস্ট্রো পন্ডিত রবিশংকর। তিনি তাঁর সেতারের তারে বিশ্বমানবতার দীর্ঘ আলাপ শুনিয়ে মানবতারই ধ্যানমগ্নতায় মগ্ন ছিলেন সারাটি জীবন।

১৯২০ সালের এপ্রিল ভারতের বারাণসীতে জন্ম নেওয়া এই অনন্যসাধক শিল্পীর পিতৃদত্ত নাম ছিল রবীন্দ্রশংকর চৌধুরী। পিতা পন্ডিত শ্যামশংকর চৌধুরী মাতা হেমাঙ্গিনী দেবীর এই তেজস্বী সন্তানটির পারিবারিক পূর্বপুরুষের শিকড় ছিল বাংলাদেশের নড়াইল জেলার কালিয়া গ্রামে। বারাণসীর গঙ্গার তীর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ সুরযাত্রার সমাপ্তি ঘটে ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর এক হাসপাতালে। তাঁর ৯২ বছরের এই সুবিশাল সাংগীতিক ক্যানভাসে তিনি কেবল নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেননি, বরং প্রাচ্য প্রতীচ্যের মহাদেশীয় মানচিত্রে তৈরি করেছিলেন এক অভাবনীয় সাঙ্গীতিক সেতুÑযেখানে একটি মানুষের জীবন পরিণত হয়েছিল প্রাচ্যের ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যে।

ইউরোপীয় জৌলুস মাইহারের নিভৃত কুটির

কৈশোরে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আন্তর্জাতিক নৃত্যগুরু উদয়শংকরের শিল্পীদলের সঙ্গে ইউরোপ আমেরিকার নানা দেশ শহর ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁর প্রখর দৃষ্টিভঙ্গি পরিচিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চের গতিময় নান্দনিকতার সঙ্গে। সেখানে তিনি নাচতেন, বিলাসী পোশাক পরতেন এবং থিয়েটারের জাঁকজমক উপভোগ করতেন। কিন্তু এই রঙিন উপকরণের আড়ালে তাঁর ভেতরের সত্যিকারের শিল্পীটি হাঁসফাঁস করছিল। একসময় সমস্ত জৌলুস একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি ছুটে গেলেন মধ্যপ্রদেশের এক প্রান্তিক গ্রাম মাইহারে, প্রখ্যাত সংগীতসাধক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের শিষ্যত্বের আশ্রয়ে। শহরের রঙিন পোশাক ছেড়ে, নাড়া বেঁধে এবং মাথা মুন্ডন করে তিনি বসেন গুরুর কঠোর শাসনের অধীনে। বিদ্যুৎহীন নির্জন ঘরে টানা চৌদ্দ বছর প্রতিদিন প্রায় আঠারো ঘণ্টা রেওয়াজ করে তিনি আয়ত্ত করেছিলেন রাগের ব্যাকরণ, তালের সূক্ষ¥ গাণিতিক ছক এবং প্রতিটি স্বরের ভেতরের আত্মসংযম। সুর সেখানে কেবল প্রদর্শনী রইল না, হয়ে উঠল পরম তপস্যা। সেতারের তারগুলো যেন হয়ে উঠল তাঁর পাঁজরের হাড়, আর ধ্বনি হয়ে উঠল হৃদস্পন্দন।

রাগের সাঙ্গীতিক স্থাপত্য সেলুলয়েডের সুরভাষ্য

সেতার বাজানোকে তিনি কখনোই কোনো দ্রুত তান দেখানোর খেলায় নামিয়ে আনেননি। তাঁর বাজনায় আলাপ ছিল এক বিশাল প্রাসাদের ভিত্তিস্থাপনের মতো ধীর গম্ভীর, জোড়ে থাকত মানবশ্বাসের স্বচ্ছন্দ গতি, আর ঝালায় ঝরে পড়ত সুরের তীব্র ঝরণা। চলচ্চিত্রমাধ্যমের সেলুলয়েডে সুরকে কীভাবে দৃশ্যময় করতে হয়, তার এক বিরল উদাহরণ তিনি তৈরি করেছিলেন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়েরপথের পাঁচালীছবিতে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নিবিড় অনুধ্যানে সেতার বাঁশির যে সাঙ্গীতিক কাঠামো তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা সিনেমার দৃশ্যগুলোকে বিশ্বমানের শিল্পে উন্নীত করে।অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘পরশ পাথরকিংবা আন্তর্জাতিকগান্ধীচলচ্চিত্রে তাঁর আবহসংগীত প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল মঞ্চের একক শিল্পী ছিলেন না, দৃশ্যের নীরবতা চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্বকেও সুরের নিখুঁত ভাষায় রূপ দিতে জানতেন।
পশ্চিমের সঙ্গে সংলাপ ১৯৭১এর ঐতিহাসিক মানবতা

ইউরোপআমেরিকার রক পপ সংস্কৃতি যখন অনেকটাই দিশেহারা, তখন রবিশংকর সেখানে পৌঁছান প্রাচ্যের সংযম আত্মদর্শনের বার্তা নিয়ে। বিশ্বখ্যাত বেহালাবাদক ইয়েহুদি মেনুহিনের সঙ্গে যৌথ পরিবেশনা এবং বিটলসের জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব পশ্চিমের তরুণ প্রজন্মকে ভারতীয় সুরের প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী করে তোলে। তবে তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দায়িত্বশীল অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানিহানাদার কর্তৃক নির্বিচারে গণহত্যা কোটি কোটি শরণার্থীর করুণ অবস্থা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। জর্জ হ্যারিসনকে সঙ্গে নিয়ে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে তিনি আয়োজন করেন ঐতিহাসিককনসার্ট ফর বাংলাদেশ সেই আয়োজন কেবল তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠান ছিল না, তা ছিল অবরুদ্ধ এক মুক্তিকামী জাতির পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্বমঞ্চে সেতারের তারে তোলা এক প্রবল প্রদীপ্ত প্রতিবাদ।

পন্ডিত রবিশংকর উদ্ভাবিত কয়েকটি বিখ্যাত রাগ

পন্ডিত রবিশংকর উদ্ভাবিত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে নথিভুক্ত ২৫টি প্রখ্যাত রাগের সুবিন্যস্ত তালিকা নিচে প্রদান করা হলো:

১। নাট ভৈরব, ২। আহির ললিত, ৩। রসিয়া, ৪। ইয়ামন মাঞ্জ, ৫। গুঞ্জি কানাড়া, ৬। জনসম্মোহিনী, ৭। তিলক শ্যাম, ৮। বৈরাগী, ৯। মোহন কৌন্স, ১০। মনমঞ্জরী, ১১। মিশ্র গারা, ১২। পঞ্চম সে গারা, ১৩। পূর্বী কল্যাণ, ১৪। কামেশ্বরী, ১৫। গঙ্গেশ্বরী, ১৬। রঙ্গেশ্বরী, ১৭। পরমেশ্বরী, ১৮। পলাশ কাফি, ১৯। যোগেশ্বরী, ২০। চারু কৌন্স, ২১। কৌশিক টোড়ি, ২২। বৈরাগী টোড়ি, ২৩। ভবানী ভৈরব, ২৪। সাঁঝ কল্যাণ, ২৫। শৈলাঙ্গী।

উল্লেখযোগ্য সুর, গান চলচ্চিত্রের আবহসংগীত

বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ সেলুলয়েডের স্মৃতিতে পন্ডিত রবিশংকরের বহুল আলোচিত কয়েকটি বিশেষ কাজ আবহসুরের পরিচয় দেয়া হলঃ

১। জয় বাংলা জয় বাংলা জয় বাংলা জয় জয় (রচনা সুর রবিশংকর, ১৯৭১ সালের একটি কোরাস গান) ২। ভগবান খোদাতালা (সংগীত, সুর, কথা স্বকন্ঠে গান), ৩। মায়া ভরা রাতি (সুর সংগীত পরিচালনা), ৪। রতি সুখ সারে (হিন্দী, সুর সংগীত পরিচালনা), ৪। বাংলা ধুন, ৫। পথের পাঁচালীর মূল থিম, ৬। অপরাজিতএর মূল থিম, ৭। অপুর সংসারএর মূল থিম, ৮। কাবুলিওয়ালাএর আবহসংগীত, ৯। পরশ পাথরএর আবহসংগীত, ১০। অপুর ট্রেনদৃশ্যের বিশেষ সুর, ১১। দুর্গার মৃত্যুসংবাদদৃশ্যের পটদীপআবহ, ১২। দেশ রাগভিত্তিক সেতারখন্ড, ১৩। টোড়ি রাগভিত্তিক সেতারখন্ড, ১৪। পাখোয়াজ খোলসমৃদ্ধ গ্রামীণ আবহ, ১৫। বাংলার লোকসুরনির্ভর চলচ্চিত্রথিম, ১৬। বাংলাদেশউৎসর্গিত সাঙ্গীতিক ধুন।

পন্ডিত রবিশংকর কর্তৃক সংগীত পরিচালিত সুরারোপিত ১৫টি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র

দেশীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে তাঁর সাঙ্গীতিক অবদানের ১৫টি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:

১। ধর্তি কে লাল, ২। নিচা নগর, ৩। পথের পাঁচালী, ৪। অপরাজিত, ৫। কাবুলিওয়ালা, ৬। পরশ পাথর, ৭। অপুর সংসার, ৮। অনুরাধা, ৯। দ্য ফ্লুট অ্যান্ড দ্য অ্যারো, ১০। অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, ১১। চপাকোয়া, ১২। চার্লি, ১৩। রাগা, ১৪। গান্ধী এবং ১৫। জেনেসিস।

পরিশেষ

পন্ডিত রবিশংকর কোনো প্রথাগত শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বসংগীত দরবারের একজন প্রথম সারির মিউজিকমায়েস্ট্রো। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে কেবল অতীত ঐতিহ্যের জাদুঘরে বন্দি রেখে শুকিয়ে যেতে দেননি, আবার চটুল জনপ্রিয়তার লোভে তার বিশুদ্ধতাকেও বন্ধক রাখেননি। প্রথাগত প্রাচ্য ব্যাকরণকে অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে সংস্কৃতিকে আধুনিক বিশ্বের সামনে প্রাসঙ্গিক করে তোলা যায়, তিনি ছিলেন তার এক অতুলনীয় প্রবক্তা। যে কাঠের সেতারটি তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তা হয়তো আজ শান্ত হয়ে জমা আছে কোনো কাচের বাক্সে, কিন্তু যে আন্তর্জাতিক নান্দনিক ভাষা তিনি তৈরি করে গেছেন, তা চিরকাল বিশ্বজুড়ে সুরের সমঝদারদের নতুন করে ভাবাবে। দূরান্তের কোনো মিলনায়তনে যখনই সেতারের গভীর ধীর আলাপ শুরু হয়, তখনই বোঝা যায় সেই তারের ঝংকার কখনো নীরব হওয়ার নয়। পন্ডিত রবিশংকর বেঁচে আছেন সেতারের ঝংকারে, মানবতার শুভ্র বাতায়নে এবং শোষিত মুক্তিকামী মানুষের পাশে।

Related Posts