রংপুরে ৪ খুন নিয়ে সন্দেহ ও অজ¯্র প্রশ্ন
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকান্ডের তদন্ত নিয়ে পুলিশ ও ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন, সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ঘটনার পর পুলিশের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য ও তদন্তের নানা সূত্র ও অসঙ্গতি নিয়ে মানুষকে প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে।
এদিকে, পুলিশ বলছে তাদের তদন্তে অগ্রগতি রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ড নিয়ে মানুষের মনে এত প্রশ্ন, সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে কেন?
অপরাধবিজ্ঞানী ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধের ঘটনা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কথা বললে মানুষের মাঝে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। এটা একটি মনস্তাত্তিক বিষয়।
এছাড়া, নানা ধরনের চাপ ও আইনগত কারণে পুলিশ বাহিনীও বাংলাদেশে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে সত্য উদঘাটনে তাদের সামর্থ্য নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেন কেউ কেউ।
ফলে নানা প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে।
যদিও অপরাধ বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর উদ্দেশ্য, মোটিভ ও প্রক্রিয়া যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সময় লাগে, সেজন্য তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দেন তারা।
কেন এ হত্যাকান্ড নিয়ে সন্দেহ, প্রশ্ন ও অবিশ্বাস?
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুরের দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের আগেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে স্থানীয় দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ দাবি করে, ওই দুই ব্যক্তিই মি. চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রকে একে একে হত্যা করেছে।
পরে হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এদিকে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়।
হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়া বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কী—না, নিহত একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কী—না, মাদকাসক্ত দুইজন মানুষ চারজনকে হত্যা করতে পারে কী—না, খুনি সন্দেহে গ্রেফতার ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তার একই রকম শার্ট কেন, আসলেই মাদক গ্রহণে বাধা দেয়ায় হত্যাকান্ড নাকি এটি ডাকাতির ঘটনা — এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নেটিজেনদের নিউজ ফিডে।
এছাড়া, হত্যাকান্ডের পরও কেন আসামিরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল, নিহতদের শরীরে বা পোশাকে কিংবা ঘটনাস্থলে আসামিদের ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে কী—না, এমন প্রশ্নও উঠছে।
সেই সাথে, নিহত মি. চক্রবর্তীর মেয়ের চোয়াল ভাঙ্গা ছিল কী—না তা নিয়ে পুলিশ ও ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যের অমিল নিয়েও প্রশ্ন ও সন্দেহের কথা বলছেন কেউ কেউ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এ ঘটনা নিয়ে এত সন্দেহ ও অবিশ্বাস?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা বিশেষত অমীমাংসিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশের তদন্ত নিয়ে অবিশ্বাস বা সন্দেহ তৈরির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও নানা সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল পুলিশের তদন্ত।
এর মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর—রুনি হত্যা মামলা, কুমিল্লার তনু হত্যা, মেজর সিনহা হত্যা, ফেনীর নুসরাত হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক হত্যা মামলাসহ আরো বেশ কিছু মামলার তদন্ত নানা সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিষয়টি বিভিন্ন সময় পুলিশের পক্ষ থেকে স্বীকারও করা হয়েছে।
কী বলছেন তদন্ত কর্মকর্তা
এদিকে, হত্যাকান্ডের এক সপ্তাহ পেরুনোর আগেই মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব থানা পুলিশের কাছ থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক জিন্নাত আলী।
বিবিসি বাংলা তার কাছে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তথ্য ও সূত্র নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ওঠা নানা প্রশ্ন নিয়ে জানতে চেয়েছিল, তিনি সেসবের জবাবে বলছেন, ‘মানুষ প্রশ্ন তুলতেই পারে, তাতে অসুবিধা নেই।’
তবে তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে এবং সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে যে কাজগুলো করা দরকার, আমি করতেছি।’
মি. আলী জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে এ মামলায় সীমান্ত দাস, যিনি গ্রেফতার দুই ব্যক্তির বন্ধু, তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন ঘটনার আগে গ্রেফতার দুই ব্যক্তি মাদক গ্রহণ করেছিল।
সবশেষ ওই ঘটনার সময় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল কী—না প্রশ্নের জবাবে মি. আলী বলেছেন, তিনি অফিসিয়ালি পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বা ময়না তদন্ত প্রতিবেদনটি এখনো হাতে পাননি।
‘আমরা আনঅফিশিয়ালি পেয়েছি। অফিশিয়ালি পাই নাই। ধর্ষণের কোনো আলামত নাই। তবে, ধস্তাধস্তি তো থাকবেই।’
এদিকে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মাদকাসক্ত বলা হয়েছে। কিন্তু তারা আসলেই মাদকাসক্ত ছিল কী—না তা নিশ্চিত হতে ডোপ টেস্ট করা হয়েছে কীনা এমন প্রশ্নে মি. আলী বলেছেন, ‘ওটাও করবো। ওটার সময় আছে তো, ৯০ দিন পর্যন্ত সময় থাকে। এখনো করা হয়নি।’
এদিকে, আসামিদের একজনের গায়ের জামা এবং রংপুরেরই একজন পুলিশ কর্মকর্তার গায়ের জামা একই ধরনেরÑ এমন ছবি অনেকেই শেয়ার করে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, পুলিশের জামা ওই ব্যক্তির গায়ে গেল কী করে।
রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের উপ—কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সোমবার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘ওই জামা রংপুরে আমিসহ আরও দুশো লোকের আছে। আমার শার্ট আমারই আছে। এ নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
