আশা ভরসার জায়গা নতুন প্রজন্ম
বছরের এই সময়টা স্কুল ও কলেজে যাওয়ার এবং যাওয়ার প্রস্তুতির সময়। আমেরিকার অধিকাংশ ঘরে কোনো না কোনো বয়সের ছেলেমেয়েরা এই সময় অন্য এক আমেজে, আবেগে ও টেনশনে থাকে। একই ধরনের অনুভব অভিভাবকদের মনেও কাজ করে। তবে যেসব পরিবারের শিশুরা প্রথম স্কুলে বা বড়রা হাইস্কুল শেষ করে কলেজে বা ইউনিভার্সিটিতে যাবে সেসব পরিবারে অভিভাবকদের জন্য অন্যরকম প্রস্তুতি। স্কুল সাপ্লাইজ কেনাকাটাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পন্ন করতে হয়। যারা স্বাভাবিকভাবে একই স্কুলে এক ক্লাস থেকে পরবতীর্ ক্লাসে যাবে তাদের জন্য তেমন চিন্তা থাকে না। কেবল স্কুল সাপ্লাইজ কিনতে হয়। যেসব ছাত্রছাত্রী বিশেষ করে নিউইয়র্ক সিটিতে যারা আছে, তারা এইটথ গ্রেডে উঠলে, তাদের চিন্তা করতে হয় স্পেশালাইজড হাইস্কুলে ভর্তির পরীক্ষা নিয়ে। অবশ্য অনেক অভিভাবক এইসব স্কুলে ভর্তির জন্য তাদের সন্তানদের এক বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়ার ব্যবস্থা করেন বিভিন্ন টিউটোরিয়ালে পাঠিয়ে।
যারা তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে আমেরিকায় আসে, তাদের জন্য অর্থ উপার্জন যেমন মোক্ষম সুযোগ, সেই সাথে তাদের সন্তানদের এ দেশের উন্নততর শিক্ষায় দীক্ষিত করার সুযোগও সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশী অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সুশিক্ষা দেয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। তাদের স্কুলে ভাল ফলাফলের জন্য বাংলাদেশী মালিকানাধীন টিউটোরিয়াল ছাড়াও ক্যাপলান, ক্যুমোন, প্রিন্সটন প্রিপারেটরি সেন্টারের মত প্রতিষ্ঠানে প্রস্তুতির জন্য পাঠান। অনেক অভিভাবক ছেলেমেয়েদের হোমওয়ার্কসহ ম্যাথ, ইংলিশ উন্নততর করার জন্য এইসব টিউটোরিয়ালে পাঠান। অনেকে এসএটি, পিএসএটি, রিজেন্টস ইত্যাদির প্রস্তুতির জন্যও অর্থ ব্যয় করেন ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। এসএটিতে বা হাইস্কুল ফাইনালে ভাল গ্রেড পেলে স্কলারশিপ নিয়ে আইভি লিগের ছাড়াও স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারবে, এটাও বড় উদ্দেশ্য। প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে পরবতীর্ জীবনে তাদের ভাল চাকরির নিশ্চয়তা থাকে।
অনেক বাংলাদেশী মা—বাবা এখন ছেলেমেয়েদের ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চান না, অন্যান্য বিষয়েও তারা লেখাপড়া করছে। যেমন আইন পড়া বা আইটির বিভিন্ন বিষয়ে পড়ে। অনেকে ডাক্তারি না পড়লেও পাবলিক হেলথ নিয়ে পড়ছে। অনেকে ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়লেও বায়ো—মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, এ্যারোনটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা এ্যারোস্পেস নিয়ে পড়ছে। সংখ্যায় কম হলেও অনেক ছেলেমেয়ে লেখক হওয়ার জন্য এমএফএ পড়ছে। তবে মিউজিক নিয়ে পড়ার প্রবণতা একেবারেই কম, যেমন নাটক বা অভিনয় নিয়ে পড়ানোর ব্যাপারে মা—বাবার আগ্রহ খুব কম। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রতিহতও করেন।
নতুন প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে রাজনীতিতেও আগ্রহী। বিশেষ করে শাহানা হানিফ আর নাবিলাহ (ইসলাম) পার্কেস বা নিনা আহমাদ তাদের জন্য আশার আলো জ্বেলেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে আরো কয়েকজন বাংলাদেশী ইমিগ্রান্ট সিটি বা স্টেটে নির্বাচিত হতে পারেন। হলিউডেও বাংলাদেশীদের পদচারণা নেই বললেই চলে। অন্তত ইনডি মুভিতেও যদি যেতো তাহলে অন্যেরা অনুপ্রাণিত হতো।
বর্তমানে আমেরিকায় কিন্ডারগার্টেন থেকে টুয়েলফথ গ্রেড পর্যন্ত অর্থাৎ এলিমেন্টারি, মিডল ও হাইস্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৪৪ লক্ষ (৫৪.৪০ মিলিয়ন)। এর মধ্যে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত শিক্ষার্থীও আছে। মূল আমেরিকান (যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে এদেশে বাস করছেন, সাদা, কালো, স্প্যানিশ মিলিয়ে) তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশ থেকে শিশু বয়সে আগতরা এবং যাদের জন্ম এদেশে তারা যেমন নিউইয়র্ক সিটির স্পেশালাইজড হাইস্কুলে যাচ্ছে, তেমনই যাচ্ছে আইভি লিগের ইউনিভার্সিটিগুলোতে। সেরা স্কুল হার্ভার্ড, এমআইটি, প্রিন্সটন, ইয়েল, কলাম্বিয়া, ইউপেন, ব্রাউন, কর্নেল, এনওয়াইইউ, স্ট্যানফোর্ডের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ভর্তি হচ্ছে অনেকে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত শিক্ষার্থী নামী—দামী কর্পোরেশনগুলোতে কাজ করছেন উচ্চতর পদে। তবে এসব মোটেও আশাপ্রদ তেমন নয়। বিশেষ করে অনেক দেশ আছে বাংলাদেশের চেয়ে নানা দিক দিয়ে পিছিয়ে, সেসব দেশের ইমিগ্রান্টরা নিউইয়র্ক সিটি সহ আমেরিকার অন্যত্র অনেকটা এগিয়ে যাচ্ছে।
পুরো আমেরিকার চিত্র অবশ্য নিউইয়র্কের মত নয়। কারণ নিউইয়র্ক সহ ট্রাইস্টেটে প্রায় ৬ লক্ষ বাংলাদেশী ইমিগ্রান্ট বাস করে। নিউইয়র্ক সিটিতে প্রতিবছর প্রায় ৭৫,০০০ থেকে ৮৫,০০০ শিশু কিন্ডারগার্টেন বা প্রি—কিন্ডারগার্টেন ক্লাসে ভর্তি হয়। এছাড়া এই শহরের স্কুল সিস্টেমে মোট ৯০০,০০০ ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ছেলেমেয়ে এই স্কুল সিস্টেমে যায়। তবে তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি।
প্রায় আড়াই মাস সামার ভেকেশন শেষে যারা যাবে স্কুলে বা কলেজে সেপ্টেম্বরের শুরুতে তাদের আগামী উজ্জ্বল হোক। তাদের আগামী উজ্জ্বল হওয়া মানে প্রবাসে বাংলাদেশীদের আগামী উজ্জ্বল হওয়া। তারাই প্রবাসী বাংলাদেশীদের আশা ভরসার জায়গা।
