বাংলাদেশ নিয়ে ৮টি প্রশ্ন || ড. জীবন বিশ্বাস

লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত বাংলাদেশ কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে?

লক্ষ মাবোনের সম্ভ্রমে কেনা বাংলাদেশ কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?

মুক্তিযোদ্ধাদের সোনার বাংলাদেশ কোথায় ডুবে যাচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর স্বনির্ভর বাংলাদেশ কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে?

অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশে কেন সাম্প্রদায়িকতার বুকফাটা হাহাকার?

শোষণমুক্তির অঙ্গীকার কেন বিচারহীনতার জিকিরে বন্দী?

লালসবুজের বাংলাদেশে কেন পাকিস্তানি চাঁদতারার পৎপৎ শব্দ?

সন্ত্রাসীদের নৈরাজ্যের কুচকাওয়াজের শব্দ কেন বাংলাদেশের আকাশেবাতাসে?

এসব প্রশ্ন এখন শুধু বাংলাদেশে নয়, দেশের বাইরেও ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রসংগে পরে আসা যাক।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনীতি শুধু একটিমাত্র নাটকীয় মুহূর্তে ভেঙে পড়ার নজির খুবই কম। অধিকাংশ সময় কূটনীতির গতি থেমে যায় আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে আস্থার দূরত্বে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল প্রত্যাশিত প্রথম দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর এখন ঠিক সেই অনিশ্চিত পরিসরেই আটকে আছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ২৩২৫ আগস্ট সম্ভাব্য সফরসূচির কথা প্রকাশিত হলেও ঢাকা জানায়, সফরের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ২৬ আগস্ট নাগাদ সফরটি কার্যত অনির্দিষ্টকালের অনিশ্চয়তায় চলে গেছে। ঘটনাটি প্রায় নাটকীয় প্রতীকে রূপ নেয়, যখন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মহড়ার কথা উল্লেখ করে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি প্রত্যাহার করে নেয়। দুই অবিচ্ছেদ্য প্রতিবেশীর সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাব্য উদ্যোগটি তাই এখন হয়ে উঠেছে পারস্পরিক রাজনৈতিক অনাস্থার গভীরতা মাপার এক সূচক। অন্যদিকে, রংপুরে সদস্যের একটি পরিবারের নৃশংস হত্যাকান্ড বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে তলানিতে নামিয়ে এনেছে। এসব প্রসংগ নিয়েই আজকের উপসম্পাদকীয়।

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্রজনতার অভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদন্ড দেয়; শেখ হাসিনা এই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ঢাকা বারবার তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে। আগস্ট নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদমাধ্যমআলোচনায় ভিডিওর মাধ্যমে অংশ নিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ২০২৪পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারেক রহমানের সফরের অনুকূল পরিবেশবিঘ্নিতহয়েছে এবং সফরের আগে একটিঅনুকূল পরিবেশপুনর্গঠন করা প্রয়োজন। ভারত বলছে, প্রত্যর্পণের আবেদনটি তাদের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। 

দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় পাঠানো অনুরোধকে ভারত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেÑএই প্রত্যাশার যৌক্তিকতা আপাতভাবে মেনে নিয়েও বলা যায়, একটি অমীমাংসিত আইনি মামলার কাছে গোটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জিম্মি করে ফেললে পররাষ্ট্রনীতি হয়ে ওঠে ভঙ্গুর। ভারত বাংলাদেশ নিজেদের ভূগোল বদলাতে পারে না। নিরাপত্তা, নদী, সীমান্ত, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দুই দেশের নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবেÑঢাকায় বা দিল্লিতে যে ক্ষমতায় থাকুক না কেন।বাংলাদেশ ফাস্টর্কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের একটি বৈধ নীতি হতে পারে; কিন্তু যখন সংলাপ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই যদি এই নীতি সংলাপ স্থগিতের যুক্তি হয়ে ওঠে, তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষীণ হয়। 

তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতার আরও কঠিন পরীক্ষা চলছে সীমান্তের ওপারে নয়, রংপুরের দাসপাড়ার একটি বাড়ির ভেতরে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রী কন্যা আগামী চক্রবর্তী (২৩) এবং ১২ বছর বয়সী পুত্র প্রিয়মÑচারজনকেই তাঁদের বাড়ির বিভিন্ন স্থানে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ স্থানীয় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে জানায়, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁদের বিরোধ থেকেই হত্যাকান্ডের সূত্রপাত। পরে অভিযুক্তরা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর অপরাধীরা বাড়িতেই অবস্থান করে এবং ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো পুলিশের দ্রুত উপস্থাপিত ঘটনার বিবরণ তার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেÑবিশেষত নিহতদের মুখমন্ডলে পোড়ার চিহ্ন পাওয়ার পর। সন্দেহ নেই, পুলিশের ভূমিকা ন্যায্য বিচারের অনুকূল নয় মোটেই। 

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘ নথিবদ্ধ ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়কে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় শতাংশ হিন্দু, রংপুর বিভাগে এই হার প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব দ্বিমাত্রিক। প্রথমত, প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ণয় করা; দ্বিতীয়ত, তদন্তকে এমন বিশ্বাসযোগ্য করা, যাতে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মনে এই ধারণা না জন্মায় যে ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই তদন্তের উপসংহার লেখা হয়ে গেছে। 

১০ আগস্ট প্রকাশিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ৩৮তম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলকায়েদা, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সত্তায় রূপান্তরিত হচ্ছে; বড় ইউনিটের বদলে ছোট, বিকেন্দ্রীভূত ছড়িয়ে থাকা সেলের মাধ্যমে আর্থিক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে; এবং এক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশকে কাজে লাগাচ্ছে পুরোপুরিভাবে। একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লার কাছে সংঘটিত হামলাটি অছওঝএর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

২০২৬ সালের এষড়নধষ ঞবৎৎড়ৎরংস ওহফবী ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ যখন স্বীকার করেন যে তিনি জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি তখনও পড়েননি, অথচ একই সঙ্গে সেটিকেঅনুমাননির্ভরবলে প্রত্যাখ্যান করেনÑতখন সেই প্রতিক্রিয়া অভিজ্ঞতার এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচক্ষণতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। গোয়েন্দা সতর্কতা স্বভাবতই অনেক সময় আশংকাভিত্তিক; তার উদ্দেশ্য মৃতের সংখ্যা তৈরি হওয়ার পর বিপদ শনাক্ত করা নয়, বরং বিপদ পরিণত হওয়ার আগেই দুর্বলতা শনাক্ত করা। যুক্তিসংগত প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত গোপনীয় আন্তঃসংস্থা মূল্যায়ন, আইনি সুরক্ষার মধ্যে পরিচিত উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের পর্যবেক্ষণ, আর্থিক গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে উন্নত সমন্বয়। 

ভারত সফর স্থগিত হওয়া, রংপুরের চার হত্যাকান্ড এবং অছওঝ সম্পর্কে জাতিসংঘের সতর্কবার্তাÑএই তিনটি ঘটনাকে আলাদা আলাদা সংকট হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়। এগুলো একত্রে জানাচ্ছে, বাংলাদেশের নতুন সরকার কি সার্বভৌমত্বকে রাজনৈতিক উচ্চারণ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় রূপান্তর করতে পারবে? কূটনীতি যদি প্রতীকী প্রত্যাখ্যানে সীমাবদ্ধ হয়, সংখ্যালঘু নাগরিকরা যদি বিশ্বাস করতে না পারেন যে তদন্ত প্রমাণের পথ অনুসরণ করবে, কিংবা নিরাপত্তা সতর্কবার্তা পরীক্ষা করার আগেই বাতিল হয়ে যায়Ñতবে সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী নয়, বরং দুর্বল হয়। 

রংপুরের হত্যাকান্ডকে স্বচ্ছ বিশ্বাসযোগ্য ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে; এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে অন্ধভাবে সত্য কিংবা সম্পূর্ণ কল্পনাÑকোনোটিই না ধরে একটি যাচাইযোগ্য আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি দেশ শুধু কোনো সফর স্থগিত করেই তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে না। সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় যখন তার আদালত বিশ্বাসযোগ্য, তার সংখ্যালঘুরা নিরাপদ, তার গোয়েন্দা ব্যবস্থা পেশাদার, এবং তার কূটনীতি এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে আস্থার ঘাটতির মধ্যেও সে সংলাপে বসতে পারে।

উপসম্পাদকীয়টি শুরু হয়েছিল আটটি প্রশ্ন দিয়ে। সেই প্রশ্নের সূত্র ধরেই বলা চলে, অগণিত শহীদ মাবোনের মহান ত্যাগে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত বাংলাদেশের মূল চেতনা আজ বিষাক্ত রাজনীতি, দুর্নীতি অন্যায়ের অন্ধকারে দারুণভাবে বিপর্যস্ত। যে আদর্শের ওপর ভর দিয়ে মুক্তিকামী মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছিল, তা চরম হাহাকার আর মৌলিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে দিক হারাতে বসেছে। দেশের এই আশঙ্কাজনক অচলাবস্থা কেবল ক্ষুব্ধ দেশবাসীকে নয়, বরং বৈশ্বিক বিবেককেও গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি করছে।

Related Posts