ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের হাতে তুলে দেয়া হলো বঙ্গবন্ধু বইমেলা পুরস্কার

নিউজার্সিঃ যে ভূমির পলিমাটির কণায় কণায় শহীদের রক্ত প্রবাহিত, সেই ভূমি থেকে শহীদ স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে কীভাবে? যে প্রজন্ম অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, তাদের বিভ্রান্ত করা যায়কিন্তু তাদের হৃদয় থেকে গৌরব মুছে ফেলা যায় না। কথাগুলো দৃঢ়চিত্তে বললেন কিশোর সাহিত্যিক বিজ্ঞানী . মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

দীর্ঘ দুই বছর পর তিনি কোনো অনুষ্ঠানে এলেন। জুলাই ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৬। দীর্ঘ দুই বছর! তিনি সপরিবারে নির্বাসিত। 

বিশিষ্ট লেখক, চিন্তক, বুদ্ধিজীবী . মুহম্মদ জাফর ইকবাল ২০২৬ সালের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা নবীজিনাত সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। গেল মে মাসে বইমেলায় এই পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিতে গত ১৯ জুলাই নিউজার্সিতে আয়োজিত হয় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। 

১৯ জুলাই ছিল কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের তিরোধান দিবস। ২০১২ সালে তিনি দেহত্যাগ করেন নিউইয়র্ক সিটিতে। তাঁকে স্মরণ করে শুরু হয় অনুষ্ঠানমালা।

বিভিন্ন স্টেট থেকে নিউজার্সিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সমবেত হন সুধীজন। বেলা দেড়টায় শুরু হয় পুরস্কার সম্মাননা প্রদান পর্ব। একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব স্বীকৃতি বড়ুয়া ভূমিকা বক্তব্য দিয়ে মঞ্চে আহ্বান করলেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি বইমেলার আহ্বায়ক . নুরুন নবীকে। প্রবর্তিত এই পুরস্কারেরও তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

. নবী একে একে . মুহম্মদ জাফর ইকবাল, . ইয়াসমিন হক, . জিনাত নবী বেলাল বেগকে মঞ্চে আহবান করে এই পুরস্কার প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। বলেন, এক চরম ক্রান্তি লগ্নে আমরা এই বইমেলার আয়োজন শুরু করেছিলাম। যখন বাংলাদেশ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করেছিল দখলদারেরা। যাঁরা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ একাত্তর নিয়ে লেখালেখি করেনএরাই এই পুরস্কার পাবেন এবং পাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমরা একাত্তরের চেতনা সমুন্নত রেখে এগিয়ে যাবোই।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল ইয়াসমিন হককে পুষ্পস্তবক দিয়ে বরণ করেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব বঙ্গবন্ধু পরিষদ, নিউইয়র্ক চ্যাপ্টারের নেতৃবৃন্দ। এরপর মূল অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান কবি ফকির ইলিয়াস। তিনি সবাইকে পুনরায় স্বাগত জানিয়ে বলেন, আমরা আনন্দিত, গর্বিত যে আজ আমরা এই সম্মাননা . মুহম্মদ জাফর ইকবালের হাতে তুলে দিতে পারছি। তিনি বলেন, এই পুরস্কার নির্বাচন কমিটিতে ছিলেন, বিশিষ্ট লেখক মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তাজুল মোহাম্মদ (কানাডা), বিশিষ্ট লেখক আতাউল করিম, আরকানসাস, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সালমা বাণী, কানাডা, বিশিষ্ট লেখক সেজান মাহমুদ (কানেকটিকাট), বিশিষ্ট সংগঠক স্বীকৃতি বড়ুয়া (নিউইয়র্ক), একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক নুরুন নবী (নিউজার্সি) কবি তিনি নিজে।

তিনি . মুহম্মদ জাফর ইকবালের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সহ আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

সম্মাননা পদক তাঁর হাতে তুলে দেন . নুরুন নবীর নেতৃত্বে উপস্থিত সুধীবৃন্দ। আর্থিক সম্মাননা দুই হাজার ডলার তাঁর হাতে তুলে দেন . জিনাত নবী।

এরপর . ইয়াসমিন হক তার বক্তব্যে বলেন, . মুহাম্মদ ইউনুসের মনে যে এই বিষ জমা ছিলতা কেউই বুঝতে পারেনি। আমরা আজ দুই বছর থেকেই দেশহীন আছি। বাংলাদেশই আমাদের সবকিছু। দেশে ফিরতে চাই। এবং দেশে ফিরবোই। আমরা ফিরবো একাত্তরের বাংলাদেশে।

তিনি বলেন, এরা সংঘবদ্ধভাবে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে মুছে দিতে চায়। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। কারণ এই দেশ বঙ্গবন্ধুর চেতনার উত্তরাধিকার।

. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ওরা রিসেট বাটন টিপতে চেয়েছে। আমি পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে এর পরিণতি, ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া জানি। এটা কি এতোই সহজ

তিনি বলেন, আমার পিতাকে গুলি করে তাঁর মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনী। আমরা উদ্বাস্তুর মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছি। ওই সময় . নুরুন নবীর মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছেন। আমার পিতা, শুধু এই দোয়া করতেনতাঁর সন্তানেরা যেন ভালো থাকে। সুখে থাকে। আমরা সেই বাঙালি জাতিসন্তান। আমাদের পিতারা আমাদের জন্য লাইফ সেক্রিফাইস করেছিলেন।

তিনি বলেন, এই বাংলাদেশের মাটির কণায় কণায় শহীদের রক্ত মিশে আছে। এই দেশটা আমাদের। এটা একাত্তরের পরাজিতদের নয়।

তাই তারা যতোই আস্ফালন করুকজিততে পারবে না। পারার কথা নয়। আমরাই বিজয়ী হবো বার বার। বহুবার।

একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের কাজ আমাদের প্রেরণা দিচ্ছে। আপনারা আমাকে সম্মান, ভালোবাসা দিয়ে ঋণী করেছেন। আমরা যে যেখানে আছি, জাতির পিতার বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাবোই।

সমাপনী বক্তব্যে . নুরুন নবী উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বইমেলা সার্থক সফল করতে গ্র্যান্ডস্পনসর, স্পনসর, বিজ্ঞাপনদাতা, লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, অংশগ্রহণকারী সবাইকে আমি অশেষ ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। আপনাদের ভালোবাসা একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশনকে সমৃদ্ধ ধন্য করেছে।

Related Posts