৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ মেইন কলোনিঃ অ্যান রিভার্স সিডন্স || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

অ্যান্ড্রু উইথ্রো যখন এক তরুণী রেবেকাকে বিয়ে করে মেইনের সেই পাথুরে, কুয়াশায় মোড়ানো উপকূলীয় দ্বীপে নিয়ে এসেছিলেন, তখন সেখানে কেবল সমুদ্রের গর্জন আর শতবর্ষী পাইন বনের নীরবতাই প্রধান ছিল না; সেখানে অপেক্ষা করছিল এক অলিখিত, অনমনীয় নিয়মকানুন।

অ্যান রিভার্স সিডন্সের বিখ্যাত উপন্যাসকলোনিমূলত এক বহিরাগত নারীর ভেতরের মানুষ হয়ে ওঠার, এক শতাব্দী প্রাচীন আভিজাত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে চিনে নেওয়ার এবং প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের কাছে জীবনের সমর্পণের এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। বইটি না পড়েও এর ভেতরের লোনা বাতাস, পাইনের গন্ধ এবং এক অনবদ্য প্রেমের তীব্রতা কীভাবে পাঠককে ছুঁয়ে যেতে পারে, তার একটি গভীর সাহিত্যিক ব্যবচ্ছেদ নিচে তুলে ধরা হলো।

উপন্যাসটির মূল প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে এর ভৌগোলিক আবহে। মেইন স্টেটের উপকূলভাগ আমেরিকার অন্য যে কোনো অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। এখানকার সমুদ্র শান্ত নয়, বরং তা পাথুরে সৈকতে আছড়ে পড়া এক আদিম শক্তির প্রতীক। আর এই উপকূলেরই এক নিভৃত কোণে গড়ে উঠেছেকলোনি’—একটি গ্রীষ্মকালীন ট্রাস্ট বা উচ্চবিত্ত এলিটদের আশ্রয়স্থল।

প্রকৃতির দ্বৈত রূপ: এখানে একদিকে আছে মখমলের মতো ঘন কুয়াশা, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো চরাচরকে এক মায়াবী চাদরে ঢেকে দেয়, আবার অন্যদিকে আছে কনকনে ঠান্ডা জল আর ধারাল পাথরের খাঁজ।

অভিজাত সমাজ তার দেয়াল: কলোনি কোনো সাধারণ অবকাশ যাপন কেন্দ্র নয়। এটি বস্টন এবং নিউইয়র্কের পুরনো, বংশানুক্রমিক ধনী পরিবারগুলোর এক নিজস্ব স্বর্গরাজ্য। এখানে কারা আসবে, কীভাবে কথা বলবে, এমনকি বিকালের চায়ের আসরে কোন রঙের পোশাক পরা হবেÑসবকিছু এক অদৃশ্য কিন্তু কঠোর সামাজিক সংহিতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই সমাজ বহিরাগতদের সহজে গ্রহণ করে না; তারা কেবল তাদেরই আপন করে, যারা নিজেদের সত্তা বিসর্জন দিয়ে কলোনির ছাঁচে নিজেদের ঢেলে সাজাতে পারে।

রেবেকা: সাউদার্ন বসন্ত থেকে মেইনের পাথুরে উপকূলে

গল্পের মূল চালিকাশক্তি রেবেকাদক্ষিণের সাউথ ক্যারোলাইনার চ্যার্লসটন থেকে আসা এক প্রাণোচ্ছ্বল, স্বাধীনচেতা তরুণী। দক্ষিণের আবহাওয়া যেখানে উষ্ণ, অলস এবং মৃদু লতাগুল্মে ঘেরা, রেবেকার স্বভাবটাও ছিল ঠিক তেমনই মুক্তবিহঙ্গের মতো। কিন্তু যখন কলোনির এক প্রভাবশালী বংশের উত্তরাধিকারী অ্যান্ড্রু উইথ্রোর প্রেমে পড়ে সে তাকে বিয়ে করে মেইনের এই কলোনিতে পা রাখল, তখন থেকেই শুরু হলো এক নীরব মনোস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

রেবেকা যখন প্রথম কলোনিতে এসে পৌঁছাল, তখন তার পরনে ছিল দক্ষিণের উজ্জ্বল রঙের পোশাক, মনে ছিল একরাশ খোলামেলা আতিথেয়তার অভ্যস্ততা। কিন্তু কলোনির ঠান্ডা বাতাস এবং তার চেয়েও ঠান্ডা মানুষের চোখ তাকে বুঝিয়ে দিল, সে এখানে একআউটসাইডারবা বহিরাগত।

শাশুড়ি আমালিয়া এবং ক্ষমতার মনোস্তত্ত্ব

কলোনির অঘোষিত সম্রাজ্ঞী ছিলেন অ্যান্ড্রুর মা, আমালিয়া উইথ্রো। আমালিয়া চরিত্রটি সিডন্স পরম যত্নে এঁকেছেন। তিনি নিষ্ঠুর নন, কিন্তু কলোনির ঐতিহ্য রক্ষায় তিনি আপসহীন। রেবেকার প্রতিটি পদক্ষেপ, তার হাসির শব্দ, এমনকি তার সন্তান লালনপালনের পদ্ধতিও আমালিয়ার সূক্ষ¥ তীক্ষè জহুরীর চোখের নিচে পরীক্ষিত হতে লাগল।

রেবেকার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল: হয় আমালিয়ার চরণের নিচে নিজের ব্যক্তিত্ব সঁপে দিয়ে একজন আদর্শউইথ্রো বধূহয়ে ওঠা, না হয় নিজের ভেতরের সেই চার্লসটনের মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এক অন্তহীন লড়াই চালিয়ে যাওয়া। রেবেকা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিল, আর এটাই এই উপন্যাসের মূল সংঘাতের বীজ বুনে দেয়।

উপন্যাসের মূল আখ্যানভাগ

কলোনিকোনো এক গ্রীষ্মের গল্প নয়, এটি প্রায় চার দশক জুড়ে বিস্তৃত এক পারিবারিক সাগা। রেবেকা অ্যান্ড্রুর দাম্পত্য জীবনের উত্থানপতন, তাদের সন্তানদের বড় হয়ে ওঠা এবং কলোনির নিজস্ব বিবর্তনÑসবকিছুই এই দীর্ঘ সময়ে আবর্তিত হয়েছে।

প্রথম দিকে রেবেকা ভেবেছিল অ্যান্ড্রু হয়তো তাকে এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু সে দ্রুতই আবিষ্কার করল, অ্যান্ড্রু যতই তাকে ভালোবাসুক না কেন, সে মূলত এই কলোনিরই সন্তান। কলোনির নিয়ম কানুনের বাইরে যাওয়ার সাহস বা ইচ্ছে কোনোটিই অ্যান্ড্রুর নেই। রেবেকা এক গভীর একাকীত্বে নিমজ্জিত হয়। এই একাকীত্ব কাটাতে সে মেইনের প্রকৃতিকে নিজের সঙ্গী করে নেয়। সে একলা দীর্ঘ সময় হেঁটে বেড়ায় পাথুরে সৈকতে, কুয়াশার ভেতর দিয়ে খুঁজে ফেরে নিজের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব।

সন্তানদের জন্মের পর রেবেকার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সে চাইল না তার সন্তানেরা কলোনির সেই কৃত্রিম, আবেগহীন ছাঁচে বড় হোক। সে তাদের ভেতর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি সহজ মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে চাইল। কিন্তু কলোনির টান বড় ভয়ানক। সন্তানেরা যত বড় হতে লাগল, ততই তারা মায়ের চেয়ে কলোনির সেই আভিজাত্যের সংস্কৃতির দিকে বেশি আকৃষ্ট হতে থাকল। রেবেকা আরও একবার দেখল, কলোনি কীভাবে নিঃশব্দে তার আপনজনদের তার থেকে কেড়ে নিচ্ছে।

উপন্যাসের এক অন্যতম তীব্র বাঁক আসে যখন রেবেকার জীবনে এক অন্য পুরুষের আগমন ঘটে। কলোনিরই এক প্রান্তিক চরিত্র, যে পুরোপুরি এই সমাজের নিয়মে বাঁধা পড়েনি, তার সাথে রেবেকার এক আত্মিক এবং গভীর মানসিক যোগসূত্র তৈরি হয়। এটি কেবল শারীরিক কোনো আকর্ষণ ছিল না, বরং তা ছিল দুটি একাকী এবং খাঁচায় বন্দী আত্মার একে অপরকে চিনে নেওয়ার আকুলতা। সিডন্স এই সম্পর্কের টানাপোড়েন অত্যন্ত সংযত অথচ তীব্র আবেগীয় ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে অপরাধবোধ আর মুক্তির আকাক্সক্ষা পাশাপাশি হেঁটে চলে।

চরিত্রসমূহের মনোস্তাত্ত্বিক গভীরতা

অ্যান রিভার্স সিডন্সের লেখনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি কোনো চরিত্রকেই স্রেফভালোবামন্দব্ল্যাকঅ্যান্ডহোয়াইট ফ্রেমে বাঁধেননি। প্রতিটি চরিত্রের পেছনে রয়েছে এক গভীর মনোস্তাত্ত্বিক পটভূমি।

অ্যান্ড্রু উইথ্রো: সে কোনো খলনায়ক নয়। সে একজন দায়িত্বশীল স্বামী এবং পিতা। কিন্তু সে একই সাথে এক বিশাল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী, যার কাঁধে কলোনির মানসম্মান রক্ষার ভার রয়েছে। রেবেকার প্রতি তার ভালোবাসা সত্য, কিন্তু কলোনির অদৃশ্য দেয়ালকে ভেঙে ফেলার মতো বিপ্লব তার চরিত্রে ছিল না।

আমালিয়া উইথ্রো: উপন্যাসের শুরুতে তাকে এক কঠোর, নিয়ন্ত্রণকামী শাশুড়ি মনে হলেও, কাহিনীর গভীরে গিয়ে পাঠক বুঝতে পারে আমালিয়ার এই কঠোরতার পেছনে রয়েছে কলোনিকে টিকিয়ে রাখার এক আদিম মরিয়া চেষ্টা। তিনিও একসময় বহিরাগত হিসেবেই এসেছিলেন, কিন্তু কলোনি তাকে গ্রাস করে নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছে।

রেবেকা: রেবেকার চরিত্রটি একটি নদীর মতো, যা পাহাড়ি পাথরে বাধা পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় না, বরং নিজের পথ নিজে তৈরি করে নেয়। উপন্যাসের শুরুতে যে তরুণীটি চটুল আবেগপ্রবণ ছিল, উপন্যাসের শেষে সে হয়ে ওঠে মেইনের সেই প্রাচীন পাইন গাছের মতো, যা শত ঝড়েও উপড়ে যায় না, বরং আরও গভীরে নিজের শিকড় চালিয়ে দেয়।

বিষাদের সুর এবং জীবনের মোড়

কাহিনীর শেষ ভাগে এসে উপন্যাসটি এক গভীর দার্শনিক রূপ নেয়। কলোনির সেই বৈভব, সেই বার্ষিক পুনর্মিলনী, সেই আভিজাত্যের উৎসবগুলোর পেছনে যে এক অবক্ষয়ের সুর লুকিয়ে ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সময় কাউকে ক্ষমা করে না। আমালিয়ার বৃদ্ধ বয়স এবং অবসান, অ্যান্ড্রুর ভেতরের ক্লান্তি এবং সন্তানদের নিজেদের জীবনের জটিলতাÑসব মিলিয়ে রেবেকা বুঝতে পারে যে, কলোনি আসলে কোনো স্থান নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থা।

সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটে যখন রেবেকা নিজেই একসময় কলোনির সবচেয়ে প্রবীণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। যে কলোনিকে সে একদা শত্রু মনে করেছিল, জীবনের বহু ঝড়ঝাপটা, প্রিয়জনদের হারিয়ে ফেলা এবং নিজের ভেতরের পরিবর্তনের পর সে আবিষ্কার করে, সে নিজেই এখন এই কলোনির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সে আমালিয়ার মতো নিষ্ঠুরভাবে নয়, বরং নিজের ভেতরের সেই চার্লসটনের মানবিক উষ্ণতা দিয়ে কলোনিকে এক নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে।

এই উপন্যাসটি পড়ার অর্থ হলো মেইনের সেই সমুদ্রতীরে এক পুরো জীবন যাপন করা। সিডন্সের বর্ণনাশৈলী এতটাই জীবন্ত যে, পাঠক প্রতি পৃষ্ঠায় শুনতে পাবেন শঙ্খচিলের ডাক, পায়ের নিচে অনুভব করবেন ঠান্ডা বালু আর নোনতা জলের ছোঁয়া। এটি কেবল একটি পারিবারিক ড্রামা নয়, এটি মূলত মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার গল্প।

কলোনিশেষ হয় এক শান্ত, গম্ভীর অথচ আশাবাদী সুরের মধ্য দিয়ে। রেবেকা উইথ্রো যখন মেইনের সেই শেষ বিকেলের বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, তখন তার পেছনে ফেলে আসা চার দশকের দীর্ঘ পথÑতার অশ্রু, তার গোপন প্রেম, তার মাতৃত্বের গৌরব আর একাকীত্বের বিষাদ, সবকিছু মিলিয়ে তাকে এক পূর্ণাঙ্গ নারী হিসেবে আমাদের সামনে দাঁড় করায়। কলোনি তাকে ভাঙতে চেয়েছিল, কিন্তু রেবেকা কলোনিকে নিজের মহিমায় রাঙিয়ে দিয়ে বিজয়ী হলো। এখানেই অ্যান রিভার্স সিডন্সের এই উপন্যাসের সার্থকতা।

Related Posts