উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—১৮ || ড. আনিস রহমান, পেনসিলভেনিয়া

আধুনিক মেটেরিয়াল সায়েন্স বা পদার্থ বিজ্ঞানের গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইএর সংমিশ্রণ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। প্রথাগতভাবে নতুন কোনো পদার্থ আবিষ্কারের প্রক্রিয়া ছিল মূলত পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল, যা ছিল অত্যন্ত ধীর এবং ব্যয়বহুল। তবে গত এক দশকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটেশনাল টেকনিক এবং বিশেষ করে ডিপ লার্নিং মডেলগুলোর উত্থান এই গবেষণার গতিধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। বর্তমান যুগে এআই কেবল উপাত্ত বিশ্লেষণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণাগারের রূপ ধারণ করেছে যেখানে পদার্থের আণবিক গঠন থেকে শুরু করে তার কার্যকারিতা পর্যন্ত সবকিছুই সিমুলেশনের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে ন্যানোস্ট্রাকচারড অণুর শক্তি স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মডেলিং এবং স্থানীয় পরিবেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপযোগী নতুন উপকরণের নকশা তৈরিতে এআইএর ভূমিকা এখন অপরিহার্য। এই প্রতিবেদনটি উন্নত পদার্থ বিজ্ঞানে এআইএর বহুমুখী প্রয়োগ, বিশেষ করে শক্তি স্থানান্তর মডেলিং, ব্যাটারি প্রযুক্তি, পানি বিশুদ্ধকরণ এবং সবুজ রসায়নের প্রেক্ষাপটে এক বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করবে।

ন্যানোস্ট্রাকচারড অণুর শক্তি স্থানান্তরের মডেলিং এআইএর ভূমিকা

ন্যানোস্ট্রাকচারড অণুর ক্ষেত্রে শক্তি স্থানান্তর একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া যা মূলত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতিগুলো দ্বারা পরিচালিত হয়। ন্যানোস্কেলে পদার্থের কণাগুলো যখন একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করে, তখন তাদের মধ্যে শক্তির আদানপ্রদান সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে ভিন্নভাবে ঘটে। এই শক্তি স্থানান্তরের মডেলিং করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সৌর কোষের দক্ষতা বৃদ্ধি, আলোকনিঃসারী ডায়োড (খঊউ) এবং এমনকি উন্নত সেন্সর তৈরির ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এআই এই ক্ষেত্রে আণবিক গতিবিদ্যা বা মলিকুলার ডাইনামিক্স এবং কোয়ান্টাম কেমিক্যাল সিমুলেশনকে একীভূত করে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ন্যানোস্ট্রাকচারড অণুর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফস্টর্ার রেজোন্যান্স এনার্জি ট্রান্সফার (ঋজঊঞ) এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি দাতা (উড়হড়ৎ) অণু থেকে গ্রহীতা (অপপবঢ়ঃড়ৎ) অণুর মধ্যে কোনো বিকিরণ ছাড়াই শক্তির স্থানান্তর ঘটে। এই স্থানান্তরের কার্যকারিতা মূলত দাতা গ্রহীতার মধ্যবর্তী দূরত্ব, তাদের আণবিক বিন্যাস এবং বর্ণালীর ওভারল্যাপের ওপর নির্ভর করে। এআই মডেলগুলো এখন এই ঋজঊঞ প্রক্রিয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, মন্টিকার্লো পদ্ধতির মাধ্যমে যাচাইকৃত এআই মডেলগুলো এখন কোরশেল ন্যানোস্ট্রাকচারের আণবিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে যে সেখানে শক্তি স্থানান্তর কতটা দক্ষ হবে। এই মডেলিং প্রক্রিয়াটি কেবল তাত্ত্বিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য উন্নত বায়োসেন্সর তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে যেখানে ডিএনএ বা আরএনএএর মতো জৈব অণুর ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও শনাক্ত করা সম্ভব।

ফস্টর্ার রেজোন্যান্স এনার্জি ট্রান্সফার (ঋস্খৎংঃবৎ জবংড়হধহপব ঊহবৎমু ঞৎধহংভবৎ, ঋজঊঞ) হলো দুটি অতিনিকটবর্তী অণুর (ফড়হড়ৎ ধপপবঢ়ঃড়ৎ পযৎড়সড়ঢ়যড়ৎব) মধ্যে আলোকউদ্দীপিত শক্তির তরঙ্গিত (হড়হৎধফরধঃরাব) স্থানান্তর প্রক্রিয়া। মূল ধারণা হলোফড়হড়ৎ অণু উত্তেজিত অবস্থায় গেলে তার শক্তি সরাসরি ফরঢ়ড়ষবফরঢ়ড়ষব পড়ঁঢ়ষরহম এর মাধ্যমে ধপপবঢ়ঃড়ৎ অণুতে স্থানান্তরিত হয়, কোনো ফোটন নির্গমন ছাড়াই। কেন ঋজঊঞ গুরুত্বপূর্ণ? ঋজঊঞ হলো ফরংঃধহপবংবহংরঃরাব সড়ষবপঁষধৎ ৎঁষবৎফড়হড়ৎ ধপপবঢ়ঃড়ৎ এর দূরত্ব ⁻⁶ অনুপাতে ঋজঊঞ বভভরপরবহপু কমে। অর্থাৎ দূরত্ব সামান্য বাড়লেই বভভরপরবহপু দ্রুত কমে যায়। কারণে ঋজঊঞ ব্যবহার করা হয়প্রোটিন প্রোটিন রহঃবৎধপঃরড়হ মাপতে, কনফরমেশনাল পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে, বায়োসেন্সর ডিজাইনে, এবং সেলুলার সিগন্যালিং ঢ়ধঃযধিু বিশ্লেষণে।

শক্তির মডেলিংয়ের আরেকটি বিশাল ক্ষেত্র হলো এক্সিটন ট্রান্সপোর্ট বা এক্সিটন পরিবহন। আণবিক স্ফটিক বা মলিকুলার ক্রিস্টালের মধ্যে যখন আলো পড়ে, তখন এক্সিটন তৈরি হয় এবং এই এক্সিটনগুলো এক অণু থেকে অন্য অণুতে ভ্রমণ করে। বৃহৎ আণবিক কাঠামোর জন্য এই এক্সিটন ডাইনামিক্স গণনা করা সাধারণ কম্পিউটারের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। এখানে এআইএরসাইজট্রাসফারেবল’ (ঝরুবঃৎধহংভবৎধনষব) মডেলগুলো এক অনন্য সমাধান প্রদান করেছে। এই পদ্ধতির মূলে রয়েছে ডাইমার ডিকম্পোজিশন বা দ্বৈত অণুর বিভাজন। গবেষকরা একটি এআই মডেলকে প্রথমে দুটি অণুর মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া বা ডাইমার কনফর্মেশনের ওপর প্রশিক্ষণ দেন। যেহেতু বৃহৎ আণবিক কাঠামোর বেশিরভাগ মিথস্ক্রিয়াই মূলত জোড়ায় জোড়ায় ঘটে, তাই এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মডেলটি পরবর্তীতে শত শত অণুর সমন্বয়ে গঠিত বিশাল ন্যানোঅ্যাগ্রিগেটের এক্সিটোনিক হ্যামিল্টোনিয়ান (ঊীপরঃড়হরপ ঐধসরষঃড়হরধহ) পুনর্গঠন করতে পারে। এই মডেলগুলো ব্যবহারের ফলে যেখানে আগে কয়েক মাস সময় লাগত, সেখানে এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এক্সিটন পপুলেশন এবং শক্তির স্তরের নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হচ্ছে।

ফিজিক্সইনফর্মর্ড নিউরাল নেটওয়ার্ক (চযুংরপংরহভড়ৎসবফ ঘবঁৎধষ ঘবঃড়িৎশ) এই শক্তি স্থানান্তর গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। সাধারণ এআই মডেলগুলো অনেক সময় পদার্থবিদ্যার মৌলিক নীতিগুলো লঙ্ঘন করতে পারে, কিন্তু এই নতুন ফ্রেমওয়ার্কগুলো সরাসরি পদার্থের প্রতিসাম্য বা সিমেট্রি, পর্যায়ক্রমিকতা বা পিরিওডিসিটি এবং ইনভারিয়েন্সের মতো বৈশিষ্ট্যগুলোকে মডেলের গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে এআই যে নতুন আণবিক কাঠামোর প্রস্তাব দেয়, তা ল্যাবরেটরিতে তৈরির জন্য রাসায়নিকভাবে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়। এই ধরনের মডেলগুলো বর্তমানে পেরিলিন (চবৎুষবহব) এবং টেট্রাসিন (ঞবঃৎধপবহব) এর মতো উন্নত সেমিকন্ডাক্টর পদার্থের আলোকবৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

Related Posts