বাংলাদেশের জলাবদ্ধতার জলতাত্ত্বিক গতিবিদ্যা —২৩ || ড. আনিস রহমান
জলবায়ু পরিবর্তন ও নদী প্রবাহের রূপান্তর
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিন্দু—কুশ হিমালয় (ঐকঐ) অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি, যা প্রতি দশকে প্রায় ০.২৩ক্কসে থেকে ০.৩৯ক্কসে—এ পৌঁছেছে। এই চরম উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের তুষার ও হিমবাহের ভর দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে তুষারপাতের অনুপাত ০.৭০ থেকে হ্রাস পেয়ে ০.৫৬—এ নেমে এসেছে, যার অর্থ হিমালয় অঞ্চলে তুষারপাতের পরিবর্তে এখন সরাসরি তরল বৃষ্টিপাত বেশি হচ্ছে।
এর ফলে গ্রীষ্মকালে তুষার গলন এবং অতিবৃষ্টির যুগপৎ পানির প্রবাহ অভূতপূর্ব মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাইড্রোলজিক্যাল মডেল (যেমন ঝডঅঞ এবং ঠওঈ) সিমুলেশন অনুযায়ী, ২০৮০—এর দশকের মধ্যে উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু পরিস্থিতিতে ব্রহ্মপুত্র নদের মৌসুমী সর্বোচ্চ প্রবাহ (চবধশ ঋষড়ি চষধঃবধঁ) বৃদ্ধি পেয়ে ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ ঘনমিটার/সেকেন্ডে পৌঁছাতে পারে, যা প্লাবনভূমির বন্যাঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বন্যা ও জলতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ভৌত উপাদানগুলোর বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো। বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি এবং জলতাত্ত্বিক ভারসাম্য মূলত তিনটি প্রধান ভৌত উপাদানের ওপর নির্ভরশীল, যা নিম্নরূপ:
গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ু (ওঝগ): এটি স্থলভাগ ও সমুদ্রের মধ্যে তাপীয় বৈপরীত্য, কোরিওলিস বল এবং রুদ্ধতাপীয় ঘনীভবন ও সুপ্ত তাপ নির্গমনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই বায়ুপ্রবাহ বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ৭০%—৮০% জোগান দেয়, যা নদীগুলোর পানিপ্রবাহকে সর্বোচ্চ সীমায় উন্নীত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে চরম অতিবৃষ্টির ঘটনা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্লাবনের ঝুঁকি প্রকট হবে।
হিমালয় পর্বতমালা (ঙৎড়মৎধঢ়যরপ ঋড়ৎপরহম): এই বিশাল পর্বতমালা আর্দ্র বায়ুর জন্য প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে এবং ভূ—সংস্থানিক উত্তোলনের মাধ্যমে ঘনীভবন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এর ফলে হিমালয়ের পাদদেশীয় মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার বৃষ্টিপাত হয়, যা বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর—পূর্বাঞ্চলে তাৎক্ষণিক বন্যা সৃষ্টি করে। ভবিষ্যতে মৌসুমী বায়ুর উত্তরমুখী স্থানান্তরের কারণে এই বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তির হার বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হিমালয় ক্রায়োস্ফিয়ার (তুষার ও হিমবাহ গলন): সৌর বিকিরণ ও তাপমাত্রাজনিত কারণে এই তুষার গলন প্রক্রিয়া ঘটে, যা অ্যালবেডো হ্রাসের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এই প্রক্রিয়াটি মূলত প্রাক—বর্ষা (এপ্রিল—মে) এবং বর্ষা মৌসুমে নদীর ভিত্তিপ্রবাহ বা বেস—ফ্লো বৃদ্ধি করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে তুষারপাতের অনুপাত কমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং দ্রুত হিমবাহ গলনের কারণে গ্রীষ্মকালীন রানঅফ বা পৃষ্ঠপ্রবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
প্রধান নগর অঞ্চলসমূহে নগর বন্যা ও জলাবদ্ধতা
নদীমাতৃক গ্রামীণ বন্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ‘নগর বন্যা’ (টৎনধহ ঋষড়ড়ফরহম) ও ‘জলাবদ্ধতা’ (ডধঃবৎষড়মমরহম) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে ভয়াবহ নাগরিক সংকটে পরিণত হয়েছে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিপাতেই শহরগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
নিচে বাংলাদেশের প্রধান চারটি শহরের জলাবদ্ধতার ধরন এবং এদের জলতাত্ত্বিক কারণগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
ঢাকা মহানগরী: খালের বিলুপ্তি এবং কৃত্রিম প্লাবন
ঢাকা মহানগরী চারদিকে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদী এবং টঙ্গী খাল দ্বারা বেষ্টিত একটি ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি। ভৌগোলিকভাবে ঢাকা একটি নিচু সমতল বদ্বীপীয় ভূমিতে অবস্থিত হলেও ঐতিহাসিকভাবে এর নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত। একসময় এই শহরের অভ্যন্তরে ৫০টিরও বেশি প্রাকৃতিক খাল (খড়পধষ কযধষং) সক্রিয় ছিল, যা শহরের বৃষ্টির পানিকে অতি দ্রুত চারপাশের প্রান্তীয় নদীগুলোতে নিষ্কাশিত করত। ঢাকা মহানগরী কার্যত চারটি প্রধান নদী এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ খালের সমন্বিত জলবেষ্টনী দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই নদী ও খালের অবস্থানগুলো হলো: বুড়িগঙ্গা নদী: মহানগরীর দক্ষিণ সীমানায় অবস্থিত। তুরাগ নদী: মহানগরীর পশ্চিম ও উত্তর—পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত। বালু নদী: মহানগরীর পূর্ব সীমানায় অবস্থিত। শীতলক্ষ্যা নদী: মহানগরীর দক্ষিণ—পূর্ব দিকে অবস্থিত। টঙ্গী খাল: এটি মহানগরীর উত্তরাংশে অবস্থিত এবং তুরাগ ও বালু নদীকে সংযুক্ত করে একটি বৃত্তাকার জলপথের রূপ দেয়। এই নদী ও খালগুলো ঢাকা মহানগরীর প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার মেরুদন্ড হিসেবে কাজ করে এবং ঐতিহাসিকভাবে শহরের সীমানা নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।
বিগত কয়েক দশকে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং দ্রুত ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের (খটখঈ) কারণে ঢাকার প্রাকৃতিক নিষ্কাশন জাল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিগত ৮০ বছরে ঢাকা তার প্রায় ১২০ কিলোমিটার বা ৩০৭ হেক্টর দীর্ঘ প্রাকৃতিক খালের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, টিকে থাকা প্রধান প্রধান খালের প্রায় ৪০% অংশ সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ভূমি দখলদারদের দখলে চলে গেছে। প্রধান প্রাকৃতিক খালের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, খালের তলদেশ ভরাট, বস্তি সম্প্রসারণ, কঠিন বর্জ্য নিক্ষেপ এবং আবাসন প্রকল্পের কারণে এগুলো চরমভাবে সংকুচিত হয়েছে। খালের নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার (ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন ইত্যাদি) মধ্যে বিভক্ত থাকায় তদারকিতে চরম সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে।
বৃষ্টির পানির পৃষ্ঠপ্রবাহ বা রানঅফ নির্ধারণের জন্য জলতাত্ত্বিক রেশনাল সূত্র ব্যবহৃত হয়:
ছ=ঈ⋅ও⋅অ
এখানে ছ হলো রানঅফ প্রবাহের হার, ঈ হলো পৃষ্ঠপ্রবাহ সহগ (জঁহড়ভভ ঈড়বভভরপরবহঃ), ও হলো বৃষ্টিপাতের তীব্রতা এবং অ হলো নিষ্কাশন এলাকার ক্ষেত্রফল। ঢাকা শহরের জলাভূমি এবং সবুজ অঞ্চল আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে; ১৯৬৮ সালে যেখানে জলাভূমির আয়তন ছিল ১৩৩ বর্গ কিমি, ২০০১ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৬৭ বর্গ কিমি এবং পরবর্তীতে আরও সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় রানঅফ সহগ ঈ চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
১২ জুলাই ২০২৪ সালের একটি অতিবৃষ্টির ঘটনায় মাত্র ৩—৪ ঘণ্টার ঃড়ৎৎবহঃরধষ বৃষ্টিতে সমগ্র ঢাকা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রধান আউটলেট বেগুনবাড়ি খালটি (যা শহরের ২৫% পানি বহন করে) বক্স কালভার্ট করার কারণে এবং কল্যাণপুর ও ধোলাইখালের রিটেনশন পন্ড বা ধারণ পুকুরগুলো আবাসিক এলাকা দ্বারা ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি জমে থাকার সময় বহুগুণ বেড়ে গেছে। উপরন্তু, বর্ষাকালে বুড়িগঙ্গা বা বালু নদীর পানির স্তর শহরের ভেতরের নর্দমার উচ্চতাকে অতিক্রম করার কারণে পশ্চাৎমুখী পানির চাপের (ইধপশধিঃবৎ ঊভভবপঃ) সৃষ্টি হয়, যা নিষ্কাশন পাম্পগুলোর ব্যাকআপ ছাড়া স্বাভাবিক নিষ্কাশন অসম্ভব করে তোলে।
